কৃষি খাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদান

বিজ্ঞান ও কৃষি এই দুটি জিনিস মানুষের জীবনের সাথে অতি গভীরভাবে জরিত। কৃষি ছাড়া যেমন সারা বিশ্বের মানব জীবন অচল তেমনি বিজ্ঞান ছাড়া কৃষির উন্নয়ন ব্যবস্থা অচল। বর্তমানে কৃষির সাফল্য ও উন্নয়ন ব্যবস্থায় বিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম। ১৯২১ সালের মধ্যে প্রায় চার–পঞ্চমাংস (৭৭.৩%) কৃষি নির্ভর হয়ে পরে যা সমগ্র ভারত বর্ষেই ছিল ৬৯.৮ ভাগ। বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এই দেশের ৮০% মানুষই কৃষি কাজ করে। এই দেশের কৃষি হলো ধান-প্রধান নিবিড় স্বয়ংভোগী। বর্তমানে আমাদের দেশে কৃষি ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র আকৃতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়।

কৃষিতে বিজ্ঞান এর অবদান জানতে হলে আগে জানতে হবে বিজ্ঞান কী?

বিজ্ঞান হলো এমন একটি বিশেষ শাখা যা প্রকৃতি ও কৃত্রিম জীব এবং জড় সম্পর্কে যাবতীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা, বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করে প্রমাণ সহকারে তার তথ্য সংগ্রহ করা। অর্থাৎ একটি নিয়মের মধ্যে থেকে গবেষণা কার্য সম্পাদন করাই হলো বিজ্ঞান।

চলুন জেনে নেই, “কৃষি বিজ্ঞান কী?”

যে সকল গবেষণা ফসল ও কৃষি কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য সম্পদের গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে প্রমাণ সহ ব্যাখ্যা করা হয় তাকে কৃষি বিজ্ঞান বলে। কৃষি বিজ্ঞানের অনেকগুলো স্তর থাকতে পারে। যেমন : ফসল, জলবায়ু, মাটি, আধুনিক যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ইত্যাদি। আর এই কৃষি বিজ্ঞানের জনক হলো জেন্সেটাল। তার এই আবিষ্কারের ফল ভোগ করছে আজ গোটা বিশ্ব।

কৃষি যখন সনাতন পদ্ধতিতে ছিল বিভিন্ন জন্তুর সাহায্যে (গরু, মহিষ) লাঙ্গল দিয়ে জমি চাষ করানো হতো । তখনকার কৃষির উৎপাদন নির্ভর করতো আবহাওয়া ও জলবায়ুর উপর। আবহাওয়া নির্ভরশীল কৃষিতে প্রচন্ড খরা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, কীট পতঙ্গ এর আক্রমণ এর ফলে প্রচুর পরিমান ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতো। এরপর ধারাবাহিকভাবে একই জমিতে বারবার চাষ করার ফলে সেই সকল জমির উর্বরতা হ্রাস পেতো। এছাড়াও বীজ বপনের পর তার গুণগত মান না জানা ও পানি সেচ বৃষ্টির উপর নির্ভর করতে হতো বলে ভালো ফসল এবং পরবর্তীতে সংগ্রহ করে রাখার জন্য ভালো বীজ পাওয়া যেত না। যার কারণে এক হতাশাজনক চিত্র কৃষি ক্ষেত্রে দেখা যেতো।

কৃষি বিজ্ঞানের প্রয়োগে কৃষি ব্যবস্থা:

যখন মানুষ সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতো তখন কিন্তু কৃষি খাত এতো উন্নত ছিল না। যখন থেকে কৃষি ব্যবস্থায় বিজ্ঞানের আবির্ভাব হয়েছে তখন থেকে কৃষকেরা বিজ্ঞানের সুফল ভোগ করতে লাগলো। কৃষিতে আধুনিক বিজ্ঞানের ছোঁয়া ফসল সংরক্ষণ ব্যবস্থায় এক ব্যপক উন্নতি সাধন করেছে, যা বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞানের এক অন্যতম আশ্চর্য।

