ডাইনোসর

ডাইনোসর ছিলো শারীরিক গঠন এবং আকারের দিক থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং বৃহদাকার শাসক।আকাশ ছোয়া এই প্রানিগুলো পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে প্রায় ১৬ কোটি বছর।ধারণা করা হয় প্রায় ২৩ কোটি বছর পূর্বে বিবর্তনের মাধ্যমে ডাইনোসরের সৃষ্টি।ক্রিকেশিয়ান যূগের শেষে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর পূর্বে একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে ডাইনোসরের বিলুপ্তি ঘটে।ডাইনোসর প্রজাতির একটি প্রাণিই শুধুমাত্র এখনো টিকে আছে আর তা হলো আধুনিক পাখি।এরা ডাইনোসরদের সরাসরি বংশধর থেরোপড থেকে বিবর্তিত।

ডাইনোসর শব্দের আভিধানিক অর্থ ভয়াবহ গিরগিটি যদিও এরা গিরগিটি নয়।এরা মূলত সরীসৃপ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত আলাদা একধরণের প্রাণী। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে অর্থাৎ পাখিদের ডাইনোসর বলে চিহ্নিত করার আগে পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকরা ডাইনোসরদের অলস এবং অনুষ্ণোশিত বলে মনে করতেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ডাইনোসরের প্রথম জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়। এরপর থেকে পর্বতগাত্র বা শিলায় আটকা পড়ে থাকা ডাইনোসরের কঙ্কাল পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ডাইনোসরেরা বর্তমান বিশ্ব সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে। ডাইনোসরের বিশাল আকৃতি এবং অবয়বের জন্য এরা ছেলেবুড়ো সবার কাছেই এক আকর্ষণীয় বস্তু।

ডাইনোসরদের জীবন বড়ই বিচিত্র এবং ২০০৬ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী এখনো পর্যন্ত প্রায় ৫০০ প্রজাতির ডাইনোসরের ফসিল পাওয়া গেছে।ধারণা করা হয় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত এ প্রজাতির সংখ্যা মাত্র ২৫ ভাগ।এর মানে ৭৫ ভাগ এখনো আবিষ্কারই হয়নি।পুরোনো একটি গবেষণায় ডাইনোসরদের গণের সংখ্যা ৩৪০০ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার মধ্যে অনেকগুলিই সম্ভবত জীবাশ্মে পরিণত হতে পারে নি।ডাইনোসরদের বিভিন্ন প্রকার খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে গাছের বীজ,মাছ, পতঙ্গ ইত্যাদি নানা উপাদানের সমাবেশ ছিল; এমনকি সর্বভুক ডাইনোসরের নিদর্শনও পাওয়া গেছে। যদিও ডাইনোসরেরা উৎপত্তিগতভাবে দ্বিপদ, কোনো কোনো প্রাগৈতিহাসিক প্রজাতি চতুষ্পদও ছিল। আবার ডাইনোসরের এমনও প্রজাতি ছিলো যারা নিজেদের ইচ্ছেমত দুই পা কিংবা চার পা ব্যবহার করতো।অ্যামোসরাস এবং ইগুয়ানুডর এমনই দুটি প্রজাতি।মাইকোর‍্যাপ্টর এর মত কিছু কিছু উড়তে অক্ষম ডাইনোসরের বাতাসে ভর করে সাময়িকভাবে ভাসমান থাকার ক্ষমতা এবং স্পিনোসরিড দের আংশিক জলচর স্বভাবের পক্ষেও প্রমাণ আছে।

আধুনিক পাখিদের মধ্যে সামাজিক ভাবে বসবাস করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।তেমনি ডাইনোসরদের সময়ের প্রানী কুমিরদের মধ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়।কিছু কিছু ডাইনোসর প্রজাতির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন তারা দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করতো।ডাইনোসরদের সম্পর্কে তাদের এমন ধারণা তাদের কঙ্কালের ভঙ্গী, অঙ্গসঞ্চালনের অনুভূতি এবং বাস্তুসংস্থানের একই ধাপে থাকা প্রানীদের আচরণ থেকে ধারণা করা হয়।

পাখিরা নানারকম অঙ্গভঙ্গি এবং শ্রবণযোগ্য শব্দের মাধ্যমে পরস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময় করে।ডাইনোসরদের মধ্যেও এমন ভাব বিনিময় এবং যোগাযোগের ব্যাপার থাকলেও ধারণা করা হয় বেশির ভাগ ডাইনোসরই শব্দ করতে কিংবা হুঙ্কার দিতে পারতো না।

শব্দ সৃষ্টি করতে সক্ষম সিরিংক্সের নিদর্শনযুক্ত প্রথম ডাইনোসর হল এনান্টিঅর্নিথিন পাখিরা। এদের চেয়ে প্রাচীন পক্ষীগোত্রীয় আর্কোসরেরা সম্ভবত গলা থেকে কোনও আওয়াজ করতে পারত না। কিন্তু জীবাশ্ম থেকে প্রাপ্ত প্রচুর নিদর্শন থেকে জানা যায় প্রাথমিক ডাইনোসরেরা ভাব বিনিময়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সঙ্কেতের বহুল ব্যবহার করত।

ধারণা করা হয়, একসময়ে উত্তর মেরু ছাড়া সমগ্র পৃথিবীতেই ডাইনোসরের রাজত্ব ছিল। জলে, স্থলে, আকাশে, বিভিন্ন ধরনের ডাইনোসরের অবাধ বিচরণ ছিল। আজকের পৃথিবীতে যেমন মানুষের রাজত্ব, তেমনি একসময় এ পৃথিবী ছিল ডাইনোসরদের পৃথিবী।
তবে এত ক্ষমতাধর শাসকেরাও একসময় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।ধারণা করা হয় উল্কাপাত,তাপমাত্রার পরিবর্তন,রোগাক্রান্ত হওয়া,খাদ্যের অভাব এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে এই প্রানী।

ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছে আজ প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে।তবে নিঃসন্দেহে ধারণা করা যায় আজ থেকে ছয় কোটি বছর পড়েও ডাইনোসর নিয়ে কৌতুহল থাকবেই।আমরা সাদরে শ্রদ্ধা জানাই পৃথিবীর একসময়কার শক্তিশালী এ শাসকদের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here