কম্পিউটার আবিষ্কারের ইতিহাস

কম্পিউটার বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী বিষ্ময় ও আধুনিকতম আবিষ্কার। শিল্প বিপ্লবের পর থেকে যন্ত্রবিজ্ঞানের জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে। মানুষের কর্মজীবনে অনুগত ভৃত্যের মতো হুকুম পালন করতে যে যন্ত্র সদা ব্যস্ত তার নাম কম্পিউটার। ল্যাটিন ‘compute’ শব্দ থেকে ‘computer’ শব্দটির উৎপত্তি। আভিধানিক অর্থে কম্পিউটার হলো এক ধরনের গণক যন্ত্র। কিন্তু এখন কম্পিউটারকে কেবল গণনাকারী বলা চলে না। এখন কম্পিউটার বলতে একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ধারণা দেয় যা অগণিত তথ্য বা উপাত্ত গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সংরক্ষণ, গণনা, বিশ্লেষণ ইত্যাদি করতে পারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

প্রাচীন কালে যখন লিখিত সংখ্যার উৎপত্তি হয়নি তখন গণনার জন্য মানুষ হাতের আঙ্গুল ব্যবহার করতো। কিন্তু ১০ এর বেশি গণনার দরকার হওয়ার পর থেকে মানুষ নানা রকম নুড়ি পাথর, পশুর হাড়, গাছের বাকল প্রভৃতি ব্যবহার করতে শুরু করে। গণনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাচীন যে সরঞ্জাম পাওয়া যায় তাহলো খাঁজযুক্ত হাড়। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪,০০০ বছর পূর্বে এসব হাড়ের ব্যবহার পাওয়া যায় দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে। এছাড়া খ্রিষ্টপূর্ব ৩০,০০০ বছর পূর্বে ইসাঙ্গো হাড় নামক আরেক ধরনের গণনার সরঞ্জাম পাওয়া যায়। এই হাড়ের গায়ে কয়েকটি খাঁজের সেটের মত প্যাটার্ন দেখা যেত। অনেকটা ট্যালির মত। অনেকের ধারণা মতে এগুলো চন্দ্রভিত্তিক দিনপঞ্জি হিসেবে ব্যবহার হতো। সভ্যতার অগ্রগতির সাথে গণনার প্রয়োজন সকল ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

সর্বপ্রাচীন কম্পিউটার অ্যাবাকাস:

কাঠের ফ্রেমের অ্যাবাকাস; সবচেয়ে প্রাচীন গণনা যন্ত্র; image source: Pinterest.com

কম্পিউটারের ইতিহাস শুরু হয়েছিল অ্যাবাকাস এর উৎপত্তির মাধ্যমে। ইতিহাসবিদদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০-২৩০০ অব্দে সুমেরীয় বা মেসোপটেমীয় সভ্যতায় অ্যাবাকাস প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই অ্যাবাকাস গুলোতে অনেকগুলো কলাম ক্রমান্বয়ে সজ্জিত থাকতো যার মাধ্যমে বিভিন্ন মান প্রকাশিত হতো। একটি আয়তাকার ফ্রেমে অনেকগুলো সমান্তরাল বা উলম্ব সারিতে প্লাস্টিক বা কাঠের পুঁতি বসিয়ে অ্যাবাকাস তৈরী করা হয়েছিলো। সাত থেকে দশটি পুঁতি বসানো থাকতো প্রতি সারিতে। এগুলো গণনা করে যোগ বা বিয়োগ করা হতো। অনেক প্রাচীন সভ্যতায় গাণিতিক হিসাবের প্রয়োজনে অ্যাবাকাস ব্যবহার করা হতো। চীন, জাপান, ভারত সহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল।

