চেরনোবিল দুর্ঘটনা : প্রভাব এবং ক্ষতিগ্রস্তের ভয়াবহতা

অনেকে চেরনোবিল দুর্ঘটনার কথা শুনেছেন আবার অনেকে শোনেন নি। আজকে আমরা পৃথিবীর অন্যতম ভয়াবহ পারমাণবিক প্ল্যান্ট ক্ষেত্রের দুর্ঘটনা “চেরনোবিল নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনা” সম্পর্কে জানবো।

বিংশ শতাব্দীর শেষে চেরনোবিল দুর্ঘটনা ছিল বিশ্বের অন্যতম মানব সৃষ্ট একটি বিপর্যয়। উন্নতির সোপানে পৌঁছানোর জন্য আমরা প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে পাশ কাটিয়ে নানা ধরনের উন্নয়নের যজ্ঞে মেতে আছি। আমাদের অন্যতম লক্ষ্য জীবনকে কীভাবে আরও সহজ করে তোলা যায়। আর এটাই করতে গিয়ে যুগে যুগে নানা রকমের মানব সৃষ্ট বিপর্যয় সৃষ্টি হচ্ছে।

চেরনোবিল দুর্ঘটনা হলো মানব সৃষ্ট দুর্ঘটনার অন্যতম একটি উদাহরণ। চেরনোবিল নিউক্লিয়ার প্লান্ট এর এই দুর্ঘটনাটি পুরো বিশ্বকে একটি বিশাল ঝুঁকির সম্মুখীন করেছে এবং ওই অঞ্চলের জীবনযাত্রাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ১৯৮৬ সালের ২৫ এপ্রিলে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার স্থানটি বর্তমানে উত্তর ইউক্রেনে অবস্থিত। এই নিউক্লিয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হতো যা তৎকালীন রাশিয়ার বিভিন্ন শিল্পের কাজে ব্যবহার হতো। দুর্ঘটনাটি ঘটেছিলো প্রায় ৩৫ বছর আগে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এলাকাটি বসবাসযোগ্য করতে আরও ২০ হাজার বছর সময় লাগবে। এটা শুনে কি অবাক হয়ে গেলেন? পুরোটা পড়লে আরও অবাক হয়ে যাবেন।

দুর্ঘটনাটি ঘটেছিলো চেরনোবিল শহরে যা তখন রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়া নিউক্লিয়ার পাওয়ার এর উপর বিনিয়োগ করেছিল। ১৯৭৭ সালের শুরুর দিকে সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা চারটি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপন করেন। দুর্ঘটনার রাতে বিজ্ঞানীরা দেখতে চাইছিলেন নিউক্লিয়ার প্লান্ট এর বিদ্যুৎ বন্ধ করে প্ল্যান্ট টিকে শীতলীকরণ করা যায় কিনা। মূলত নিরাপদ ব্যবস্থার ভুলের কারণেই এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিলো। নিউক্লিয়ার প্লান্টগুলো তৈরি করার সময় নিরাপত্তার দিকে খেয়াল করা হয়নি এবং কর্মীরাও এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ছিলেন না। নিরাপত্তার খুঁটিনাটি বিষয়গুলো কর্মীরা জানতেন না এবং এরফলে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সম্ভাবনা সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা ছিল না।

শীতলীকরণ করার জন্য যে কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা প্রয়োজন ছিল সেটাও তারা করেন নি। সবগুলো বিষয়ের সমন্বিত ব্যর্থতার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছিলো এবং পুরো স্থাপনা  ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো। দুর্ঘটনার সাথে সাথে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে ফেলার জন্য নিউক্লিয়ার প্ল্যান্টে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু তা সম্ভব হয় নি। ক্ষতির প্রভাব নিউক্লিয়ার প্লান্টের গভীরে পৌঁছে গিয়েছিলো এবং এবং বিকিরণ জনিত ক্ষতিকর পরমাণু কণা চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিল। অগ্নিনির্বাপক কর্মীরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন আগুন নিভিয়ে ফেলার জন্য। এমনকি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বালু এবং অন্যান্য অগ্নি নির্বাপক সরঞ্জাম উপর থেকে ফেলা হয়েছিল। দুর্ঘটনা সাথে সাথেই দুজন মারা গিয়েছিলেন। আহত কর্মীদের সকলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

