আপনি হেপাটাইটিসে আক্রান্ত নন তো? হেপাটাইটিস রোগের আদ্যপান্ত জেনে নিন

জন্ডিস শব্দটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। কিন্তু জন্ডিসের অন্যতম কারণ হেপাটাইটিস সম্পর্কে অনেকেরই সঠিক ধারণা নেই। হেপাটাইটিস মূলত লিভারের প্রদাহ। ভাইরাস বা অন্যান্য কারণে লিভার আক্রান্ত হলে হেপাটাইটিস রোগ হয়। দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো অনেক মানুষ তাদের শরীরে হেপাটাইটিস রোগ বহন করছেন কিন্তু তারা এ সম্পর্কে অবগত না। কারণ, কোনো লক্ষণ ছাড়াই আপনার শরীরে হেপাটাইটিস রোগ থাকতে পারে। তবে আশার কথা হলো যথাযথ চিকিৎসা নিলে রোগটি সম্পূর্ন সেড়ে যায়। কিন্তু হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি দ্বারা আক্রান্ত হলে দীর্ঘস্থায়ী রোগ হতে পারে। এমনকি লিভার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ২০,০০০ এর বেশি মানুষ মারা যায় লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে।

হেপাটাইটিস কী?

জন্ডিস শব্দটির সাথে আমরা সকলেই পরিচিত। কিন্তু জন্ডিসের অন্যতম কারণ হেপাটাইটিস সম্পর্কে সঠিক ধারণা নেই অনেকেরই। হেপাটাইটিস মূলত লিভারের প্রদাহ। ভাইরাস বা অন্যান্য কারণে লিভার আক্রান্ত হলে হেপাটাইটিস রোগ হয়। দুশ্চিন্তার ব্যাপার হলো অনেক মানুষ তাদের শরীরে হেপাটাইটিস রোগ বহন করছেন কিন্তু এ সম্পর্কে অবগত না তারা। কারণ, কোনো লক্ষণ ছাড়াই হেপাটাইটিস রোগ থাকতে পারে আপনার শরীরে। তবে আশার কথা হলো যথাযথ চিকিৎসা নিলে রোগটি সম্পূর্ন সেড়ে যায়। কিন্তু হেপাটাইটিস বি এবং হেপাটাইটিস সি দ্বারা আক্রান্ত হলে দীর্ঘস্থায়ী রোগ হতে পারে। এমনকি লিভার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। বাংলাদেশে প্রতিবছর লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০,০০০ এর বেশি মানুষ মারা যায়।

যেসব কারণে হতে পারে হেপাটাইটিস:

সাধারণত হেপাটাইটিস হয়ে থাকে ভাইরাসের আক্রমণে। পাঁচ ধরনের হেপাটাইটিস ভাইরাস এই রোগটি হয়ে থাকে।

হেপাটাইটিস ভাইরাসের প্রকারভেদ হলো-

  • হেপাটাইটিস এ
  • হেপাটাইটিস বি
  • হেপাটাইটিস সি
  • হেপাটাইটিস ডি এবং
  • হেপাটাইটিস ই
হেপাটাইটিস ভাইরাস; Image Source: Medscape.com

এই ভাইরাস গুলো ছাড়াও আরো কিছু কারণে হেপাটাইটিস হতে পারে। যারা অ্যালকোহলে অভ্যস্ত তাদের হতে পারে অ্যালকোহোলিক হেপাটাইটিস। কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের কারণেও হেপাটাইটিস হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্যারাসিটামল, যক্ষ্মারোগের ওষুধ এবং কিছু এন্টিবায়োটিক। এছাড়া কিছু জৈব দ্রাবক, উদ্ভিজ্জ টক্সিন প্রভৃতির কারণে রোগটি হয়ে থাকে। অটোইমিউন হেপাটাইটিস নামক আরেক ধরনের হেপাটাইটিস হতে পারে যার সঠিক কারণ এখনও জানা যায়নি।

যেভাবে ছড়ায় রোগটি: প্রথমেই আসি হেপাটাইটিস এ ভাইরাসের কথায়।  ভাইরাসটি ছড়িয়ে যেতে পারে দূষিত পানি বা খাবারের মাধ্যমে। হেপাটাইটিস আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির অতি সামান্য পরিমাণ মল যদি পানির মাধ্যমে খাবার বা অন্যান্য বস্তুকে দূষিত করে, তখন তার মাধ্যমে অন্যজন অক্রান্ত হতে পারে। রাস্তায় বের হলেই তৃষ্ণার্ত হয়ে আমরা আখের শরবত কিনে খাই। এসব খোলা শরবত, পেয়ারা ভর্তা, আম ভর্তার সাথে আমাদের পেটে চলে যেতে পারে জীবাণু।

হেপাটাইটিস  বি এবং সি ভাইরাস গুলো রক্ত, বীর্য বা অন্যান্য বডি ফ্লুইডের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে রক্ত গ্রহণ, একই সুই সিরিঞ্জ ব্যবহার, অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক, আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহার্য রেজার, টুথব্রাশ ব্যবহার করার মাধ্যমে ছড়ায়। যারা সেলুনে চুল, দাড়ি কাটতে যান তারা হয়তো জানতেও পারবেন না কখন সংক্রমিত হয়েছেন। কারণ, সেলুনে প্রতিবার ব্যবহারের পরে ব্লেড নাও বদলানো হতে পারে। আক্রান্ত মা থেকে গর্ভের বাচ্চা জন্মগ্রহন করার সময়ও হেপাটাইটিস বি তে আক্রান্ত হতে পারে।