খ্রিষ্টপূর্ব ১১১০ সালে প্রাচীন চীনদেশে একটি যানে প্রথম ডিফারেন্সিয়াল গীয়ার প্রচলিত হয়েছিল। এর নাম দক্ষিণ – নির্দেশী রথ। এই ডিফারেন্সিয়াল গিয়ার পরবর্তীকালে ব্যবহার করা হয়েছিল এনালগ কম্পিউটারে। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ অব্দে অ্যাবাকাসের অপেক্ষাকৃত আধুনিক সংস্করণ তৈরী করা হয়। আধুনিক কম্পিউটারের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে কিছু ধারণার উপর। ভারতবর্ষীয় ব্যাকরণবিদ পাণিনি ৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অষ্ঠাধ্যায়ী নামক একটি বই রচনা করেন। এই বইতে মেটারুল, রিকারশন বা পুনরাবৃত্তি, রূপান্তর ইত্যাদি ধারণার প্রয়োগ পাওয়া যায়। এই ধারণাগুলো আধুনিক কম্পিউটারের ভিত্তিস্বরুপ।

স্কটল্যান্ডেরর গণিতবিদ জন নেপিয়ার গণনার কাজে এক ধরণের দণ্ড ব্যবহার করেন। এই দণ্ড নেপিয়ারের অস্থি বা নেপিয়ার বোন নামে পরিচিত। ভিলহেম স্কিকার্ড নামক জার্মানির একজন প্রফেসর ১৬২৪ সালে নতুন ধরনের একটি ক্যালকুলেটিং মেশিন তৈরি করেন। তার মেশিনটি ১৭ শতকের ডিরেক্ট এন্ট্রি ক্যালকুলেটিং মেশিন গুলোর মধ্যে একদম প্রথম দিকের।

জন নেপিয়ারের আবিষ্কৃত নেপিয়ার বোন বা অস্থি; image source: Pinterest.com

প্যাসকেলের গণনাযন্ত্র:

১৬৪২ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী ব্লেইজ প্যাসকেল সর্বপ্রথম যান্ত্রিক ক্যালকুলেটর আবিষ্কার করেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। তিনি গিয়ারের সাহায্যে যোগ বিয়োগ করার পদ্ধতি চালু করেন। ১৬৭২ সালে জার্মান গণিতবিদ গটফ্রাইড উইলহেলম লিবনিজ প্যাসকেলের যন্ত্রের ভিত্তিতে রেকোনার (ডিজিটাল সংখ্যা গনকযন্ত্র) আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রের কাজ সম্পন্ন হয় ১৬৯৪ সালে। তার এই যন্ত্র যোগ বিয়োগের পাশাপাশি গুণ, ভাগ এমনকি বর্গমূলও করতে পারতো।

ডিফারেন্স ও অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন:

উনিশ শতকের শুরুর দিকে চার্লস ব্যাবেজ ডিফারেন্স ইঞ্জিন নামক একটি যন্ত্র নির্মাণ করেন। ১৮১০ সালে প্রথম যান্ত্রিক উপায়ে গণনা করার জন্য যন্ত্র উদ্ভাবনের কথা ভাবেন তিনি। প্রথমে ৮ দশমিক ঘর পর্যন্ত এবং পরবর্তীকালে ২০ দশমিক সংখ্যা পর্যন্ত সংখ্যা গণনার যন্ত্র তৈরি করেন তিনি। ১৮৩৭ সালে তিনি অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন বা বিশ্লেষণ ধর্মী যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এই যন্ত্রের গাণিতিক হিসাব করার ক্ষমতা ছাড়াও যান্ত্রিক স্মৃতিশক্তি, যুক্তি নির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। এই যন্ত্র পাঞ্চ কার্ড দিয়ে চালিত হতো এবং ক্রমানুযায়ী একের পর এক কার্য সম্পাদন করতে পারতো। যন্ত্রটি আধুনিক কম্পিউটারেরই প্রথম সংস্করণ ছিল। তাই, চার্লস ব্যাবেজকে কম্পিউটিং এর অন্যতম পথিকৃৎ বলে মনে করা হয়।

চার্লস ব্যাবেজের তৈরি অ্যানালাইটিকাল ইঞ্জিন; image source: Pinterest.com

কবি লর্ড বাইরনের মেয়ে এডা বাইরন চার্লস ব্যাবেজের অ্যানালিটিকাল ইঞ্জিন প্রকল্পে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এই সময় তিনি সংখ্যা গণনা করার অ্যালগরিদম বা ধাপে ধাপে সমাধান করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। কম্পিউটারের সর্বপ্রথম এলগরিদম এটিই ছিল।

অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম:

মানব সভ্যতার ইতিহাসের প্রথম অ্যানালগ কম্পিউটার বলা হয় অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম কে। প্রাচীন গ্রীসের লোকেরা গ্রহ- নক্ষত্রের সূক্ষ্ম হিসাব রাখতে অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম নামক যন্ত্রটি ব্যবহার করতো। দক্ষিণ গ্রীসের সমুদ্র উপকূলে ডুবে থাকা একটি রোমান জাহাজ থেকে যন্ত্রটি উদ্ধার করা হয়েছিল। ১৯০১ সালে উদ্ধার করা হলেও পরবর্তী কয়েক দশক গবেষকরা যন্ত্রটির ব্যবহার সম্পর্কে তেমন কিছুই বলতে পারে নি। ১৯৫৯ সালে ডেরেক প্রেইস নামক ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ এই যন্ত্রটিকে নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র বলেন। যন্ত্রটির তিনটি ডায়াল ছিল। ৩৬৫ দিনের ক্যালেন্ডার, ২৩৫ মাসের মেটোনিক সার্কেল এবং সারোস সার্কেলে গ্রহের অবস্থান জানা যেত ডায়াল গুলোর মাধ্যমে। বর্তমানে এই কাজগুলো কম্পিউটারের সাহায্যে করা হয়। যন্ত্রটির কার্যক্রম ঘড়ির কার্যক্রমের সাথেও মিল ছিল। যন্ত্রটির সাথে L আকৃতির একটি হাতল লাগানো ছিল। এর সাহায্যে একটি তারিখ নির্দিষ্ট করে দিলে সঙ্গেসঙ্গে যন্ত্রটি সেই তারিখের গ্রহ- নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করে ফেলতে পারতো। এই যন্ত্রটির সাহায্যে বিভিন্ন দিনক্ষণের হিসাব যেমনঃ প্রাচীন অলিম্পিক গেমসের সময়ের হিসাবও রাখা হতো। ব্রোঞ্জ, পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি যন্ত্রটি কীভাবে দুই হাজার বছর আগে এতো নির্ভুলভাবে তৈরি হয়েছিল তা ভাবলে সত্যিই এখনো অবাক হতে হয়।

সমুদ্র থেকে উদ্ধারকৃত সেই বিষ্ময়: অ্যান্টিকিথেরা মেকানিজম; image source: Pinterest.com

দ্বিমূল তত্ত্ব বা বাইনারী লজিক:

আধুনিক কম্পিউটারের ভিত হলো বাইনারি লজিক। যা তৈরি হয়েছিল ১৭০২ সালে গটফ্রাইড উইলহেম লিবনিজ এর হাতে। বাইনারি লজিকে সমস্ত তথ্য ০ ও ১ এই দুই সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এরপর দেড় শতাধিক বছর পরে জর্জ বুল বুলিয়ান বীজগনিত প্রকাশ করেন। ১৮০১ সালে যোসেফ মেরি জ্যাকর্ড পাঞ্চকার্ড নিয়ন্ত্রিত তাঁত কাজে লাগান। একাধিক ছিদ্র যুক্ত এই তাঁতে একটি ছিদ্র একটি বাইনারি ১ এবং একটি স্পট কার্ড একটি বাইনারি ০ নির্দেশ করতো। ০ ও ১ এর সাহায্যে একটি যন্ত্রকে কীভাবে নির্দেশ পাঠানো যায়, বিজ্ঞানীরা তা এই যন্ত্রের সাহায্যে বুঝেছে।

অ্যালেন টুরিং ও টুরিং মেশিন:

শিল্প বিপ্লবের এক পর্যায়ে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়। সামরিক কাজে কম্পিউটারের ব্যবহার তখন অনেক বাড়তে থাকে। এই যুদ্ধের সময়ই মানুষ প্রথম বুঝতে পারে যে তথ্য জিনিসটাও এক প্রকার শক্তি। অ্যালান টুরিং নামক একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী তখন প্রোগ্রামেবল কম্পিউটারের ধারণা দেন। কম্পিউটার বিজ্ঞানের দুটি মৌলিক ধারণার সাথে তার নাম জড়িত – টুরিং টেস্ট ও টুরিং মেশিন

