চার্লি চ্যাপলিন এর জীবনী

সম্পূর্ণ নামঃ স্যার চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন (Sir, Charles Spencer Chaplin)

জন্মঃ ১৬ এপ্রিল, ১৮৮৯ সাল।

বিখ্যাত হওয়ার কারণঃ হাস্য-কৌতুক অভিনয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করার জন্য বিখ্যাত।

পেশাঃ অভিনেতা, পরিচালক, স্ক্রিপ্ট লেখক, সম্পাদক।

মৃত্যুঃ ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৭ সাল।

শিল্প-সংস্কৃতির এক বিশেষ ধারা হাস্যকৌতুক, দর্শক এবং শ্রোতাকে নির্মল আনন্দদান করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। বিষয়টি হালকা মনে হলেও কিন্তু সহজ নয়। এজন্য অনেক হাসির খোরাক হতে হয়। হাসিয়ে আনন্দ দানের ব্যাপারটি আয়ত্ত করতে পারে এমন লোকের সংখ্যা খুব কম। কিন্তু এই অসাধ্য কাজটি যিনি অনায়াসে সাধন করতে পেৱেছিলেন তিনি ছিলেন হাসির রাজা স্যার চার্লস স্পেন্সার চ্যাপলিন, যার নাম শুনলেই বিশ্বজুড়ে সবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি হাস্যকৌতুকপূর্ণ মুখের ছবি।

তাঁকে দেখামাত্রই শিশু-কিশোর যুবা-বৃদ্ধ সবাই এমনিতেই হাসিতেগত হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রে কৌতুকাভিনয় বলে একটি বিশেষ ধারা গড়ে উঠেছে। কৌতুক, হাঁসি, তামাশা, ঠাট্টা, ইয়ার্কি ইত্যাদির একটি বিশেষ ধরনের আধুনিক কৌতুক। আর এই বিশেষ ধারা যার হাতের স্পর্শে পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে তিনি হলেন কৌতুকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন।

পারিবারিক ইতিহাস ও শৈশবঃ

চার্লি চ্যাপলিনের আসল নাম ছিলো চার্লস স্পেনসার। চ্যাপলিনের পিতার নামও ছিল চার্লস-চ্যাপলিন। মায়ের নাম ছিল লিলি হার্নি।

পিতামাতা দু’জনেই ছিলেন অতি সাধারণ পরিবারের সন্তান। লিলি হার্নি যাত্রাদলের গান গাইতেন আর নাচতেন। আর চার্লস বাদ্য বাজাতেন এবং মাঝেমধ্যে অভিনয় করতেন। লিলি হার্নির একবার বিয়ে হয়েছিল জনৈক বড়লোকের সাথে কিন্তু সেই বিয়ে টেকেনি। যাত্রাদল থেকেই এক বড়লোকের সাথে ভাব করে বিয়ে বসেছিলেন লিলি। তিন বছর পর এই বিয়ে ভেঙে গেলে লিলি আবার এসে জুটেছিলেন আগের দলে। তখনো চার্লস সে দলেই কাজ। করতেন। দুজনের সাথে আগেই পরিচয় ছিলো। এবার সম্পর্ক আরও গভীর হলো। তারপর বিয়ে। আর তাদের সংসারেই ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ এপ্রিল ইংল্যান্ডে জন্ম নিলো বিশ্বখ্যাত কৌতুকাভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন।

স্বামী-স্ত্রী দুজনে যাত্রাদলে নেচে আর গান গেয়ে সামান্য আয় করতেন, যারফলে সংসার চলতো না ঠিকমতো। সবসময় অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। চ্যাপলিনের বাবা চার্লসের স্বভাবও খুব ভালো ছিলো না। ছিলো নেশা করার অভ্যাস। সামান্য যা আয় করতেন তার বেশিরভাগই খরচ করতেন নেশা করে।

অতঃপর লিলি হার্নির দ্বিতীয় বিয়েও টিকলো না। নেশাখোর স্বামীর ঘর করা তার পক্ষে সম্ভব হলো না। কয়েক বছর পরেই তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলো। মা লিলি ছেলে চ্যাপলিনকে নিয়েই রয়ে গেলেন যাত্রাদলে। বাবা চলে গেলেন। অন্য মায়ের দেখাদেখি ছোটবেলা থেকেই গানের এবং অভিনয়ের চর্চা করতেন চ্যাপলিন। তার গলার সুর ছিলো ভারি চমৎকার।

