কিভাবে নিজেকে অন্যদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলবেন

আপনি নিজেকে কি কখনো প্রশ্ন করে দেখেছেন যে নিজের কাছে আপনার ব্যক্তিত্ব কতটুকু গ্রহণযোগ্য? যতদূর আমার মনে হয় বেশিরভাগ মানুষই নিজেকে নিজেদের কাছে ১০০% আকর্ষণীয় এই কথা বলতে পারবে না। আপনি যদি নিজের কাছেই আকর্ষণীয় না হন তাহলে অন্যদেরকে কিভাবে আপনার প্রতি আকৃষ্ট করবেন বা অন্যদের কাছে আপনার গুরুত্ব কিভাবে বাড়াবেন? 

পৃথিবীতে বড় বড় কষ্ট গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কষ্ট হলো অন্যদের কাছ থেকে গুরুত্ব না পাওয়া। আপনার বন্ধু মহলে যদি অন্যরা আপনাকে গুরুত্ব না দেয় তাহলে সেখানে কখনো আপনি স্বাচ্ছন্দে তাদের সাথে সময় কাটাতে পারবেন না। আজকে আমরা আপনাদেরকে সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের দ্বারা উপস্থাপিত এমন কিছু বৈজ্ঞানিক বিষয় জানাবো যেগুলোর মাধ্যমে আপনি জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই নিজের গুরুত্ব অন্যদের কাছে বহুগুণে বাড়িয়ে নিতে পারবেন। নিজেকে করে তুলতে পারবেন সামাজিকীকরণে আকর্ষণীয় একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে। 

১. শরীরচর্চা করুন

আপনি নিজের শরীর ফিট রাখার জন্য হয়তোবা নিয়মিত ব্যায়াম করছেন, কিন্তু আপনার মনের অগোচরেই এই শরীর চর্চা মানসিকভাবে আপনাকে অন্যদের জন্য উপযুক্ত করে তুলছে। শরীরচর্চা করার সময়ে এন্ডোরফিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক উৎপন্ন হয় যা আপনার মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সহায়তা করে। ২০১৫ সালে ইউনিভার্সিটি অফ তুরকু একটি গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে শারীরিক ব্যায়াম করা ব্যক্তিরা নিজেদের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা বহুগুণে বাড়াতে সক্ষম হয়। যখন আপনি মানসিকভাবে ভালোলাগার পাশাপাশি নিজের আত্মবিশ্বাস শক্তিশালী করতে সক্ষম হবেন তখন খুব সহজেই অন্যদের কাছে আপনার গুরুত্ব বেড়ে যাবে। অন্যরা আপনাকে তাদের বিভিন্ন কাজে সাহায্যের জন্য স্মরণ করবে। বলা যায় তারা আপনার ব্যক্তিত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করতে ভরসা পাবে। 

২. প্রশংসা করুন

অন্যদের কাছ থেকে গুরুত্ব পেতে হলে আপনার ও তাদের প্রতি গুরুত্ব পূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করতে হবে। তাই কখনো অন্যদের প্রশংসা করতে কিংবা মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনতে কখনও দ্বিধাবোধ করবেন না। নিজেকে খোলা মনের মানুষ হিসেবে পরিচয় দেবার অন্যতম একটি উপায় হলো অন্যের প্রশংসা করা। ২০১৬ সালে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় একটি গবেষণা থেকে দেখিয়েছেন যে যারা বিভিন্ন মেটাফোর ব্যবহার করে মহিলাদের প্রশংসা করে থাকে তারা মহিলাদের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হিসেবে পরিগণিত হয়। তাই অন্যের প্রশংসা করতে কখনো কার্পণ্য করবেন না। 