তিনি জার্মান নৌবাহিনীর গুপ্ত সংকেত বিশ্লেষনে নিয়োজিত হাট-৮ এর নেতৃত্বে ছিলেন। জার্মান সৈন্যরা সাংকেতিক ভাষায় তাদের বার্তা আদান প্রদান করতো। টুরিং এর তৈরি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক যন্ত্র জার্মানির এনিগমা মেশিনের কোড ডিকোড করতে পারতো। এই কোড গুলো এত বেশি দুর্বোধ্য ছিল যে, বড় বড় গণিতবিদদেরও এসব বুঝতে অনেক বেগ পেতে হতো। টুরিং এর অবদানের কারণে জার্মানদের কোড নিমিষে পড়ে ফেলতে পারতো আমেরিকানরা। টুরিং এর কম্পিউটারের বদৌলতে আমেরিকার জার্মান বধের পথ অনেক সহজ জয়ে যায়। টুরিং এর এতো অবদানের জন্যই তার নামে দেওয়া হয় “টুরিং পুরষ্কার” যা কিনা কম্পিউটার বিজ্ঞানের নোবেল নামে অভিহিত হয়।

আধুনিক কম্পিউটার:

১৮৮৭ সালে ড: হরম্যান হলেরিথের যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারীর কাজে ব্যবহার করার জন্য চার্লস ব্যাবেজ একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। যা দ্বারা দ্রুত আদমশুমারির কাজ করা যেত। এই যন্ত্র তৈরি করতে তখন যে কোম্পানি সাহায্য করেছিল এর সাথে আরও কিছু কোম্পানি একত্র হয়ে গঠন করেছে বিখ্যাত আইবিএম কোম্পানি।

১৯৪৪ সালে তৈরি করা হয় Mark-1। যা ছিল প্রথম স্বয়ংক্রিয় ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ডিজিটাল কম্পিউটার। অধ্যাপক হাওয়ার্ড এইচ আইকেন ও IBM এর ৪ জন প্রকৌশলী মিলে তৈরি করেন এটি। ১৯৪৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি তৈরি করা হয় প্রথম প্রজন্মের কম্পিউটার ENIAC । ১৯৪৬ সালে প্রফেসর মরিস উইলকস EDSAC কম্পিউটার তৈরি করেন। ১৯৫১ সালে প্রথম বাণিজ্যিক ইলেক্ট্রিকাল কম্পিউটার তৈরি হয়। যার নাম ছিল UNIVAC-1। গণনা করা ছাড়াও কম্পিউটারটি পড়া ও তথ্য লেখার কাজ করতে পারতো।

১৯৪৮ সালে আবিষ্কৃত হয় ট্রানজিস্টর। এরপর ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট আবিষ্কৃত হলে কম্পিউটারের আকার ছোট হয়ে যায় এবং গুণগত মান ও কাজের গতি বেড়ে যায়। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম কম্পিউটার আসে ১৯৬৪ সালে। পরমাণু শক্তি গবেষণা কেন্দ্রে প্রথম কম্পিউটারটি স্থাপন করা হয়। IBM এর মেইনফ্রেম এটি ১৬২০ কম্পিউটার ছিল।

প্রযুক্তি এগোতে থাকে দ্রুত গতিতে। এর সাথে পুরোনো কম্পিউটার পরিবর্তিত হয়ে আরও আধুনিক ও কর্মক্ষম হয়ে উঠে। ১৯৭১ সালে আমেরিকার ইন্টেল কোম্পানি তৈরি করে মাইক্রোপ্রসেসর। এক বর্গ ইঞ্চি মাপের সিলিকন পাতের ভিতরে হাজার হাজার ট্রানজিস্টর বসিয়ে তৈরি করা হয় মাইক্রোপ্রসেসর। এই আবিষ্কারের ফলে কম্পিউটারের দাম চলে আসে মানুষের নাগালের মধ্যে, কাজের পরিধি বেড়ে দাড়ায় অনেক গুণ। জীবন হয়ে যায় সহজতর।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here