আমাদের স্বাক্ষর ও তার ইতিহাস

আমরা আপনারা সবাই বিভিন্ন প্রয়োজনে কোনো না কোনো কাজে প্রায় সময়ই স্বাক্ষর করে থাকি। কখনও কি ভেবে দেখেছেন যে, এই স্বাক্ষর করার প্রচলন কীভাবে আসলো? আজকে আমরা জানবো যে, কীভাবে এই স্বাক্ষরের প্রচলন হলো এবং তাঁর ইতিহাস।

খুব ছোটবেলায় বাবা যখন কোনো কাগজে স্বাক্ষর দিতো, তখন আমি নিজেই সেই স্বাক্ষরকে অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। পরে অবশ্য তিনি বুঝিয়েছিলেন স্বাক্ষরের ব্যবহার আর গুরত্ব। আর তার ধারাবাহিকতায় স্কুলের রেজাল্ট খারাপ হলেই চলতো এই স্বাক্ষরের ব্যবহার। আমার মতে অনেকেই আছেন এ কাজটি করেছিলেন। পরে অবশ্য অনেকবার ধরাও খেয়েছিলাম। স্বাক্ষর নকলের জন্য,উত্তম মধ্যমটাও ছিল সেইরকম। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে স্বাক্ষরের জন্য এতো মার খেলাম, সে স্বাক্ষরকে দেখে নিবো। হ্যাঁ বন্ধুরা, আজ সেই প্রতিশ্রুতি পূরনেরর জন্য স্বাক্ষরের কালক্রম তুলে ধরলাম। পাশের ছবিতে আপনারা হায়রোগ্লাফিক বর্ণমালা দেখতে পাচ্ছেন।

স্বাক্ষর আগে এসেছে না ভাষা আগে? অবশ্যই ভাষা আগে। স্বাক্ষর নিজের আক্ষরিক চিহ্নিত বর্ণমালার ব্যবহার বোঝায়। প্রাচীনকালে নিজের গোষ্ঠী, নিজের জায়গা চিহ্নিত করার জন্য বিভিন্ন কিছু ব্যবহার করতো। যেমনঃ গাছের কাঠ, পাথর, বিভিন্ন পশুপাখির কঙ্কাল প্রভৃতি।

খ্রীস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ২৫০০ সালের মধ্যে সুমেরিয়ান আর ইজিপ্টিয়ানরা পিকটোগ্রাফ ব্যবহার শুরু করে। এখন প্রশ্ন হলো – পিকটগ্রাফ কী? পিকটোগ্রাফ হচ্ছে ছবি ও সাংকেতিক চিহ্ন সমূহ যাদের মনের ভাব প্রকাশের জন্য লেখা হতো। ভাবা যায়, একেকটা ছবি, একেকটা চিহ্ন একেকটা অর্থ! হায়রোগ্লাফিক এক ধরনের পিকটোগ্রাফ।

খ্রীস্টপূর্ব ১৮০০ থেকে ১২০০ সালের মধ্যে ফিনিশিয়ানরা প্রথম বর্ণমালার ব্যবহার শুরু করে। এই বর্ণমালাগুলোতে ছিল ২২ টি ব্যঞ্জনবর্ন, কিন্তু কোনো স্বরবর্ণ ছিল না। খ্রীস্টপূর্ব ১২০০ সালের দিকে গ্রীকরা ফিনিশিয়ানদের বর্ণমালাগুলোর ব্যবহার শুরু করে এবং স্বরবর্ণ যুক্ত করে।

চিত্রঃ ফিনিশিয়ান বর্ণমালা; image source- biblicalarchaeology

খ্রীস্টপূর্ব ৬০০ সালের দিকে গ্রীক বর্ণমালাগুলোকে ব্যবহারের মাধ্যমে আরেকটু উন্নতি ঘটায় ল্যাটিনযুক্ত বর্নমালা। শতাব্দীর মধ্যে এই বর্ণমালাগুলোই বারবার এক দেশ থেকে অন্যদেশে ব্যবহার হতে থাকে। সময়ের ক্রমবর্ধমান চলার কারণে দিনদিন ভাষার সাথে সাথে নিজস্ব পরিচয় প্রমাণের একটা ব্যাপার চলে আসে। এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে কোনো চিঠি পাঠালে বা রাজ্যের গুরত্বপূর্ণ যেকোনো মালামালে স্ট্যাম্প করা সিল থাকতো যেটার প্রচলন এখনো আছে। আস্তে আস্তে বাজারের বিনিময় প্রথা উঠে গিয়ে মুদ্রা বিনিময় চালু হতে থাকলে, প্রত্যেক দেশ ও জাতির মুদ্রাগুলোও একেক চিহ্ন-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসতে থাকে।

১০৬৯ খ্রীস্টাব্দের দিকে ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা মধ্যযুগের স্পেনের একজন অভিজাত বংশীয় ও সামরিক নেতা “এল সিড” এর নাম জানতে পারবো। ঐসময় স্বাক্ষরের প্রমাণ দেখা যায় তার স্বাক্ষর থেকেই।

