করোনা কালীন কারখানার শ্রমিক-মালিকদের অধিকার বিষয়ে ‘শ্রম আইন-২০০৬’ কী বলে?

১. শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী শ্রমিক / কর্মচারী বেতনের ব্যয় হ্রাস করার জন্য কোনও সুযোগ আছে কী?

বিকল্প এক: –

আইনের ১২ ধারা অনুসারে, কোনও নিয়োগকর্তা মহামারীসহ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেকোনও কারণে কাজ বন্ধ করতে বা কারখানা বা স্থাপনা বন্ধ করতে পারে।

ক। যদি কর্মবিরতির সময়কাল ১ (এক) কার্য দিবসের বেশি অবধি অব্যাহত থাকে (সাময়িক বা বদলী কর্মী ব্যতীত) প্রতিটি সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে ১ (এক) দিনের বেশি সকল বন্ধ কর্মদিবসের মজুরি প্রদান করতে হবে।

খ। যদি কর্মবিরতির সময়কাল ৩ (তিন) কার্যদিবসের বেশি হয়ে যায়, তবে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের ধারা 16 এর বিধান অনুসারে লে-অফ করা হবে।

লে-অফকৃত কর্মীর ক্ষতিপূরণের বিধানঃ—

 যে শ্রমিক (সাময়িক বা বদলী কর্মী ব্যতীত) প্রতিষ্ঠানে ১ (এক) বছর বা তার বেশি উক্ত মালিকের অধীনে চাকুরি সম্পন্ন করেছেন, তাহলে সে (সাপ্তাহিক ছুটি ব্যতীত) তিনি লে-অফকৃত সকল দিনের জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন।

 তবে (ধারা ১৬ অনুযায়ী) মালিক এবং শ্রমিকের মধ্যে ভিন্ন কোন চুক্তি না থাকলে, এক ক্যালেন্ডার বছরে সর্বাধিক ৪৫ দিনের বেশি দিনের জন্য ক্ষতিপূরণ পাবে না।

লে-অফের সময় ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হবে —

 সর্বাধিক ৪৫ দিনের ক্ষতিপূরণের হিসাব-

– বেসিক বেতনের অর্ধেক এবং
– মূল্যবৃদ্ধি ভাতার অর্ধেক এবং
– অ্যাড-হক বা অন্তর্বর্তীকালীন বেতনের (যদি থাকে) অর্ধেক এবং
– আবাসন ভাতার (যদি থাকে) সম্পুর্ণ পরিমাণ (যা তাকে লে- অফ না করা হলে পেতেন)।

তবে, এই বিধানের বিপরীতে যদি নিয়োগকর্তা এবং কর্মচারীদের মধ্যে ভিন্ন কোনও চুক্তি থাকলে ৪৫ দিনের বেশি ক্ষতিপূরণ পেতে পারেন।

 ৪৫ দিনের বেশি ক্ষতিপূরণের হিসাব-

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

যদি কোনও শ্রমিককে এক ক্যালেন্ডার বছরে অবিচ্ছিন্নভাবে বা একযোগে ৪৫ দিনের অতিরিক্ত ১৫ দিন বা তার বেশি সময়ের জন্য বেশি লে-অফ করা হয়, তাহলে শ্রমিককে পরবর্তী প্রত্যেক ১৫ দিন বা তদুর্ধ্ব দিনের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে (মালিক এবং শ্রমিকের মধ্যে ভিন্ন কোন চুক্তি না থাকলে)।

এই উদ্দেশ্যে, ক্ষতিপূরণ পরিমাণ হবে —

– মোট মূল মজুরির এক-চতুর্থাংশের সমান এবং
– মূল্যবৃদ্ধি ভাতার এক-চতুর্থাংশের সমান এবং
– অ্যাডহক বা অন্তর্বর্তীকালীন মজুরির (যদি থাকে) এক-চতুর্থাংশের সমান এবং
– আবাসন ভাতার (যদি থাকে) সম্পূর্ণ পরিমাণের সমান।

নোটঃ

 উল্লিখিত লে-অফ এর জন্য কাজ বন্ধ হওয়ার প্রথম দিন থেকেই কার্যকর হবে, এবং কোনও শ্রমিককে প্রথম ৩ দিনের জন্য প্রদেয় যে কোনও মজুরি সংশিষ্ট শ্রমিকের প্রেদেয় লে-অফ কালীন ক্ষতিপূরণের সাথে সমন্বয় করা হবে। (১২.৮)

 লে-অফের কারণে যদি কোনও ঠিকা-হারের শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তবে তার আগের ১ মাসে তার গড় দৈনিক আয়কে তার দৈনিক মজুরি হিসাবে গণ্য করা হবে। (১২.৯)

 কোনও বদলী কর্মীর নাম যদি প্রতিষ্ঠানের মাস্টার-রোলসে থাকে এবং সে যদি এই প্রতিষ্ঠানে অবিচ্ছিন্নভাবে এক বছর চাকুরি পূর্ণ করে থাকে তবে তাকে বদলী হিসেবে গণ্য করা যাবে না। (১৬.৩)

 লে-অফকৃত কর্মীদের মাস্টার-রোলসে-

১৭ ধারা অনুসারে, নিয়োগকর্তা লে অফ কর সত্তেও একটি মাস্টার-রোল সংরক্ষণ করবেন এবং স্বাভাবিক কর্মসময়ে লে-অফ কৃত শ্রমিকদের মধ্যে যারা কাজের জন্য হাজিরা দিবেন, তাদের নাম উহাতে লিপিবদ্ধ করতে হবে।

 কোন পরিস্থিতিতে লে-অফকৃত কর্মীরা ক্ষতিপূরণের অধিকারী হবে না?

