করোনাভাইরাসঃ মানুষের উপর প্রকৃতির প্রতিশোধ?

শত শত বছর পূর্বে ধর্ম পিপাসু মুসলমানরা দীর্ঘ কয়েক মাস পায়ে হেঁটে মক্কা পৌঁছাতো হজ পালনের উদ্দশ্যে। এরপর আসলো জাহাজ, তাতে সময় অনেকটা কমে আসে। আর সময়ের পরিক্রমায় বর্তমানে  উড়োজাহাজের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টায় পরিভ্রমণ করা যায় সম্পূর্ণ পৃথিবী। মানুষকে এখন আর প্রাকৃতিক বায়ুর উপর নির্ভর করতে হয়না, এয়ারকন্ডিশনারের জাদুতে ঘরে বসে রুমের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কিছুদিন আগেও যেখানে কোরবানির গোস্ত দু-এক দিনের মধ্যেই গরীব মিসকিনদের বন্টন করে আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে সাবাড় করে ফেলতো এখন তা সংরক্ষণ করে রেফ্রিজারেটরের মাধ্যমে আগামী কোরবানি পর্যন্ত। আধুনিক সভ্যতা আমাদের মাঝে বেগের সঞ্চার করলেও অধিকন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ।

বর্তমান জীবন আরও গতিময়তা লাভ করে ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিষ্কারের পর থেকে। ফলে পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয় তালুবন্দী। এসবকিছুই মানুষ করেছে তার নিজের সুবিধা বিবেচনা করে। আমরা চাঁদ পর্যন্ত পৌছে গিয়েছি কিন্তু কখন যে এই মেদিনীকে ক্রমশ  গলা টিপে ধরেছি তা টেরই পাইনি। আমাদের পদতলে প্রকৃতি ক্রমশ হাশপাশ করছে। কল-কারখানার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার আর  যোগাযোগ ব্যবস্থায় ক্রমশ গতি আসার ফলে প্রকৃতিকে প্রতিনিয়ত উপহার দিচ্ছি আমরা বিষাক্ত CO2, CO, N2O ইত্যাদি গ্যাস। তাছাড়া বসবাসের জন্য বিলাসবহুল আবাসন গঠনে ধ্বংস করছি বনাঞ্চল, ফলাফলে বিশ্ব ক্রমশ হয়ে উঠছে উষ্ণ গ্যাসপিন্ডে, মেরু অঞ্চলের বরফ গলে নিমজ্জিত হচ্ছে বিশ্বের নিম্ন অঞ্চলের দেশসমূহ। AC বা ফ্রিজে ব্যবহৃত ফ্রেয়ন ফুটো করছে ওজনস্তরকে, ফলে পৃথিবীতে প্রবেশ করছে সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো তাদের শক্তি প্রদর্শনের লক্ষ্যে বাড়াচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ যা ইতোমধ্যে ধ্বংস করেছে পার্ল হারবার, নাগাসাকি ও হিরোশিমার মতো নগরী। বিশ্ব মোড়লরা ক্ষমতা বাড়ানোয় যতটা চিন্তিত পরিবেশ রক্ষায় ততটা চিন্তিত নন। বিশ্ব মোড়লখ্যাত যারা আজ পৃথিবীকে শাসন করছে অর্থাৎ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য (বিগ ৫) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া ও ফ্রান্স তারাই পৃথিবীকে সিংহভাগ দূষিত করছে। পরিবেশ বিষয়ক কিছু চুক্তি যেমন ভিয়েনা কনভেনশন, কিয়োটো প্রটোকল, মন্ট্রিল প্রটোকল,প্যারিস চুক্তি, CTBT চুক্তি করলেও বাস্তবে পরিবেশ উন্নয়নে তা এখনো কার্যকর কোন প্রভাব ফেলেনি।

