আলেকজেন্ডার ফ্লেমিং

আলেকজেণ্ডার ফ্লেমিং

পেনিসিলিনের আবিষ্কারক আলেকজেন্ডার ফ্লেমিংয়ের কথা আমরা অনেকবার শুনেছি। আজকে আমরা আলেকজেন্ডার ফ্লেমিংয়ের জীবনী সম্পর্কে জানবো।

জন্মঃ ১৮৮১ সালের ৬ই আগস্ট স্কটল্যান্ডের অন্তর্গত লকফিল্ড নামক এক পাহাড়ি গ্রামে।

বিখ্যাত হওয়ার কারণঃ পেনিসিলিন আবিষ্কার।

মৃত্যুঃ ১৯৫৫ সালে।

শৈশবকালঃ আলেকজেন্ডার ফ্লেমিং-এর জন্ম হয় ১৮৮১ সালের ৬ই আগস্ট স্কটল্যান্ডের অন্তর্গত লকফিল্ড নামক এক পাহাড়ি গ্রামে। বাবা ছিলেন চাষী। আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। দারিদ্রের মধ্যেই ছেলেবেলা কাটে ফ্লেমিংয়ের। যখন তাঁর সাত বছর বয়স, তখন বাবাকে হারান। অভাবের জন্য প্রাইমারী স্কুলের গণ্ডিটুকুও শেষ করতে পারেন নি।

কিশোরকাল ও শিক্ষাজীবনঃ যখন ফ্লেমিংয়ের বয়স ১৪ বছর, তাঁর ভাইরা সকলে এসে বাসা বাঁধল লণ্ডন শহরে। তাদের দেখাশোনার ভার ছিল এক বোনের উপর। কিছুদিন কাজের সন্ধানে ঘোরাঘুরি করবার পর ষোল বছর বয়স এক জাহাজ কোম্পানিতে চাকরি পেলেন ফ্লেমিং। অফিসে ফাইফরমাশ খাটার কাজ। কিছুদিন চাকরি করেই কেটে গেল। ফ্লেমিংয়ের এক চাচা ছিলেন নিঃসন্তান। হঠাৎ তিনি মারা গেলেন। তার সব সম্পত্তি পেয়ে গেলেন ফ্লেমিংয়ের ভাইরা। আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের বড় ভাই টমের পরামর্শ মত ফ্লেমিং জাহাজ কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হলেন। অন্য সকলের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও অসাধারণ মেধায় অল্পদিনেই সকলকে পেছনে ফেলে মেডিক্যাল স্কুলের শেষ পরীক্ষায় প্রথম হলেন ফ্লেমিং। তিনি সেন্ট মেরিজ হাসপাতালে ডাক্তার হিসাবে যোগ দিলেন।

কর্মজীবনঃ ১৯০৮ সালে ডাক্তারির শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন কারণ, সেনাবাহিনীতে খেলাধুলোর সুযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। কয়েক বছর সামরিক বাহিনীতে কাজ করবার পর ইউরোপ জুড়ে শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সে সময় ফ্লেমিং ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর ডাক্তার হিসাবে কাজ করছিলেন। তিনি ব্যাকটেরিয়া নিয়ে যে গবেষণা করেছিলেন, এখানেই প্রথম তার পরীক্ষা করার সুযোগ পেলেন।

হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য সৈনিক এসে ভর্তি হচ্ছিল। তাদের অনেকেরই ক্ষত ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা দূষিত হয়ে উঠেছিল। ফ্লেমিং লক্ষ্য করলেন, যেসব অ্যান্টিসেপটিক ঔষধ চালু আছে তা কোনোভাবেই কার্যকরী হচ্ছে না—ক্ষত বেড়েই চলেছে। যদি খুব বেশি পরিমাণে অ্যান্টিসেপটিক ঔষধ ব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া কিছু পরিমাণে ধ্বংস হলেও দেহকোষগুলি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফ্লেমিং উপলব্ধি করলেন দেহের স্বাভাবিক শক্তি একমাত্র এসব ব্যাকটেরিয়াগুলি প্রতিরোধ করতে পারে কিন্তু তার ক্ষমতাও সীমাবদ্ধ।