দুর্ঘটনার পরে চেরনোবিলের অবস্থা। Image: thehistoryproject.co.uk

শুরুর দিকে দুর্ঘটনার প্রভাব সম্পর্কে কারোর তেমন ধারণা ছিল না। চেরনোবিলের নিকটতম শহর ছিল প্রিপায়াত। দুর্ঘটনার প্রায় 36 ঘন্টা পরে শহর থেকে সবাইকে সড়িয়ে নেওয়া হয় । এতো দেরিতে সড়িয়ে নেওয়ার কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। দুর্ঘটনাটি এমন সময় ঘটেছিলো যখন রাশিয়া এবং আমেরিকার মধ্যে শীতল যুদ্ধ চলছিলো। সুতরাং রাশিয়া শুরুতেই এই দুর্ঘটনার কথা স্বীকার করে নি। কিন্তু দুর্ঘটনার ফলে পারমাণবিক বিকিরণ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাওয়ার কারণে রাশিয়া ২৮এপ্রিল একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতির মাধ্যমে দুর্ঘটনার দায় স্বীকার করে নেয়। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর বুঝতে পারে যে একটি বিশাল দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে।

চেরনোবিল প্লান্টে আনুমানিক ১৯০ মেট্রিক টন ইউরেনিয়াম এর ভান্ডার ছিল যার ৩০ ভাগ বায়ুমণ্ডলে মিশে গিয়েছে। তৎকালীন রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ আনুমানিক ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার জনগণকে সরে যেতে বাধ্য করে। দুর্ঘটনার শুরুর দুই দিনের মধ্যে ২৮ জন মারা যায় এবং ১০০ জনেরও অধিক আহত হয়। আনুমানিক ৬০০০ শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কের থাইরয়েড ক্যান্সার দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা থেকে দেখা যায় যে, আনুমানিক ৪০০০ জনসাধারণ উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন সম্পর্কিত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এছাড়াও আরো ৫ হাজার জনগণ নিম্নমাত্রার রেডিয়েশন সম্পর্কিত ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বহু মানুষ মানসিক সমস্যাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যুবরণ করেছিলেন। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক সংখ্যা নিয়ে এখনো অনেক বিতর্ক রয়েছে।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

২০১৬ সালে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরটিতে একটি বিশাল কনক্রিটের পাতাটন স্থাপন করা হয়। রিয়াক্টরটি এখনও প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণের মধ্যে আছে এবং মনে করা হয় যে ২০৬৫ সাল পর্যন্ত এর প্রভাব থাকবে। দুর্ঘটনাটির ক্ষতিকর প্রভাব শুধুমাত্র মানুষের উপরে থেমে থাকে নি। এর আশেপাশের বনাঞ্চল এবং বন্য প্রাণীদের উপরও এর প্রভাব পড়েছিল। দুর্ঘটনা ঘটে যাবার সাথে সাথেই এর আশেপাশের ৪ কিলোমিটার এলাকা রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বনাঞ্চল এবং বন্য প্রাণীদের উপর আদৌ কতটা ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছিলো, তা এখনও নিরূপণ হয়ে চলছে।

বর্তমানে এলাকাটি একটি শুনশান এলাকায় পরিণত হয়েছে। যদিও ধীরে ধীরে এখন এলাকাটি বন্য বৈচিত্রে পরিপূর্ণ হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই এলাকাটিতে নতুন জীববৈচিত্র্যের সম্ভার আবিষ্কার করেছেন। যেহেতু এলাকাটিতে এখন কোনো জনমানবের স্থান নেই সেহেতু, বন্য জীবজন্তুর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ২০১৫ সালে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে আগের তুলনায় বন্য নেকড়ের সংখ্যা ৭ গুণ বেড়েছে ।

একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বমোট ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২৩৫ বিলিয়ন ইউ এস ডলার। এই দুর্ঘটনার পর থেকেই সবার মাঝে এন্টি নিউক্লিয়ার কৌশলটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বর্তমানে চেরনোবিলের এলাকাটি পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ সীমিত সময়ের জন্য পর্যটকদের ভ্রমণ করার সুযোগ দেন। অপ্রিয় হলেও সত্য যে চেরনোবিল নিউক্লিয়ার দুর্ঘটনাটি মানব সম্প্রদায়ের জন্য একটি চরম বিপর্যয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির সাথে যদি প্রকৃতির সম্মিলন না ঘটানো যায় তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের এরকম আরও বড় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে।

Feature Image: sketchfab.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here