কোয়ারান্টাইন এলাকায় বাতাসে দূষণের পরিমাণ অনেক কমেছে। Image: france24.com

পৃথিবী যখন অস্থির হয়ে উঠলো এমন পরিস্থিতিতে তখনই আঘাত হানলো নভেল করোনা বা COVID-19  নামক এক ভাইরাস । ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের উহান শহরে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয় । গত কয়েক মাসে তা বিশ্বের ২০৪ টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১ লাখেরও বেশি লোক মারা যায়। বাংলাদেশেও এর সংক্রমণ বেড়েই চলেছে প্রতিনিয়ত। উন্নত রাষ্ট্রগুলো এর প্রতিষেধক আবিষ্কারে ব্যর্থ হওয়ায় তারা এখন লাশের সারিতে দিশেহারা। সংক্রমণ ঠেকাতে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ আজ গৃহবন্দি, থমকে গেছে পৃথিবীর গতিশীল পরিস্থিতি। সৃষ্টিকর্তা হয়তো পৃথিবীকে ধ্বংসকারীদের জন্য শাস্তিস্বরূপ জেলখানায় প্রেরণ করেছে যেমনটা আমরা করি থাকি মানুষের আদালতে। আমরা ধীরে ধীরে যে প্রকৃতিকে এক অসবুজ মরুভূমি বানানোর যুদ্ধে নেমেছিলাম সৃষ্টিকর্তা তা আমাদের প্রয়োজনেই সজিবতা ফিরিয়ে দিচ্ছে। আয়তন অনুসারে যেখানে প্রতিটি দেশের ২৫% বনভূমি থাকা প্রয়োজন সেখানে আমাদের মত সবুজের দেশেই  ১৩% এবং আমাদের পাশের দেশ ভারতে ২১%  কাগজে কলমে পাওয়া যায়, যা আবার আমরা ক্রমশ নষ্ট করে চলেছি। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রেইনফরেস্ট দক্ষিন আমেরিকার আমাজন যা সমগ্র পৃথিবীর ২০% অক্সিজেন সরবরাহ করে। পৃথিবীর এই ফুসফুসকে আমরাই প্রতিনিয়ত ধংস করছি প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট দাবানলের মাধ্যমে যার দায়ভার আমাদেরই।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

করোনা পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে বিশ্বের চিত্র। ফলে প্রকৃতি এখন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে মানুষকে গৃহবন্দী করার মাধ্যমে। চীনের আকাশে কিছু দিন আগেও বায়ু দূষণের প্রভাবে সবসময় থাকতো কুয়াশাচ্ছন্ন সেখানে গত তিন মাসের লকডাউনের ফলে বেইজিংবাসী দেখছে স্বচ্ছ আকাশ। ইউরোপের দেশগুলোর অবস্থাও চোখে পড়ার মতো, বাতাসে দূষণের মাত্রা কমে প্রায় ৫০% নেমে এসেছে। ঝকঝকে আকাশ আর নির্মল বাতাস উপভোগ করার সুযোগ  তৈরী হচ্ছে মানুষের, যা কিছু দিন আগেও এ ভাবনা ছিল স্বপ্নের মতো। বিভিন্ন শহরে পদদলিত হওয়া গাছগুলো আজ মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, নোংরা আবর্জনায় কালো হওয়া শহরের নদীর পানি ফিরে পাচ্ছে স্বচ্ছতা। আমাদের বড় সম্পদ পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। সেখানে এখন গোলাপী ডলফিনের ঝাঁক তীরে এসে জল নৃত্য করছে ,খাঁচায় বন্দী থাকা পাখিগুলো যেনো ছাড়া পেয়ে সমুদ্র সৈকতে ভীড় করছে। কক্সবাজারের সাদা তেজস্ক্রিয় বালু যেটা আমরা চিপসের প্যাকেট ও 7up এর বোতল দিয়ে নষ্ট করেছি সেখানে এখন নক্সী কাথার মত সাগড় লতায় ছেয়ে গেছে। পুরো পৃথিবী সেজেছে নতুন সাজে। আমরা যেমন এই মরণঘাতী ভাইরাস থেকে বাঁচতে চাই তেমনি পৃথিবীর জীব বৈচিত্র্য ও সবুজ প্রকৃতি চিৎকার করে বলছে আমাদেরও বাঁচতে দাও আমরা তোমাদের জন্য এক বাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করবো। যুগে যুগে সুইডেনের গ্রেটা থানবার্গের মতো অনেক পরিবেশ কর্মী দ্ব্যর্থহীন ভাবে বিশ্বের ক্ষমতাবান নেতাদের আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে যে, উন্নতি আর ক্ষমতা প্রদর্শনের  যুদ্ধে মেতে উঠে পরিবেশকে কতটা ক্ষতির মুখে ফেলে দিয়েছে।

‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ নামে পৃথিবীর ১৮৮ দেশের স্কুলের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে পরিবেশ বিষয়ক যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো গ্রেটা থানবার্গ তাতেও কর্ণপাত করেনি বিশ্ব নেতারা। তবে পরিস্থিতি এখন আমাদের করেছে সময়ের মুখোমুখি। এখনই এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না নেয়া হলে আগামীর বিশ্ব বিভিন্ন পরিবেশ দূর্যোগের মাধ্যমে মানুষের লাশের সারি দীর্ঘ করবে। হয়তো সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে আমরা এই ভাইরাস হতে দ্রুত মুক্তি পাব, তবে COVID-19 আমাদের কিছু শিখাতে পারলো কী? ধর্ম কর্ম বা সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যে পাপাচারের রাজ্য তৈরি করেছি তা থেকে আমরা কী পারবো আবার সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরতে? আমরা কী পারবো নিজেদের প্রয়োজনে এই পৃথিবীকে দূষণমুক্ত রাখতে? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজতে হবে আমাদেরই।  তবেই ভাল থাকবে আমাদের বসুন্ধরা। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here