দর্শনের ইতিহাস (পর্ব ১২): পাশ্চাত্য দর্শন, মধ্যযুগ পরবর্তী সময়

মধ্যযুগ পরবর্তী সময়েও মধ্যযুগে শুরু হওয়া দার্শনিক প্রক্রিয়া চলতে থাকে এবং চিন্তার পৃথক স্কুল হিসেবে সংগঠিত হয়। ডোমিনিকান নীতিমালা, থমিজম (সেন্ট থমাসের ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন), একুইনাসের দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক পদ্ধতি এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সিগর দ্যা ব্রেবান্ট ও জন অব জান্ডুনের মতো দার্শনিকগণ এভাররসবাদের চর্চা শুরু করেছিলো, সেটা রেনেসাঁর সময়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চলতে থাকে। যদিও তা খুব বেশি সফল হতে পারেনি। জন ডানস স্কটাস ও উইলিয়াম অব ওকহাম ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের নতুন পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটান যেটা মধ্যযুগ পরবর্তী সময়ে থমিজম এর সাথে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে এগোয়।

জন ডানস স্কটাস

জন ডানস স্কটাস (John Duns Scotus) এর জন্ম ১২৬৬ সালে। তিনি ছিলেন স্কটিশ ক্যাথলিক যাজক, ধর্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ক্যাথলিক ও ধর্মনিরপেক্ষ উভয় চিন্তার ক্ষেত্রেই তার প্রভাব ছিলো। জন ডানস স্কটাস “সূক্ষ্ম ডাক্তার” হিসাবে পরিচিত যাঁর চুল বিভক্তকরণের পার্থক্য শিক্ষাগত চিন্তাভাবনা এবং যুক্তির আধুনিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ঐ সময়ের নিখাদ যুক্তিবাদী দার্শনিকদের যুক্তি ছিলো যে মানুষের জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণের জন্য দর্শন নিজেই স্বয়ংসম্পূর্ণ  ও পর্যাপ্ত।  স্কটাস এই ধারণার বিরোধিতা করেন।  সে দাবি করতো এরিস্টটলের মতো পুরোদস্তুর দার্শনিকও মানুষের সত্যিকার অবস্থা বুঝতে পারে নি। সে আদমের পতন ও তার দয়া ও মুক্তির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। ক্রিশ্চিয়ান ওহী দ্বারা আলোকিত না হওয়ায়,এরিস্টটল মানুষের বর্তমান পতিত অবস্থা বুঝতে পারেননি। তিনি এরিস্টটলের জগতের চিরন্তনতার ধারণা ও ঈশ্বর জগতের আদি কারণ, এটার বিরোধিতা করেন। তিনি জগতের আকস্মিক উদ্ভব  ও ঈশ্বরের অসীম সৃষ্টিশীল ইচ্ছার উপর এর পূর্ণ নির্ভরশীলতাকে জোর দেন।তার সার্বজনীনতার ধারণার কারণে তাকে ‘Doctor Subtilis’ উপাধি দেয়া হয়। সার্বজনীন শুধু মাত্র বিমূর্তভাবেই অস্তিত্বশীল কিন্তু তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে।  যেমন মনুষ্যত্ব যেটা অনেক মানুষের মধ্যে আছে বা থাকতে পারে। মধ্যযুগ ও রেনেসাঁর পূর্ববর্তী সময়ের প্রধান তিন দার্শনিকদের একজন জন ডানস স্কটাস ১৩০৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

উইলিয়াম ওকহাম (William of Ockham)

উইলাম ওকহাম ১২৮৭ বা ১২৮৮ সালে লন্ডনের ওকহামে জন্ম গ্রহণ করেন। সাত থেকে তের বছর বয়সের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে তাকে ফ্রান্সিকান অর্ডার শিক্ষা দেয়া হয়। ২৩ বছর বয়সে তিনি ধর্মতাত্ত্বিক পড়াশোনা ও অনুশীলন শুরু করেন।