৩. হাসিমুখে থাকুন

এটা একটা বাস্তব সত্য কথা যে হাসি মুখে থাকা মানুষগুলোর কখনো বন্ধুর অভাব হয় না। মানুষ আপনাকে কিভাবে দেখছে সেটা নির্ভর করবে আপনার মুখের আকৃতির ওপরে। যদি সব সময় ঠোঁটের এক পাশে ছোট্ট একটি হাসি ধরে রাখতে পারেন তাহলে আপনার এই পথ চলার পথে সমাজের অন্যান্য মানুষেরা সহজেই যোগ দিয়ে দেবে। বিশ্বের বিভিন্ন মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে হাসি হলো মানুষকে আকর্ষণ করার অন্যতম একটি হাতিয়ার। এই হাতিয়ার কতটা শক্তিশালী শুধুমাত্র তারাই ভালো জানেন যারা একটি মুচকি হাসির কারণে কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছেন। 

৪. অসভ্য আচরণ থেকে বিরত থাকুন

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ এর একটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে নেগেটিভ কোন ব্যাপারে অংশগ্রহণ করার মাধ্যমে নিজের আত্মবিশ্বাসের মাত্রা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নিজের ভেতরে আত্মসন্তুষ্টির মাত্রা ও অনেক কমে যায়। যদি কখনো আপনি নিজেকে এই ধরনের মিথ্যাচারিতা বা ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম এর মধ্যে সংযুক্ত দেখতে পান তাহলে সেই সময় বিষয়টি নিয়ে আপনার বারবার চিন্তা করা উচিত। কেননা এ সকল কাজকর্ম আপনার সমাজে এক ধরনের নেগেটিভ প্রতিফলন সৃষ্টি করে যা অন্যান্য মানুষদেরকে আপনার কাছ থেকে সহজেই দূরে সরিয়ে দেয়। 

৫. সম্পর্কের মূল্যায়ন করুন

মানুষ বেশিরভাগ সময় স্বার্থপর সম্পর্ক গুলোর প্রতি বেশি মূল্যায়ন করে থাকে। জীবনে চলার পথে আপনার হয়তো ভুল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়ে থাকবে যা সব সময় আপনাকে ওপর থেকে টেনে নিচের দিকে নামাতে থাকবে। কখনো এই সম্পর্কগুলোতে নিজেকে আবদ্ধ রাখবেন না। তাদের প্রতি রুক্ষ আচরণ না করে কৌশল অবলম্বন করে সে সকল সম্পর্ক থেকে নিজেকে বের করে আনার চেষ্টা করুন। যে ব্যক্তি আপনার ভালো কাজে সাপোর্ট করে এবং আপনাকে উপরে উঠে যেতে সাহায্য করে সব সময় সেই ব্যক্তিদের সাথে মেলামেশা করার চেষ্টা করবেন। তারা কখনো আপনাকে টেনে নিচে নামাবে না বরং সর্বোচ্চ পর্যায়ে তরতর করে উঠে যেতে সর্বোচ্চ সাহায্য করে থাকবে। আর এ ধরনের সম্পর্কের মূল্যায়ন আপনার গ্রহণযোগ্যতা অন্যদের কাছে আরো বেশি বাড়িয়ে দেবে। 

৬. সেন্স অফ হিউমার থাকা জরুরি

মজা করা এবং হাসাহাসি করা আপনাকে অন্যদের কাছে খুব সহজেই কাছের মানুষ হিসেবে পরিচিত করে তুলবে। জীবনের ছোট ছোট বিষয় গুলোতে যখন আপনি শুকনো হাস্যরসাত্মক কথাবার্তা মানুষের মাঝে বলতে পারবেন তখন অন্যরা আপনার ভেতরে এক ধরনের ইতিবাচক আলোকবর্তিকার সন্ধান পাবে। এতে করে যখন অন্যদের মন খারাপ হবে কিংবা দুরবস্থার মধ্যে পড়বে তখন ঐ তারা আপনার কাছে ছুটে আসতে দ্বিধাবোধ করবে না। কারণ তারা জানে আপনার কাছে আর কিছু না পেলেও একটু মানসিক শান্তি পাবে। 

