দর্শনের ইতিহাস (পর্ব ১১): পাশ্চাত্য দর্শন, মধ্যযুগ

মধ্যযুগ    

খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে পতন ঘটে রোম সাম্রাজ্যের। আর ইউরোপে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আত্মপ্রকাশ করে চতুর্দশ শতকে।  এ দুয়ের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপে যে দর্শনের বিকাশ ঘটে, তাকে ইউরোপীয় দর্শনের ইতিহাসে মধ্যযুগীয় দর্শন বলা হয়। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে সামন্ততান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। খ্রিস্টান ধর্ম এই সামন্ততন্ত্রের সহযোগী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। একদিকে যেমন যাজকতন্ত্র সুসংহত রূপ লাভ করতে থাকে। অপরদিকে সামন্ততান্ত্রিক ভূমি অধিকারীদের বশে এনে রাজতন্ত্র শক্তিশালী হতে থাকে। ফলে একসময় যাজকতন্ত্র ও রাজতন্ত্রের মধ্যে শক্তির দ্বন্দ্ব শুরু হয়। একদিকে যাজকরা নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে দাবি করে এবং শাসককে যাজকদের অধীনস্থ মনে করে। অপরদিকে শাসকরাও নিজেদের ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসেবে দাবি করে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ব করতে চায়। একারণেই মধ্যযুগের ইউরোপীয় দর্শন ধর্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। প্রাধান্য পায় ধর্মভিত্তিক দর্শন আলোচনা। এ সময়ের দর্শন চর্চায় স্বাধীন চিন্তার অনুপস্থিতি ছিলো। ঈশ্বর,আত্মা, পরকাল, মঙ্গল, অমঙ্গল ইত্যাদি যে সব জিনিস ধর্ম তত্ত্বে আলোচিত হতো, দর্শনেও সেগুলোর প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। এইসময়ের দার্শনিকগণ  প্রধানত ক্লাসিকাল গ্রীক দর্শনের সাথে ক্রিশ্চিয়ানিটির সমন্বয়ের মাধ্যমে  ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন। মধ্যযুগের  দার্শনিকদের মধ্যে  উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন সেন্ট  অগাস্টিন, থমাস একুইনাস, সেন্ট আনসেলাম, ডানস স্কোটাস, প্রমূখ । এছাড়াও মুসলিম দার্শনিকদের চিন্তাও ইউরোপে তখন প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। মূলত গ্রীক দর্শনের সাথে ইউরোপের পরিচয় ঘটে মুসলিমদের অনুবাদকৃত বই থেকে।

মধ্যযুগীয় দর্শনকে সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত করা যায়। ১.প্রাচীন যাজকদের যুগঃ ৬ ষ্ঠ থেকে ৯ম শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে যাজকদের যুগ ধরা হয়। এ সময়ের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হলেন সেন্ট অগাস্টিন।

২.স্কলাস্টিক যুগঃ ৯ম থেকে ১৪ শ শতক পর্যন্ত এ যুগের বিস্তৃতি। এ যুগের দর্শনকে ধর্মযাজক ও সন্ন্যাসীদের দর্শন আখ্যা দেয়া হয়। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য দার্শনিক হলেন সেন্ট আনসেলম, সেন্ট থমাস একুইনাস, পটার এবেলার্ড, আলবার্ট ম্যাগনাস প্রমূখ।

*স্কলাস্টিক মতবাদঃ

মধ্যযুগ কিছু খ্রিষ্টান মতাবাদ ও চার্চ এবং গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর চিন্তাধারা মধ্যে সমন্বয় করে যে নতুন চিন্তাধারা জন্ম দেয় তাই স্কলাসটিক বা স্কলাস্টিজম। যাজকতন্ত্রের প্রভাব যখন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রবল, তখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতেও ধর্মীয় পণ্ডিতগণ ধর্মের বিশ্বাস ও বিধিনিষেধকে যুক্তির সাহায্যে সত্য বলে প্রমাণ করতে সচেষ্ট হন। এই ধারায়ই স্কলাস্টিকদের উদ্ভব হয়৷ স্কলাস্টিকরা ধর্মীয় যাজক ছিলেন না। কিন্তু দর্শনের মধ্য দিয়ে ধর্মকে রক্ষার ব্রতে নেমেছিলেন। তারা প্লেটো ও এরিস্টটলের দর্শনকে ধর্মের সাথে সংশ্লেষণের মাধ্যমে খ্রিস্ট ধর্মের একটা যৌক্তিক ভিত্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করে।

*সেন্ট অগাস্টিনঃ (৩৫৪-৪৩০ খ্রিঃ)