মা যেখানেই যেতেন ছেলে তার সাথে থাকতেন। মা যতক্ষণ স্টেজে গান গাইতেন বা নাচতেন, চ্যাপলিন পর্দার আড়ালে দাড়িয়ে দেখতেন। সর্বক্ষণ নজর থাকতো মায়ের উপর। হঠাৎ একদিন তাঁর মায়ের অনুষ্ঠানে ঘটলো এক অঘটন। সেটা ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দের কথা। মা স্টেজে গান গাইতে উঠেছেন। তার শরীরটা দুদিন থেকেই খারাপ ছিলো। পয়সার অভাবে অসুস্থ শরীর নিয়েও গান গাইতে এসেছিলেন। ফলে যা হবার তাই হলো। স্টেজে গান গাইতে গাইতেই মায়ের গলার আওয়াজ বের হলো না। ওদিকে দর্শকের গ্যালারি থেকে শুরু হলো হই হল্লোড়-চিৎকার। মা নিজের অবস্থা এবং স্টেজের হইচই দেখে আরো ঘাবড়ে গেলেন। পরে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় তিনি পালিয়ে এলেন স্টেজ থেকে।

পাশে দাঁড়িয়ে সব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ করছিলেন বালক চ্যাপলিন। যখন মা স্টেজ থেকে বের হয়ে এলেন তখনই চ্যাপলিন এক অবাক কান্ড করে বসলেন। তিনি গিয়ে সোজা দাঁড়ালেন স্টেজে দর্শকের সামনে। তারপর ধরলেন গান Jack Jones well and Known to everybody. তার চমৎকার গলা শুনে দর্শকরা থ বনে গেলো। মুহূর্তে থেমে গেলো গোলমাল। এবার দর্শকরা আনন্দে উচু হয়ে উঠলো এবং সেই সাথে স্টেজে বৃষ্টির মতো টাকা আধুলি সমানে এসে ছিটকে পড়তে লাগলো। সবাই তাঁর গানে খুশি।

তবে এরই মধ্যে আরেক মজার কাণ্ড করে বসলেন চ্যাপলিন। যখন দেখলেন বৃষ্টির মতো তার চারপাশে টাকাপয়সা এসে ছিটকে পড়ছে অমনি গান থামিয়ে দর্শকদের লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন-আমি এখন আর গান গাইব না। আগে পয়সাগুলো কুড়িয়ে নিই, তারপর আবার গাইবো।

চ্যাপলিন এমন বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে কথাগুলো বললেন যে দর্শকরা একটুও রাগ না করে বরং আরো মজা করে হাসতে লাগলো এবং আরও পয়সা পড়তে লাগলো। চ্যাপলিনও নানা অঙ্গভঙ্গি করে করে স্টেজের পয়সা কুড়াতে লাগলেন।

সব পয়সা তোলা শেষ হলে স্টেজের বাইরে দাড়ানো মায়ের হাতে তুলে দিয়ে এসে আবার নতুন করে গান ধরলেন চ্যাপলিন।

শুধু দর্শকবৃন্দ নয়, সেদিন মা নিজেও ছেলের প্রতিভা দেখে বিস্মিত হয়ে ভাবছিলেন, হয়তো-বা ভবিষ্যতে তার ছেলে এই বিষয়ক কিছু একটা হবে। মায়ের আশা পূর্ণ হয়েছিলো চ্যাপলিনের জীবন প্রতিষ্ঠায়।

কিশোরকালঃ

চার্লি চ্যাপলিন প্রথম জীবনে অনেক দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছেন। তাঁর কিশোর-জীবন কাটে মুদি দোকানে, হাপাখানায়, রাস্তায় কাগজ বেঁচে, ওষুধের দোকানে এবং লোকের বাড়িতে কাজ করে।

চার্লি চ্যাপলিন ছিলেন তার সময়কার সবচেয়ে আলোচিত ও প্রশংসিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের একজন। বিশ্বের কোটিকোটি দর্শক আজও তার অপূর্ব অভিনয় দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হন। চিত্রসমালোচকদের মতে চার্লি চ্যাপলিন তাঁর সময়কার নির্বাক চলচ্চিত্রকে একটি উন্নত শিল্পে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি জন্মভূমি ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে আসেন আমেরিকায়। এখানে এসে তিনি জড়িয়ে পড়েন চলচ্চিত্র জগতের সাথে। প্রবেশ করেন হলিউডে।