৭. সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকুন

আপনার শুনে অনেকটা অবাক লাগতে পারে যে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ও কি মানুষকে কোনভাবে আকৃষ্ট করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করুন। আপনার সামনে যদি দুইজন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে যার মধ্যে একজন বাঁকা হয়ে কোমরের হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং আরেকজন একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাহলে এই দুইজন মানুষের মধ্যে আপনি অপেক্ষাকৃত কাকে গ্রহণ করবেন যে কোন কাজে নিয়োগ করার জন্য? অথবা আপনার বন্ধু হিসেবে এই দুজনের মাঝে আপনি কাকে বেছে নেবেন? ৮০% মানুষ সেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকেই বেছে নেবে। কারণ মানুষের এই দাঁড়িয়ে থাকার মাধ্যমে ও তার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ পায়। 

৮. সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিন

যে কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে ভেবেচিন্তে বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার চেষ্টা করবেন। মনে রাখতে হবে যে আপনার ব্যক্তিগত কাজে নেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত আপনার ওপর অন্যদের আস্থা বহুগুণে বাড়িয়ে দেবে। এতে করে অন্যরা তাদের কাজের ব্যাপারেও আপনার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে দ্বিধা বোধ করবে না। 

৯. নিজেকে উৎফুল্ল রাখুন

নিজের ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটি হাসি রাখার পাশাপাশি নিজেকে উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করুন। কখনো মন মরা হয়ে শুধু শুধু বসে থাকবেন না। মানুষ সতেজতা এবং জীবন্ত বিষয়গুলোকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকে। আপনি যদি অন্যান্য মানুষদের সাথে উৎফুল্ল মানসিকতা নিয়ে আসতে পারেন তাহলে তারা সহজেই আপনাকে গ্রহন করবে। এমনকি বিভিন্ন সময়ে তাদের সঙ্গী হিসেবে আপনাকে পেতে চাইবে। তাই যতটা সম্ভব নিজেকে শারীরিক এবং মানসিকভাবে উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করুন। 

১০. নিজের যত্ন নিন

নিজেকে যদি অন্যদের মাঝে আকর্ষণীয় করে তুলতে চান তাহলে নিজের যত্ন নেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় আর কোন ব্যাপার হতেই পারেনা। নিয়মিত ব্রাশ করা, চুল আঁচড়ানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা এবং অন্যান্য উপায়ে নিজেকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা আপনার গ্রহণযোগ্যতা মানুষের কাছে সহজেই বাড়িয়ে দেবে। মনে রাখতে হবে যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মানুষদেরকে অন্যরা খুব সহজেই মেনে নিতে সক্ষম হয়। 

১১. ধর্ম চর্চা করুন

সবসময় নিজেদের ধর্ম প্রতিপালন করার চেষ্টা করুন। কারণ ধর্ম চর্চা করা ব্যক্তিদেরকে মানুষ তাদের আদর্শ হিসেবে দেখে থাকে। তবে ধর্ম প্রতিপালন করার সময় অবশ্যই মনে রাখবেন যাতে নিজের ধর্ম প্রতিপালন করতে গিয়ে অন্যরা মনে আঘাত না পায়। সেইসাথে প্রত্যেক ধর্মের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে শিখুন। এতে করে আপনি সব ধর্মের মানুষের মাঝে সম্মানিত হবেন। 

নিজের গ্রহণযোগ্যতা যদি আপনি অন্যদের মাঝে বৃদ্ধি করতে পারেন তাহলে আপনার জীবনে হতাশা বলে কোন কিছু থাকবে না ‌ অন্যদের কাছে নিজের এই গুরুত্ব আপনাকে আপনার জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে অন্যদের কাছ থেকে বহুগুণে এগিয়ে রাখবে। তাই উপরের বিষয়গুলো মাথায় রেখে এখন থেকেই চর্চা করা শুরু করুন। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here