গত ১০০ বছরে যে ৬টি মহামারী কেড়ে নিয়েছিল কোটি মানুষের প্রাণ

করোনা জ্বরে কাঁপছে দুনিয়া। ২০১৯ সালের শেষে শুরু হওয়া এই ভাইরাসের প্রকোপে গোটা পৃথিবী বদলে গিয়েছে নিমেষে। শুরু হয়েছিল চায়না থেকে আর এখন ছড়িয়ে পড়েছে সব মহাদেশে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিষেধক বেরিয়ে আসেনি। কিন্তু শুধু করোনাই কি মানুষকে ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছে? চলুন দেখে আসি আরো কিছু মহামারীর কথা যা মানুষের জীবনকে থমকে দিয়েছিল।

১. জিকা ভাইরাস: ২০১৫ সালের শুরুর দিকে জিকা ভাইরাসের প্রকোপ দেখা গিয়েছিল ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশে। মূলত ২০১৬ সালে এটি ছড়িয়ে পড়ে পুরো দক্ষিণ আমেরিকায়। জিকা ভাইরাস এডিস মশা দ্বারা বাহিত হয়ে থাকে। এই রোগটি যৌনমিলনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে । বিশেষ করে গর্ভবতী মহিলা যদি এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন তাহলে অপূর্ণাঙ্গ শিশু জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রতিবছর ইউরোপিয়ান দেশগুলো থেকে দক্ষিণ আমেরিকায় অনেক টুরিস্ট ভ্রমণ করে থাকেন। জিকা ভাইরাসের প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে পর্যটন খাত প্রায় ধসে পড়ার মতো অবস্থায় চলে যায়। এই ভাইরাসটির কোন কার্যকর প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত বের হয়নি। তবে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে এর প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসে।

২.ইবোলা ভাইরাস: ইবোলা ভাইরাসের প্রকোপ সর্বপ্রথম ২০১৪ সালে আফ্রিকা মহাদেশে দেখা যায়। একটি হিসাবে ২০১৪ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার এ পৌঁছে যায় এবং মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ১২ হাজারে। আফ্রিকা মহাদেশের দেশ গিনিতে এই মহামারীটি প্রথম ধরা পড়ে। পরবর্তীতে পাশের দেশ সিয়েরা লিওন এবং লাইবেরিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয় যে, বাদুড় থেকে এই রোগটির সূচনা হয়েছিল। আক্রান্ত ব্যক্তির বডি ফ্লুইডস যেমন থুতু, বমি , ঘাম এবং মল-মূত্রের মাধ্যমে এই রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত এই রোগের কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি।

৩. সোয়ান ফ্লু: ২০০৯ সালে প্রথম সোয়াইন ফ্লুর প্রকোপ দেখা যায় মেক্সিকোতে। আর ২০১০ সালের মধ্যে এটা পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এক বছরের মধ্যে ১.৪ বিলিয়ন জনগোষ্ঠী এতে আক্রান্ত হয় পুরো বিশ্বে এবং ৫.৫ মিলিয়ন মানুষ এতে প্রাণ হারায়। এই রোগটি আক্রান্তের মধ্যে তরুণ এবং শিশুর সংখ্যা বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে যাদের বয়স ৬৫ এর বেশি তাদের মধ্যে এর প্রকোপ কম দেখা যায়। সাধারনত যেকোনো মহামারীতে বয়স্ক জনগোষ্ঠী বেশি আক্রান্ত হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। এর প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়েছে।

৪. এইডস: যেকোনো মহামারীর কথা আলোচনা শুরু হলে যে রোগটি আমাদের মনের পর্দায় ভেসে আসে তা হল এইডস। পুরো পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫মিলিয়ন প্রাণ এই ভাইরাসটি ছিনিয়ে নিয়েছে। এই মুহূর্তে আনুমানিক ৪০ মিলিয়ন মানুষ এই ভাইরাসটিতে আক্রান্ত রয়েছেন । আক্রান্তের মধ্যে ৬৪% আফ্রিকাতে বসবাস করেন। ধারণা করা হয় যে, ১৯২০ সালে শিম্পাঞ্জির মাধ্যমে এই রোগটির সূচনা হয়। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন মাধ্যম দ্বারা বাহিত হয়ে তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ কোন প্রতিষেধক বের করা সম্ভব হয়নি। বিংশ শতাব্দীতে এসে কিছু প্রতিশোধক বের হয়েছে যা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘ সময় বাচিয়ে রাখে।

৫.এশিয়ান ফ্লু: এশিয়ান ফ্লু এর সূচনা হয়েছিল চীন থেকে যা প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। এভিয়ান নামক একটি ভাইরাস থেকে এর উৎপত্তি হয়েছিল। ১৯৫৬ সালের শেষের দিকে সর্বপ্রথম চীন দেশে এটার খোঁজ পাওয়া যায়। ১৯৫৭ সালের শুরুর দিকে পুরো চায়নায় এই রোগটি ছড়িয়ে পড়ে। তারপর হংকং, সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান , ইন্ডিয়া , ইউকে এবং ইউএসএতে ছড়িয়ে পড়ে। অক্টোবর ১৯৫৭ সালে প্রথম ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয় এবং ধীরে ধীরে এটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে আসে।

৬. স্প্যানিশ ফ্লু: স্প্যানিশ ফ্লু এর প্রকোপ ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে দেখা যায়। প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মানুষ এটা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল এবং আনুমানিক ১০০ মিলিয়ন প্রাণ এতে ঝরে যায়। এই রোগের প্রকোপ এতই বেশি ছিল যে কোন কোন জনগোষ্ঠী নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই রোগটি ছড়িয়ে পড়েছিল অনেক বেশি।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

বিগত ১০০ বছরে অনেক মহামারী এই ধরিত্রীর উপর এসেছে। আমরা ধীরে ধীরে সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। শিল্প উন্নত জাতিতে পরিণত হচ্ছি। এতে করে অনেক সময়ই আমরা প্রকৃতির দিকে খেয়াল রাখছি না। বনাঞ্চল ,মাটি, নদী পাহাড়, জীবজন্তুকে বাঁচিয়ে রাখতে পারছিনা । আর এভাবেই নিজের অজান্তে আমরা বিভিন্ন মহামারি ডেকে নিয়ে আসছি পৃথিবীর বুকে। নিকট অতীতে আমাদের দেশেও ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া রোগের প্রভাব দেখেছি। বেশিরভাগ মহামারীর প্রতিষেধক আবিষ্কার হতে প্রায় ১২ থেকে ১৮ মাস সময়ের প্রয়োজন। আর এর মাঝে অনেক মূল্যবান প্রাণ ঝরে যায়।

কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলতে পারলে এসব মহামারী থেকে আমরা কিছুটা পরিত্রান পেতে পারি যেমন –

১. বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা।

২. ঘরে ফেরার পর হাত মুখ ভালো করে ধুয়ে ফেলা।

৩. হাতের মাধ্যমে অনেক জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে তাই নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা।

৪. প্রতিটি ধর্মে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দেয়া হয়েছে। তাই ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা আমাদের উচিত।

৫. মহামারী দেখা দিলে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ না হয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে চলা।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা সৃষ্টির সেরা জীব। প্রকৃতির সাথে মিশে চলতে পারলে কোন কিছুই আমাদের দমিয়ে রাখতে পারবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here