চতুর্দশ শতকে থমিজম ও স্কটিজমকে দর্শনের পুরোনো পথ বলা হতো। আর উইলিয়াম অব ওকহামের মত কিছু দার্শনিকদের শুরু করা পদ্ধতিকে বলা হতো আধুনিক পদ্ধতি। তিনিও গ্রীক-আরবীয় দর্শনের বিপরীতে,  ঈশ্বরের স্বাধীনতা ও সর্বশক্তিমান এবং সৃষ্টি জগতের ঈশ্বরের উপর পূর্ণ নির্ভরশীলতার পক্ষে যুক্তি দেন। তিনি মনে করতেন ঈশ্বর যখন কোন কিছু সৃষ্টি করেন তখন সেটার জন্য পূর্ব ধারণার দরকার হয়না। বরং মহাজগতকে তিনি নিজের ইচ্ছেমতো সাজান। যার কারনে সব সৃষ্টিরই একই ধরনের বৈশিষ্ট্য নেই। ওকহাম ঈশ্বরের চূড়ান্ত স্বাধীনতাকে দার্শনিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার নীতি হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কারণ ঈশ্বর স্বাধীনভাবে  প্রাকৃতিক আইন সৃষ্টি করেছেন। এটার ভিন্নতাও হতে পারে। তিনি চাইলে অন্য কোন নিয়ম তৈরি করতে পারেন। আগুন  যেমন তাপ দেয় তেমনি তিনি এটাকে শীতলকারক হিসেবেও রূপান্তর ঘটাতে পারেন। একটা নক্ষত্রকে বাস্তবে না দেখেও সেটার জ্ঞান আমাদের দিতে পারেন।  ওকহাম সত্যে পৌছানোর জন্য যুক্তিকে পর্যাপ্ত মনে করতেন না। বিশ্বাসই নিশ্চয়তা দিতে পারে। ঈশ্বরের সব নিয়ম-বিধি মানুষের যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বুঝা সম্ভব নয়। ঈশ্বরই হচ্ছেন সত্তাগতভাবে অপরিহার্য। আর বিজ্ঞান হলো আবিষ্কারের বিষয়। তিনি স্কলাস্টিজমের ক্ষেত্রে পদ্ধতি ও উপাদান দুটোরই সংস্কার চেয়েছিলেন। এর সরলীকরণ করতে চেয়েছিলেন। ওকহামকে সংজ্ঞাবাদের পথিকৃৎদের একজন বলা হয়। এছাড়া তাকে আধুনিক জ্ঞানতত্ত্বের জনক মনে করা হয়। ওকহামের দর্শনকে সে সময় অনেকেই গ্রহণ করতে পারেনি। বিশেষ করে থমিজম ও স্কটিজম এর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্বরূপ তার দর্শন এগোয়  এবং ব্যপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

নিকোলাস অব কুসা (Nicholas of Cusa)