অভিনয় জগতে পদার্পণঃ

১৯১২ খ্রিস্টাব্দে কিস্টোন স্টুডিওতে চ্যাপরিন একটি কমেডি ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ লাভ করেন। তবে এখানে তিনি ছিলেন অন্যান্য সাধারণ অভিনেতাদের মধ্যে একজন। তাঁর ভূমিকা সম্পর্কেও তিনি ছিলেন অনিশ্চিত। কিন্তু দ্বিতীয় ছবি কিড আটোরেসেস অ্যাট ভেনিস ছবিতে অভিনয় করেই চার্লি তাঁর নিজস্ব ভঙ্গি প্রদর্শন করতে সক্ষম হন।

এই ছবিতে অভিনয় করার সময় তিনি প্রযোজকের পোশাক-পরিচ্ছদেও কৌতুক আনার চেষ্টা করেন এবং সেজন্য বিশেষ অদ্ভুত ধরনের ব্যাগের মতো প্যান্ট, বিরাট জুতো পরিধান করেছিলেন আর সেই সাথে লাগিয়েছিলেন একটি নকল গোফ। এভাবেই তৈরি হয় লিটল ট্রাম্প। চলচ্চিত্র জগতে চ্যাপলিন নিজেই নিজের ভাগ্যকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

তাঁর উদ্দেশ্য সফল করতে সক্ষমও হয়েছিলেন। তাঁর দক্ষতা, বিপুল জনপ্রিয়তা, একদিকে সৃজনশীল প্রতিভা এবং অন্যদিকে অর্থের দ্বার দুটোই খুলে দিয়েছিলো।

ম্যাকসিনট ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দেই যুবক চ্যাপলিনকে দিয়েছিলেন ছবি পরিচালনার গুরু দায়িত্ব আর পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন সপ্তাহে ১৫০ ডলার করে। এক বছর সময়ের মধ্যে তিনি ৩৫টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি নির্মাণ করেন।

এক পরের বছর এখানে ছবি তৈরি করার জন্য তাঁকে সপ্তাহে ১২০০ ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তারও বছর দেড়েক পর, মিউচ্যুয়াল ফিল্ম করপোরেশন তাঁকে সপ্তাহে ১২,৮৪৪ ডলার করে দেয় এবং বোনাস হিসেবে দেয় দেড় লাখ ডলার। এরপর তাঁর আরও উন্নতি হয়। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রদর্শক সার্কিটের সাথে ১০,০০,০০০ ডলারের এক চুক্তি করেন।

১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি নীতি বিরোধী কাজের জন্য অভিযুক্ত হয়েছিলেন। অবশ্য এ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। এরপর তিনি সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়েও একটি মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন।

এ ছাড়া যুদ্ধোত্তর আমেরিকায় কম্যুনিস্টবিরোধী পরিবেশে কম্যুনিস্টদের প্রতি তাঁর কথিত সহানুভূতি ও তাদের সাথে গোপন যোগাযোগ সম্পর্কে একটি কংগ্রেসীয় কমিটি তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে।

শেষ জীবনঃ

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপ ভ্রমণকালে তার যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পারমিট বাতিল করা হয়। অবশ্য তিনি কখনো যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন নি।

তিনি এই মর্মবেদনা নিয়ে তিনি সুইজারল্যান্ডে চলে যান। সেখানেই তাঁর বাকি জীবন কাটে সর্বশেষ স্ত্রী উনা ও নীলের সাথে। উনা ছিলেন নোবেল বিজয়ী নাট্যকার ইউজীন ও নীলের মেয়ে।

১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে চার্লি চ্যাপলিনের আত্মকথা ‘My Autobiography’ প্রকাশিত হয়। সে সময় তাঁর এই বই সর্বকালের বেস্ট সেলার হিসেবে বিক্রি হয়। তবে চ্যাপলিনের বইতে তাঁর কাজ করার ভঙ্গি বা কায়দা সম্পর্কে কোনো বর্ণনা ছিলো না।

সুইজারল্যান্ডেই অবশেষে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শকের প্রিয় অভিনেতা হাসির সম্রাট চার্লি চ্যাপলিন প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায় ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর পরলোক গমন করেন। চার্লি চ্যাপলিন আমাদের মধ্যে না থাকলেও বিশ্বের কোটিকোটি মানুষের মনে এক বিশাল শিল্পীর ক্যানভাস হিসেবেই বেঁচে আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here