হাতের লেখা স্বাক্ষর প্রসার হতে শুরু করে সব জায়গাতেই এবং ১৬৭৭ সালের দিকে, সেসময় স্ট্যাচু অব ফ্রড নির্মাণের জন্য ইংল্যান্ড পার্লামেন্ট যাবতীয় চুক্তি, কাগজ সবকিছুতে স্বাক্ষর ব্যবহার করে।

এরপর দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে তাদের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে, কোর্টে, পার্লামেন্টে স্বাক্ষরের প্রসার বাড়তে থাকে ।১৭৭৬ সালে জন হেনকক (আমেরিকার কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট) স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য স্বাক্ষর প্রদান করেন।

চিত্রঃ জন হেনককের স্বাক্ষর; image source- Wikimedia

প্রযুক্তির অগ্রসর সময়ের সাথেসাথে বাড়তে থাকে। এমনকি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম হয় নি। ১৮৬৯ সালে টেলিগ্রাফের মাধ্যমে নিউ হ্যাম্পশায়ার সুপ্রীম কোর্টে ডিজিটাল স্বাক্ষর চালু হয়।

এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ব গেলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ব গেলো কিন্তু স্বাক্ষরের ব্যবহার কমেনি। সেসময়কার শিক্ষিত মানুষরা তারা তাদের পুরো নাম ব্যবহারের পরিবর্তে সংক্ষিপ্ত নামের দিকে বেশি ঝুঁকেছিলো, যেটা স্বাক্ষর হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। এখনকার সময় আজও আপনি বিভিন্ন লেখকের নাম থেকে শুরু করে সব জায়গায় সংক্ষিপ্ত নাম ব্যবহারের প্রচলন দেখতে পান।

১৯৮০ সালের দিকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোর্ট ফ্যাক্স মেশিনের মাধ্যমে স্বাক্ষরতা গ্রহনের অনুমতি দেয়। ততদিনে মানুষ বিভিন্ন জায়গার জন্য দলিলে, আবেদনপত্রে, অফিসের ডকুমেন্টে স্বাক্ষরের ব্যবহার ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু করে। সেলফির এই দুনিয়ায় সেইসময় মানুষ বিখ্যাত ব্যাক্তিদের অটোগ্রাফ নিতো।

১৯৯৬ সালে জাতিসংঘ “UNCITRAL MODEL” প্রকাশ করে। এর মধ্যে ই-কমার্সের জন্য আইন তুলে ধরা হয়। এই আইন পুরো বিশ্বের ডিজিটাল স্বাক্ষরের ব্যবহারের উন্নতির জন্য অনেক প্রভাব ফেলে।

২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন ডিজ়িটাল স্বাক্ষরতা আইনে স্বাক্ষর প্রদান করে। এর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরের স্টেটগুলোর মধ্যে ও দেশের বাইরের বানিজ্যে ডিজিটাল চুক্তির বৈধতা চলে আসে। আজ আমরা যে অনলাইন বানিজ্য দেখছি,তার ব্যাপকভাবে প্রচলন কিন্তু ওইসময় থেকেই শুরু হয়।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

২০১০ সালে আর জে এস সফটওয়্যার কোম্পানি প্রথম এমন সফটওয়্যার বাজারে আনে যা আপনার স্বাক্ষরকে খুব সহজে তুলে ধরতে পারে এবং সেই স্বাক্ষরকে যেকোনো ডকুমেন্টে ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্রেতা অনলাইনে অর্ডার করলো কোনো পণ্য, তারপর সেটা কোম্পানি আনলো ক্রেতার কাছে, স্বাক্ষর প্রদান করলো। আগে কোনো চিঠি আসলে পিয়ন প্রাপকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিতো, ব্যাপারটা ঠিক সেরকম।

আর যে এস কোম্পানির সফটয়ার; image source- RJS software

বর্তমানে আমরা স্বাক্ষরতার ব্যবহার সব জায়গায় দেখতে পাই। এই ধরুন আপনি যখন স্কুল, কলেজে ভর্তি হলেন তখন আপনার বাবা-মা এর স্বাক্ষর। ভোটার আইডি কার্ড থেকে শুরু করে পাসপোর্টে, এমনকি আপনি ভার্সিটির ভর্তির পরীক্ষা বা চাকরীর পরীক্ষা দিবেন, সেই পরীক্ষার প্রবেশপত্রে কিন্তু আপনার স্ক্যান করা স্বাক্ষর থাকতেই হবে (যদিও গুটিকয়েক সংস্থায় এরকম চালু হয় নি)। যাই হোক, দেখলেন তো স্বাক্ষরতার গুরত্ব, ব্যবহার আর ইতিহাস। আজকের এই দুনিয়ায় আপনি স্বাক্ষর জানেন মানেই আপনি নিরক্ষর নন বলে ধরা হয়। বলতে গেলে, স্বাক্ষরতা শিক্ষিতদের একটি পরিচয় ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here