যদি সে-

– একই প্রতিষ্ঠানে বা একই নিয়োগকর্তার অধীনে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে এবং একই শহরে বা গ্রামে অবস্থিত বা ৮ (আট) কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত অন্য কোন প্রতিষ্ঠানে দক্ষতা বা পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতার প্রয়োজন নেই এমন বিকল্প পদে একই মজুরি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়;

– নিয়োগকর্তার নির্দেশে/প্রয়োজনে দিনে কমপক্ষে একবারে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কাজের সময় নিয়মিত সময়ে কোন নির্দিষ্ট সময়ে কাজের জন্য হাজিরা না দেয়;

বিকল্প দুইঃ—

যদি লে-অফের সময়সীমা কোনও এক ক্যালেন্ডার বছরে ৪৫ দিনের পর অবিচ্ছিন্নভাবে ১৫ দিন বা তার বেশি সময়ের জন্য লে-অফ করতে হয়, তাহলে মালিক উক্ত শ্রমিক্কে লে-অফ এর পরিবর্তে (ধারা ২০ অনুযায়ী) ছাঁটাই করতে পারবে।

 ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে বিধান-

এক্ষেত্রে যে সকল কর্মী সর্বশেষে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিল তাদেরকে প্রথম ছাঁটাই করতে হবে। যে কর্মচারী মালিকের অধীনে ১ বছর বা তার বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন, তাকে ছাঁটাই করতে চাইলে-

– তার ছাঁটাইয়ের কারণ উল্লেখ করে তাদের নোটিশের পরিবর্তে ১ মাসের লিখিত নোটিশ দিতে হবে অথবা নোটিশ মেয়াদের জন্য নোটিশের পরিবর্তে মজুরী প্রদান করতে হবে।

– তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ তার প্রত্যেক বছরের চাকরি জন্য ৩০ দিনের মজুরী বা গ্র্যাচুইটি (যদি প্রদেয় হয়) এর মধ্যে যা অধিক হবে, প্রদান করতে হবে;

তবে যে কর্মীকে [ধারা ১৬(৭) অনুযায়ী] ৪৫ দিন বা তারও বেশি সময় লে অফ এর কারণে ছাঁটাই করা হচ্ছে তাদেরকে ১ মাসের লিখিত নোটিশের প্রয়োজন হবে না; তবে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের ৩০ দিনের মজুরী বা গ্র্যাচুইটির অতিরিক্ত ১৫ (পনের) দিনের মজুরী দিতে হবে।

[উল্লেখ্য, ৪৫ দিন বা তারও বেশি সময় লে অফ এর কারণে ছাঁটাই ছারাও— “শ্রমিক সংখ্যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত এ কারণ দেখিয়েও ছাঁটাই করা যায়” এবং সেক্ষেত্রে ১ মাসের লিখিত নোটিশ দিতে হবে অথবা নোটিশ মেয়াদের জন্য নোটিশের পরিবর্তে মজুরী প্রদান করতে হবে।]

নোটঃ

– নিয়োগকর্তা যদি ছাঁটাইয়ের ১ (এক) বছরের মধ্যে আবার কোনও কর্মী নিয়োগের ইচ্ছা করেন, তবে নিয়োগকর্তাকে চাকরীর জন্য আবেদন করার জন্য ছাঁটাইকৃত শ্রমিককে নোটিশ পাঠাতে হবে। যদি ছাঁটাইকৃত একাধিক কর্মীরা চাকরীর জন্য আবেদন করেন, তবে পূর্বের চাকরির জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

– কোন শ্রমিক যদি কোন প্রতিষ্ঠানে পূর্ববর্তী ১২ মাসে কমপক্ষে ২৪০ দিন বাস্তবে কাজ করে থাকে, তাহলে সে ঐ প্রতিষ্ঠানে অবিচ্ছিন্নভাবে ১ বছর কাজ করেছে বলে গণ্য হবে।

২. একতরফাভাবে বেতন ছাড়াই কর্মীকে কী ছুটি দেওয়া যাবে?

কোনও কর্মচারী যদি এই ধরনের ছুটির আবেদন না করেন, তবে একতরফা বেতন ছাড়া ছুটি দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নিয়োগকর্তা এবং কর্মচারীর মধ্যে যদি এ সম্পর্কে সমঝোতা থাকে যে মালিক চাইলে কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিনা বেতনে ছুটি দিতে পারবে তাহলে ভিন্ন।

৩। কোনও নিয়োগকর্তা সাধারণ সরকারি ছুটির সময়ের জন্য বেতন কেটে নিতে পারেন?

আইনের ১২৫ ধারা অনুসারে একজন নিয়োগকর্তা (অন্যান্য কারণগুলির মধ্যে) “অননুমোদিত অনুপস্থিতি” কারণে একজন শ্রমিকের বেতন কেটে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে সরকারী ছুটির দিনগুলিকে “অননুমোদিত অনুপস্থিতি” হিসাবে বিবেচনা করা যাবে না। এছাড়াও, সরকার এও ঘোষণা করেনি যে নিয়োগকর্তা এইরকম নির্ধারিত ছুটির জন্য বেতন থেকে কেটে নেওয়ার অধিকারী হবেন। অতএব, সাধারণ পাবলিক ছুটির সময়কালের জন্য বেতন কেটা যাবে না

লেখাঃ মাজহারুল ইসলাম, করপোরেট লিগ্যাল প্রাকটিশনার

Feature Image: thedailystar.net

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here