১৯১৮ সালে যুদ্ধ শেষ হলো। দু মাস পর ইংল্যাণ্ডে ফিরে এলেন ফ্লেমিং। অনেক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করার মতো কোনো কিছুই তিনি খুঁজে পেলেন না।

গবেষণা ও পেনিসিলিন আবিষ্কারঃ ইংল্যান্ডে ফিরে এসে তিনি সেন্ট মেরিজ মেডিক্যাল স্কুলে ব্যাকটেরিওলজির প্রফেসর হিসাবে যোগ দিলেন। এখানে পুরোপুরিভাবে ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করলেন মানবদেহে কিছু নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে যা এই বহিরাগত জীবাণুদের প্রতিরোধ করতে পারে। কিন্তু তিনি তার প্রত্যক্ষ কোন প্রমাণ পেলেন না।

১৯২১ সাল একদিন ল্যাবরেটরিতে বসে কাজ করছিলেন ফ্লেমিং। কয়েকদিন ধরেই তার শরীরটা ভাল যাচ্ছিল না। সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। তিনি তখন প্লেটে জীবাণু কালচার নিয়ে কাজ করছিলেন হঠাৎ প্রচণ্ড হাঁচি এল। ফ্লেমিং নিজেকে সামলাতে পারলেন না। প্লেটটা সরাবার আগেই নাক থেকে খানিকটা সর্দি এসে পড়লো প্লেটের উপর। পুরো জিনিসটা নষ্ট হয়ে গেল দেখে প্লেটটা একপাশে সরিয়ে রেখে নতুন একটা প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করলেন। কাজ শেষ হয়ে গেলে তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন। পরদিন ল্যাবরেটরিতে ঢুকেই টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখা প্লেটটার দিকে তাঁর নজর পড়লো। ভাবলেন প্লেটটা ধুয়ে কাজ শুরু করবেন। কিন্তু প্লেটটা তুলে ধরতেই চমকে উঠলেন। গতকাল প্লেট ভর্তি ছিল জীবাণু কিন্তু সেগুলো আর নেই। ভাল করে পরীক্ষা করতেই দেখলেন সব জীবাণুগুলো মারা গিয়েছে।

চমকে উঠলেন ফ্লেমিং। কীসের শক্তিতে নষ্ট হলো এতগুলো জীবাণু। ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল গতকাল খানিকটা সর্দি পড়েছিল প্লেটের উপর। তবে কি সর্দির মধ্যে এমন কোনো উপাদান আছে যা এই জীবাণুগুলোকে ধ্বংস করতে পারে? পরপর কয়েকটা জীবাণু কালচার করা প্লেট টেনে নিয়ে তার উপর নাক ঝাড়লেন । দেখা গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই জীবাণুগুলো নষ্ট হতে আরম্ভ করেছে। এই আবিষ্কারের উত্তেজনায় নানাভাবে পরীক্ষা শুরু করলেন ফ্লেমিং। দেখা গেলো চোখের পানি, থুতুতেও জীবাণু ধ্বংস করবার ক্ষমতা আছে। দেহনির্গত এই প্রতিষেধক উপাদানটির নাম দিলেন লাইসোজাইম। লাইস অর্থ ধ্বংস করা, বিনষ্ট করা। জীবাণুকে ধ্বংস করে তাই এর নাম লাইসোজাইম।