বিজ্ঞানের ফলে কৃষির সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তন হয়ে বিজ্ঞান ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন হয়েছে। কৃষিতে আধুনিকায়ন এর সূচনা ঘটে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও উনবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। এরপর কৃষিতে ধীরে ধীরে প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। শুরু হয় আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও প্রচলন। প্রথম দিকে কলের লাঙ্গল, ট্রাক্টর, পাওয়ার ট্রিলার যোগ করা হয় কৃষিতে। এরপর সেচ পদ্ধতি, বিদ্যুৎ চালিত পাম্প ও কৃত্রিম উপায়ে বৃষ্টিপাত ঘটানোর মতো যন্ত্র। পরবর্তীতে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ ও হাইব্রিড বীজ উৎপাদন করা হয়। যার গুনগত মান পরিমাপ করা হয় প্রযুক্তির মাধ্যমে। আবিষ্কৃত হলো রাসায়নিক সার ও তার সঠিক প্রয়োগ পদ্ধতি। বিজ্ঞানের কারণে কৃষি খাত সফলতা লাভ করতে লাগলো। বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞানের সহায়তায় বিভিন্ন কৃষি চাষাবাদ পদ্ধতির আবির্ভাব হয়েছে। এরমধ্যে জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি হলো হাইড্রোপনিক চাষ পদ্ধতি।

এই চাষ বাড়ির ছাঁদ, খোলা খালি জায়গা, এমন কি ঘরের ভেতরেও করা যায়। এতে খরচ কম তাই অধিক লাভজনক একটি চাষ পদ্ধতি। বিশ্বের বেশিরভাগ উন্নত রাষ্ট্র গুলোতে এই পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞানের প্রযুক্তির ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি থেকে শুরু করে বীজ বপন করা এবং তা কেটে সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা পর্যন্ত যাবতীয় কার্যক্রম করা হয়ে থাকে। এতে করে যেমন শ্রম শক্তি কম লাগছে তেমনি সময় ও কম লাগছে। কমে যাচ্ছে কৃষকের খরচ এর পরিমাণ । তাছাড়া আবহাওয়া কৃত্রিম উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করে চাষ করা হচ্ছে। অতিরিক্ত শীতে বা গরমে এবং মরুভূমির উপর মাটি দিয়ে পানি সেচের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমানে যে সকল আধুনিক যন্ত্রপাতিগুলো কৃষি খাতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে সেগুলো হলো – মোয়ার, রুপার, বাইন্ডার, ট্রাক্টর, ম্যানিউর স্প্রেডার, থ্রেসিং মেশিন সহ আরও নানা রকমের যন্ত্রপাতি। বর্তমানের কৃষি এখন কম্পিউটারাইজড বিজ্ঞানের অংশ।

কৃষিতে বিজ্ঞানের যেমন সুফল রয়েছে তেমনি কিছু ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে। এবার সেসব ক্ষতিকর প্রভাবগুলো দেখে নেওয়া যাক-  

  • বিজ্ঞান ব্যবস্থায় কৃষি আজ উন্নত কিন্ত বর্তমানে আমরা যে সকল শাক-সবজি খাই তাতে যে ফরমালিন প্রয়োগ করা হয় সেটা স্বাস্থ্যের জন্য খুবি ক্ষতিকর। এই খাবার খেলে ক্যান্সার এর মতো মারাত্মক রোগ, হার্ট ব্লক, এমন কি ফুসফুসে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
  • আধুনিক বিজ্ঞানের রাসায়নিক সার জমিতে অতিরিক্ত পরিমাণে প্রয়োগ করলে ফসল ও মাটি দুটোই বিষাক্ত হয়।
  • কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কীটনাশক বৃষ্টির পানির মাধ্যমে নদী-নালা, খাল-বিল এর পানিতে মিশে গিয়ে পানিকে বিষাক্ত করে, পানি দূষণ বৃদ্ধি করে।
  • হাইব্রিড বীজ এর আবিষ্কার এর ফলে যে সকল গরীব কৃষি পরিবার বীজ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতো তারা আজ অসহায় ও বিলুপ্ত প্রায়।
  • বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ফলে শ্রম শক্তি কম লাগায় বেকারত্ব দিন দিন বেড়ে চলেছে।
  • কৃত্রিম উপায়ে আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হতে হয়।
বিজ্ঞান ও কৃষি একে অন্যের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত  কৃষি খাতে বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগের ফলে কৃষি ও প্রকৃতি দুটোকেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যে সকল পদ্ধতিগুলো পরিবেশ সম্মত নয়, তা বর্জন করা উচিত। অন্যথায় কৃষি খাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদানের চাইতে ক্ষতিসাধন বেশী হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here