“কোরআন” এবং “আইন” যখন একই নীতির কথা বলে

১। প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কারো সম্পর্কে উত্তম ধারণা করা উচিত (“প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স”)-

 কোরআনের ভাষায়—“তোমরা যখন একথা (স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর প্রতি অপবাদ) শুনলে, তখন ঈমানদার পুরুষ ও নারীগণ কেন নিজেদের লোক সম্পর্কে উত্তম ধারণা করনি এবং বলনি যে, এটা তো নির্জলা অপবাদ?” (সূরা আন-নূর ১২)

 আইনের ভাষায়— “প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স” (নির্দোষতার অনুমান) হলো একটি আইনী নীতি। এ নীতিতে কমন ল’ সিস্টেমসহ অনেক সিভিল আইন ব্যবস্থার অধীনে ফৌজদারি কার্যক্রমে একজনকে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধী প্রমাণিত না করা পর্যন্ত নির্দোষ বলে বিবেচনা করা হয়। অনেক দেশে একটি ফৌজদারি মামলার আসামির আইনী অধিকার এবং এটি জাতিসংঘের মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রের ১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার। দেওয়ানী কার্যবিধিতে বিবাদী/আসামীকে প্রাথমিকভাবে সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয় যদি না বাদী প্রমাণ করতে পারে।

২। সাক্ষ্য প্রমান না দিতে পারলে সেই মিথ্যাবাদী/অপরাধী –

 কোরআনের ভাষায়—“তারা কেন এ ব্যাপারে চার জন সাক্ষী উপস্থিত করেনি; অতঃপর যখন তারা সাক্ষী উপস্থিত করেনি, তখন তারাই আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী। (সূরা আন-নূর ১৩)

 আইনের ভাষায়—সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ এর ধারা ১০২ অনুযায়ী সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে যেই পক্ষের হার হবে প্রমাণের দায়িত্ব তার। অর্থাৎ, বাদি পক্ষ সাক্ষী উপস্থাপনের মাধ্যমে দাবির সত্যতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে মামলায় সে হারবে (তার দাবী কোর্টে গ্রহণযোগ্য হবে না)। ধারা ১০৫ অনুযায়ী ব্যতিক্রম দাবির ক্ষেত্রে আসামীকে প্রমাণ করতে হবে যে সে কোন ব্যতিক্রমের দ্বারা নির্দোষ। ফৌজদারি কার্যক্রমে অভিযুক্তকে নির্দোষ বলে গণ্য করা হয় যদি না রাষ্ট্রপক্ষ উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে তাকে দুষি প্রমাণ করতে না পারে।

৩। মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি

 কোরআনের ভাষায়—“যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ ঈমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকালে ও পরকালে ধিকৃত এবং তাদের জন্যে রয়েছে গুরুতর শাস্তি। (সূরা আন-নূর ২৩)

 আইনের ভাষায়— দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় মিথ্যা ফৌজদারি মামলা দায়ের করার শাস্তির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। ফৌজদারী কার্যবিধি, ১৮৯৮ এর ধারা ২৫০ এ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের জন্য শাস্তির বিধান আছে। এক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট যদি আসামিকে অব্যাহতি বা খালাস দেওয়ার সময় প্রমাণ পান যে মামলাটি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশসহ ক্ষতিপূরণের আদেশ দিতে পারেন। দেওয়ানি কার্যবিধির ধারা ৯৫ অনুযায়ী কোর্ট যদি মনে করে কেঊ অপর্যাপ্ত কারণে গ্রেপ্তার, সংযুক্তি (এটাচমেন্ট) বা অস্থায়ী আদেশ নিষেধআজ্ঞার আদেশ অর্জন করেছেন সে ক্ষেত্রে (বিবাদির আবেদন সাপেক্ষে) বাদীকে ক্ষতিপূরণ এর আদেশ দিতে পারে। স্পেশাল আইনসমূহেও মিথ্যা মামলা দায়ের করার শাস্তির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে। যেমন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ এর ১৭ ধারায় বলা হয়েছে মিথ্যা ফৌজদারি মামলা দায়ের করার শাস্তির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে।

৪। যাদের কারণে ব্যভিচার বাড়বে তাদের শাস্তি হবে-

 কোরআনের ভাষায়—“যারা পছন্দ করে যে, ঈমানদারদের মধ্যে ব্যভিচার প্রসার লাভ করুক, তাদের জন্যে ইহাকাল ও পরকালে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না। (সূরা আন-নূর ১৯)

 আইনের ভাষায়— দন্ডবিধি, ১৮৬০ এর ১০৯ থেকে ১১৭ ধারায় কুকর্মে সহায়তা বা প্ররোচনা যারা দিবে তাদেরও শাস্তির বিধান করা হয়েছে।

৫। শাস্তি দেওয়ার আগে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিতে হয়-

 কোরআনের ভাষায়—“(সোলাইমান আঃ যখন হুদহুদ পাখিকে দরবার উপস্থিত দেখলেন না তখন বললেন) আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা হত্যা করব অথবা “সে উপস্থিত করবে উপযুক্ত কারণ”। (সূরা নামল ২১)

 আইনের ভাষায়— ন্যাচারাল জাস্টিস (প্রাকৃতিক বিচারের) অন্যতম মূলনীতি যে “কারও বক্তব্য না শোনে তাকে দুষি সাব্যস্ত করা উচিত নয়”। এছাড়াও, বাংলাদেশ সংবিধান, ১৯৭২ এর ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে সকল নাগরিক আইনের সমান এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকারী।

৬। অপরাধী সাব্যস্ত করার আগে সত্য যাচাই করতে হয়-

 কোরআনের ভাষায়—“কিছুক্ষণ পড়েই হুদহুদ এসে বলল, আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি। “সুলায়মান বললেন, এখন আমি দেখব তুমি সত্য বলছ, না তুমি মিথ্যবাদী।” (সূরা নামল ২২, ২৭)

 আইনের ভাষায়— ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করার আগে সাক্ষ্য-প্রমাণ, দলিলাদি যাচাই সাপেক্ষ্যে “সন্দেহাতীতভাবে অপরাধী প্রমাণিত হতে হবে”। দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে ভারসামতার নীতি অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ, আনুপাতিক হারে যার ক্ষতি বেশি হবে তার পক্ষে রায় দিবে।

৭। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে টিমের সাথে পরামর্শ করতে হয়-

বিলকীস বলল, হে পরিষদবর্গ, আমাকে আমার কাজে পরামর্শ দাও। তোমাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোন কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। (সূরা নামল ৩২)

৮। টিমের সদস্যরা সাহস/তথ্য দিবে এবং সিদ্ধান্ত প্রধানের উপর ছেড়ে দিবে-

তারা (পরিষদবর্গ) বলল, আমরা শক্তিশালী এবং কঠোর যোদ্ধা। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই। অতএব আপনি ভেবে দেখুন, আমাদেরকে কি আদেশ করবেন। (সূরা নামল ৩৩)

মাজহারুল ইসলাম, আইনজীবী এবং কোরআন গবেষক

Mail: mazharkj528@gmail.com

Feature Image: tribune.com.pk

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here