হেপাটাইটিস ডি ভাইরাসটি হেপাটাইটিস বি এর সাথে আক্রমণ করে। এরা কখনও একা আক্রমণ করতে পারে না। হেপাটাইটিস ই দূষিত পানি এবং খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। ভালভাবে রান্না না করা দূষিত খাবার থেকে এটি অনেক বেশি মাত্রায় ছড়িয়ে যেতে পারে।

যেসব উপসর্গ দেখা যায়: বেশিরভাগ রোগীর কোনো লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে। যাদের প্রকাশ পায় তাদের নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখা যায়-

  • শরীর সব সময় দুর্বল লাগা;
  • সব সময় অবসন্ন বোধ করা;
  • শরীর ম্যাজম্যাজ করা;
  • সারাক্ষণ জ্বর জ্বর অনুভূত হওয়া;
  • ক্ষুধামন্দা ও রুচি নষ্ট হয়ে যাওয়া;
  • সবসময় বমি বমি ভাব থাকা এবং বমি হওয়া;
  • পেট ব্যাথা বিশেষত উপরের পেটের ডানদিকে;
  • চোখ, শরীর, প্রসাব হলুদ হয়ে যাওয়া;
  • পায়খানার রং বিবর্ণ হয়ে যাওয়া;
  • শরীরে চুলকানি হওয়া;
  • কারণ ছাড়া ওজন কমতে থাকা।

এই সবগুলো লক্ষণ থাকতে পারে। অথবা হেপাটাইটিসে আক্রান্ত রোগীর যেকোনো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

রোগ নির্ণয়: আপনার শরীরে উপরিউক্ত কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন। ডাক্তার শারীরিক পরীক্ষা নিরিক্ষা করে আরও কিছু ল্যাবরেটরির টেস্টের মাধ্যমে আপনার রোগ আছে কিনা তা নিশ্চিত করে বলতে পারবেন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোক এমন উসসর্গ দেখা দিলে কবিরাজের কাছে যায়। কিছু লোক মনে করে, জন্ডিস ভালো করতে কবিরাজি চিকিৎসা অব্যর্থ। কিন্তু এমন ভুল করবেন না। কারণ, সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় অনেক জরুরী। নাহলে পরবর্তীতে এই রোগ আপনার শরীরে যদি থেকে যায় সেখান থেকে অনেক জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।

চিকিৎসা: ভাইরাস জনিত হেপাটাইটিস এর চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি যেটা জরুরী তা হলো পূর্ণ বিশ্রাম। কারণ, ভাইরাস সেল্ফ লিমিটিং। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় পরে একাই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। তবে যথার্থ ওষুধ, পথ্যেরও দরকার আছে। হেপাটাইটিস এ এবং বি ভাইরাস কোনো ওষুধ ছাড়া একা একাই সেড়ে যেতে পারে। ওষুধের মাধ্যমে শুধু উপসর্গ গুলোর চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে এন্টি ভাইরাল ওষুধও দেওয়া হয়। হেপাটাইটিস ই ভাইরাসও নিজে নিজেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে। কিন্তু গর্ভবতী মহিলা হেপাটাইটিস ই দ্বারা আক্রান্ত হলে জটিলতা সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যায়। তাই দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।


যেসব জটিলতা হতে পারে: হেপাটাইটিস এ ভাইরাস দীর্ঘস্থায়ী রোগ তৈরি করে না। তাই মৃত্যুর আশঙ্কা কম। কিন্তু এরা মাঝেমাঝে একিউট লিভার ফেইলিউর করতে পারে। ফলে মৃত্যু হতে পারে। এর আগে বিশ্বের কিছু জায়গায় হেপাটাইটিস এ মহামারির মতো ছড়িয়েছে।

সুস্থ লিভার এবং সিরোসিস হওয়া লিভার; Image Source: NIDDK- NIH

হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ৫% ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী হয়। এদের মধ্যে ২০-৩০% মানুষ লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। ১-৮% ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস সি থেকে দীর্ঘস্থায়ী সিরোসিস এবং ক্যান্সার দেখা দেয়। হেপাটাইটিস ই গর্ভবতী মহিলাদের ফালমিনেন্ট লিভার ফেইলিউর তৈরি করে। যারফলে মৃত্যু হতে পারে।

প্রতিরোধে যা করণীয়:

হেপাটাইটিস প্রতিরোধের জন্য ভ্যাক্সিন রয়েছে। সকলেরই উচিত ভ্যাক্সিন নেওয়া। এসব ভ্যাক্সিন আপনাকে ১০ বছর থেকে শুরু করে সারাজীবনও প্রতিরক্ষা দিতে পারে।

জীবন যাপনে সচেতন হোন। খাবার আগে, বাথরুম ব্যবহারের পরে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিবেন। বিশুদ্ধ পানি পান করবেন। রাস্তার খোলা শরবত বা কাঁচা কিছু কিনে খাবেন না। রক্তদান ও রক্ত গ্রহণে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। একই ব্লেড, টুথব্রাশ, সুই, সিরিঞ্জ, নেইল কাটার ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকুন। অসুস্থতা বোধ করলে বিলম্ব না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন। প্রয়োজনীয় ওসুধ সেবনের মাধ্যমে লিভার ক্যান্সারের মত ঝুঁকি থেকে বাঁচুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here