সেন্ট অগাস্টিনকে অগাস্টিন অব হিপো নামে ডাকা হয়। তার জন্ম আফ্রিকার হিপোতে। তিনি ছিলেন চার্চের ল্যাটিন ফাদার ও তাকে সেন্ট পলের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক ধরা হয়। তিনি যৌবনে প্যাগান বা প্রকৃতিবাদী ছিলেন। ৩৩ বছর বয়সে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হন। পরবর্তীতে তাকে হিপোর যাজক হিসেবে  ঘোষণা করা হয়। ক্রিশ্চিয়ান দর্শনের প্রধান সমস্যাগুলো নির্ণয় ও এর সমাধানে অগাস্টিনের মত এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আর কোন ক্রিশ্চিয়ান লেখক রাখেননি। অগাস্টিনের দর্শনের উৎস ছিলো ক্রিশ্চিয়ান ধর্মগ্রন্থ ও সেখান হতে তার করা ব্যাখ্যায়। আর তার এই ব্যখ্যাগুলো করা হয়েছে প্লেটো ও নব্যপ্লেটোবাদ দর্শনের আলোকে। ক্লাসিকাল গ্রীক দর্শনের সাথে সমন্বয় ক্রিশ্চিয়ান ধর্মতত্ত্বকে খুব শক্তিশালী ও প্রভাবশালী পদ্ধতি হিসেবে দাঁড় করায়।তার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে আছে ‘Confessions’ ও ‘City of God’। এ দুটো বইয়ে তিনি বাইবেলের ভাষ্য ও সমালোচনা অনুশীলনের ভিত্তি বই হিসেবে ধরা হয়।  যেটা মধ্যযুগীয় ও আধুনিক ক্রিশ্চিয়ান চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ পাটাতন নির্মাণ করে। তিনি মানুষের স্বাধীনতা ও নিয়তি উভয়কেই প্রাধান্য দিতেন। তাকে খ্রিস্ট ধর্মের একজন শক্তিশালী প্রচারক ও রহস্যবাদী দার্শনিক হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। তার দর্শনের মূল কথা ছিল বিশ্বাস ছাড়া জ্ঞান সম্ভব নয়।

*সেন্ট থমাস একুইনাসঃ (১২২৫-১২৭৪ খ্রিঃ)

একুইনাস ছিলেন ইতালীয় ডোমিনিকান শিখর ও ক্যাথলিক পুরোহিত। শৈশবেই তার তৎকালীন ‘ইউনিভার্সিটি অব নেপল’ এর সংযোগ তৈরি হয়। সেখানে তিনি এরিস্টটলের নব ধারণা ও ডোমিনিকানদের সাথে পরিচিত হন। এবং পরবর্তীতে একজন ডোমিনিকান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।তিনি একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী দার্শনিক, ধর্মতত্ত্ববিদ ও  আইনজ্ঞ ছিলেন।  কবি হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছিলেন তিনি। পশ্চিমা চিন্তাধারার উপর তাঁর  উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। বলা হয় আধুনিক দর্শনের বেশির ভাগ ধারণাই একুইনাসের।  বিশেষত নৈতিকতা, অধিবিদ্যা,প্রাকৃতিক আইন ও  রাজনৈতিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে তার প্রভাব অত্যাধিক। তিনি খ্রিস্টধর্মের মূলনীতির সাথে আরিস্টলীয় দর্শনের সমন্বয় করার চেষ্টা করেন। এরিস্টটলের ধারণার উপর ভিত্তি করে তিনি নিজের সিদ্ধান্তের উন্নয়ন ঘটান। তার গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই ‘সুম্মা থিউলজিয়া’ ও ‘সু্ম্মা কন্ট্রা জেন্টিল’ এ তিনি ল্যাটিন ধর্মতত্ত্বকে ধ্রুপদী রূপ দিতে সচেষ্ট হয়েছেন। ক্যালিক চার্চ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একুইনাসের দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক কাজের উপর অত্যাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে বাইবেলের উপর তার শিক্ষা গুলো ও এরিস্টটলের লেখার ভাষ্যগুলো একটা বড় সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে রক্ষিত হয়ে আছে।

 পিটার এবেলার্ডঃ (১০৭৯-১১৪২)