একজন পুলিশ কর্মচারী মুখে সামান্য আঘাত পেয়েছিল, তাতে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল তা দৃষিত হয়ে রক্তের মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়েছিল। ডাক্তাররা তার জীবনের সব আশা ত্যাগ করেছিল। ১৯৪১ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি প্রফেসর ফ্লোরি স্থির করলেন এই মৃত্যু পথযাত্রী মানুষটির উপরেই পরীক্ষা করবেন পেনিসিলিন। তাকে তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর চারবার পেনিসিলিন দেওয়া হলো। ২৪ ঘণ্টা পর দেখা গেলো যার আরোগ্য লাভের কোনো আশাই ছিল না, সে প্রায় সুস্থ হয়ে উঠেছে। এই ঘটনায় সকলেই উপলব্ধি করতে পারলো যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কীরকম যুগান্তকারী প্রভাব বিস্তার করতে চলেছে পেনিসিলিন।

ডাঃ চেইন বিশেষ পদ্ধতিতে পেনিসিলিনকে পাউডারে পরিণত করলেন। এবং ডাঃ ফ্লোরি তা বিভিন্ন রোগীর উপর প্রয়োগ করতেন। কিন্তু যুদ্ধে হাজার হাজার আহত মানুষের চিকিৎসায় ল্যাবরোটারিতে প্রকৃত পেনিসিলিন প্রয়োজনের তুলনায় সেটা ছিল নিতান্তই কম।

আমেরিকার Northern Regional Research ল্যাবরেটরি এই ব্যাপারে সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলো। মানব কল্যাণে নিজের এই আবিষ্কারের ব্যাপক প্রয়োগ দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে উঠেছিলেন ফ্লেমিং।

বিদেশ ভ্রমণ ও নোবেল পুরস্কারে লাভঃ মানুষের কলকোলাহলের চেয়ে প্রকৃতির নিঃসঙ্গতাই তাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করতো। মাঝেমাঝে প্রিয়তমা পত্নী সারিনকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। সারিন শুধু যে তার স্ত্রী ছিলেন তাই নয়, ছিলেন তার যোগ্য জীবনসঙ্গী।

১৯৪৪ সালে ইংল্যান্ডের রাজদরবারের তরফ থেকে তাঁকে নাইট উপাধি দেওয়া হলো। ১৯৪৫ সাল.তিনি আমেরিকায় গেলেন।

১৯৪৫ সালের শেষ দিকে তিনি ফরাসী গভর্নমেন্টের আমন্ত্রণে ফ্রান্সে গেলেন। সর্বত্র তিনি বিপুল সম্মাননা পেলেন। প্যারিসে থাকাকালীন সময়েই তিনি জানতে পারলেন এ বৎসরে মানব কল্যাণে পেনিসিলিন আবিষ্কারের এবং তার সার্থক প্রয়োগের জন্য নোবেল প্রাইজ কমিটি চিকিৎসাবিদ্যালয় ফ্লেমিং, ফ্লোরি ও ডঃ চেইনকে একই সাথে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করেছেন। এই পুরষ্কার পাওয়ার পর ফ্লেমিং কৌতুক করে বলেছিলেন, এই পুরস্কারটি ঈশ্বরের পাওয়া উচিত কারণ তিনিই সবকিছু আকস্মিকভাবে যোগাযোগ ঘটিয়েছেন।

শেষ জীবনঃ ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে তিনি আবার সেন্ট মেরি হাসপাতালে ব্যাকটেরিওলজির গবেষণায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। চার বছর পর তাঁর স্ত্রী সারিন মারা যান। এই মৃত্যুতে মানসিক দিক দিয়ে ভেঙে পড়লেন।

তার জীবনের এই বেদনার্ত মুহূর্তে পাশে এসে দাড়ালেন গ্রীক তরুণী আমালিয়া তরুকা। আমালিয়া গেমিংয়ের সাথে ব্যাকটেরিওলজি নিয়ে গবেষণা করতেন। ১৯৫৩ সালে দুজনে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হলেন। কিন্তু এই সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হলো না। দুই বছর পর ১৯৫৫ সালে ৭৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ফ্লেমিং।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here