 দ্বাদশ শতকের প্রখ্যাত দার্শনিক পিটার এবেলার্ডকে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ লজিশিয়ান বলে আখ্যা দেন কেউ কেউ। তিনি কবি, দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক হিসেবেও খ্যাত। তাকে সংজ্ঞাবাদের জনক বলা হয়। এবেলার্ড এর পিতা ছিলেন একজন ক্রিশ্চিয়ান নাইট। কিন্তু দর্শনের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কারণে তিনি উত্তরাধিকারে প্রাপ্ত সৈনিক পেশার দিকে যান না। তিনি ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের উপর বিস্তর পড়াশোনা শুরু করেন। এবং সমসাময়িক যাজকদের অনুশীলনের সমালোচনা করেন। বাইবেল ও চার্চের ফাদারদের চিন্তা অধ্যয়নের সাথে সাথে ক্রিশ্চিয়ান যাজকদের শিক্ষার অসংগতি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। এবং এর উপর ভিত্তি করে ‘Sic et non’ বই লেখেন। সেখানে লজিশিয়ান ও ভাষাতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে লজিকের উপর মৌলিক কিছু নীতিমালা দেন। এছাড়া ধর্মতত্ত্বের উপর তার লেখা ‘থিউলজিয়া’ বইটা প্রকাশ হলে প্রথাবিরোধীতার দোষারোপ করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ‘ইউনিভার্সাল’ বা অনন্য নির্ভর ভাবের অস্তিত্ব  বিষয়ে। এক্ষেত্রে এবেলার্ড মন-নির্ভর ভাবের পক্ষে মত দিয়েছেন। তার এই মন নির্ভর মতবাদ ভাবাদর্শের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি গোঁড়া ক্যাথলিক মতবাদের বিরোধী ছিলেন ও ধর্মের প্রশ্নে যুক্তিকে অগ্রাধিকার দিতেন। এবেলার্ড বলতেন,’ ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা বাদ দিলে এমন কিছু নেই যাকে ভুলের ঊর্ধ্বে মনে করা যায়। ধর্মযাজক কিংবা প্রেরিত পুরুষ কেউই  ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।’ তার এই যুক্তিবাদী মতবাদের জন্য গোঁড়া ক্যাথলিক সম্প্রদায় তাকে সমাজচ্যুত করোছিলো।

 সেন্ট আনসেলামঃ (১০৩৩-১১০৯)

 দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক সেন্ট আনসেলমের জন্ম ইতালিতে।  তাকে মধ্যযুগের প্রভাবশালী স্কলাস্টিক মতবাদের জনক বলা হয়। তিনিই প্রথম ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে সত্তাতাত্ত্বিক যুক্তিতর্কের শুরু করেন।  একাদশ শতকে অন্ধবিশ্বাস ও ধর্মীয় গোঁড়ামির যে ধারা প্রচলিত ছিলো, সেখানে আনসেলম যুক্তির প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। তিনি তার লেখার সংক্ষিপ্ততা ও স্পষ্টতার জন্য সবিশেষ খ্যাত।  যুক্তি মাত্রই বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এমন ধারণার বিরোধিতা করেন তিনি।  তিনি মনে করতেন,  যুক্তিই বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে পারে। অন্ধবিশ্বাস জ্ঞানের জন্য সহায়ক নয়। তিনি বলেন,’জ্ঞানের জন্যই আমি বিশ্বাস করি। এই মতবাদের উপর ভিত্তি করেই ইউরোপে যুক্তি-তর্কের ব্যবহার শুরু হয়। যেখান থেকে  স্কলাস্টিজম ধারনার উৎপত্তি। তার খুব গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই হলো ‘Proslogion’ ও ‘Cur deus Homo’। কার ডিউস হোমোর অর্থ ঈশ্বর কেন মানুষ।  এ বইতে তিনি ঈশ্বরের যৌক্তিকতা ও মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য ঈশ্বরের ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। অবতারত্বের পেছনেও এখানে যুক্তি দেয়া হয়। আনসেলামের মতে মানুষের মুক্তি বা পরিত্রাণের জন্য খ্রিস্টেরও যেমন দরকার আছে তেমনি দরকার আছে মৃত্যুর।

আলবার্ট ম্যাগনাসঃ (১২০০-১২৮০খ্রিঃ)

 জার্মানে জন্ম নেয়া এই দার্শনিক ছিলেন ক্যাথলিক ডোমিনিকান ভিক্ষু ও বিশপ। মধ্যযুগের বৈশ্বিক চিন্তকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তার আগ্রহের বিষয় ছিলো প্রাকৃতিক বিজ্ঞান থেকে ধর্মতত্ত্ব পর্যন্ত। তিনি এরিস্টটলের দর্শনকে আরবদের থেকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেন। কেননা আরবদের অনুবাদে তাদের নিজেদের চিন্তাও মিশে গিয়েছিল। মুসলিম দার্শনিকদের মতো ম্যাগনাসও জ্ঞানের প্রায় সব শাখায় বিচরণ করার প্রয়াস চালান। যুক্তিবিদ্যা, প্রাণী ও উদ্ভিদবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, ধর্মতত্ত্ব,দর্শন, শারীরবিদ্যা, আইন প্রভৃতি বিষয়ে ১৮৯৯ সালে তার ৩৮ ভলিউমের লেখা পাওয়া যায়।

তথ্য সূত্রঃ

১.দর্শনকোষ- সরদার ফজলুল করিম

২.পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস- বার্টান্ড রাসেল

৩. উইকিপিডিয়া 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here