নিকোলাস অব কুসাকে নিকোলাস কুসানাস নামেও ডাকা হয়। জার্মান এই দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, আইনবিদ ও জ্যোতির্বিদের জন্ম ১৪০১ খ্রিস্টাব্দে। তাকে রেনেসীঁয় মানবতাবাদের প্রস্তাবকদের একজন মনে করা হয়। ইউরোপের ইতিহাসে আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অদ্যাবধি স্বীকার করা হয়  । ক্রিশ্চিয়ানিটির উপর তার রহস্যবাদী লেখার কারণে তিনি অমর হয়ে আছেন। বিশেষত ঐশী মননের সাহায্যে ঈশ্বরকে জানার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। মানুষ তার ঐশী মন দিয়েই ঈশ্বরকে বুঝতে পারে। তিনি এরিস্টটলের চেয়ে নব্যপ্লেটোবাদকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন এরিস্টটলের দর্শন ঈশ্বরকে জানার জন্য মানব চেতনায় একটা বাঁধা।  কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন এরিস্টটলের দর্শনের গোড়ার নীতি হলো বৈপরীত্যের নীতি যেটা, বিপরীতের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে পারেনা। অপরদিকে ঈশ্বর অসীম এবং সকল জিনিস পূর্ণাঙ্গ ঐক্যে ধরে রাখেন।  তার মধ্যে বিপরীত সমভাবে অবস্থান করে। গাণিতিক প্রতীকের সাহায্যে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে  অসীমের মধ্যে বিপরীত সমভাবে অবস্থান করে। মধ্য যুগের শেষদিকে বেশ কিছু সৃষ্টিশীল মানুষ এরিস্টটলের দর্শনকে বাদ দিয়ে চিন্তার নতুন ধারা তৈরি করে। নিকোলাস তাদের মধ্যে অন্যতম। নিকোলাস তাই দর্শনের ইতিহাসে একজন স্মরণীয় ব্যক্তি হয়ে আছেন। এই মহান দার্শনিক ১৪৬৪ সালে দেহত্যাগ করেন।

এভাররসবাদী( Averroists)

প্যারিসের কলা ও মানবিক বিভাগের কিছু পণ্ডিত  এরিস্টটলের দর্শনকে  স্বাগত জানায়। ক্রিশ্চিয়ান বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গেলেও তা তার শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে থাকে।তারা আসলে ধর্মতাত্ত্বিক নয় বরং দার্শনিকই হতে চেয়েছিলো।আর এ কারনে তারা ইবনে রুশদের পদ্ধতি অনুসরণ করেন। ইবনে রুশদ সে সময় এরিস্টটলের প্রসিদ্ধ ভাষ্যকার হিসেবে  স্বীকৃত ছিলেন। তাই তারা এরিস্টটলের দর্শনকে  ইবনে রুশদের পদ্ধতিতেই অনুবাদ করে।তাই তাদের ইবনে রুশদবাদী (Averroists) বলা হতো।তারা ল্যাটিন  ভাষায় শিক্ষা দিতো বলে  ‘ল্যাটিন এভাররোইস্ট’ও বলা হতো। তাদের নেতা সিগর দ্যা ব্রেবান্ট (১২৪০-১২৮১ খ্রিঃ) কিছু বিষয় শক্ত যুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চান যেগুলো সরাসরি  ক্রিশ্চিয়ান বিশ্বাসের বিরোধী হিসেবে প্রতীয়মান হয়।যেমন-জগতের নিত্যতা ও ঈশ্বরের একত্ব। তাদের দ্বৈত সত্য ধারণ করার দোষে অভিযুক্ত করা হয়। দুই পরস্পর বিরোধী সত্য, একটা হলো বিশ্বাস প্রসূত  আরেকটা যুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।  সিগার যদিও বিশ্বাসের সাথে বিরোধ  করে দার্শনিক  সমাধানের প্রস্তাব করেননি। কিন্ত তার শিষ্যদের মধ্যে অনেকেই সেটা করেছেন। যদিও তা বিশ্বাসের সাথে বিরোধ তৈরি করে তবুও। যুক্তিবাদের ক্রমবর্ধমান  ধারা  গোঁড়া ক্রিশ্চিয়ানদের  মনে ভীতি সৃষ্টি করে যে এটা ক্রিশ্চিয়ান বিশ্বাসকে ধ্বংস  করবে। তারা এসব দার্শনিকদের বিরোধিতা করে। Errors Philosophorum, The Errors of the Philosophers প্রভৃতি বই লেখা হয় দার্শনিকদের বিরোধিতায়।১২৭৭ সালে প্যারিসের বিশপ যুক্তি ও প্রকৃতিবাদী এই নতুন ধারাকে রুখতে ২১৯ টি প্রস্তাবনা দেয়।কিন্তু এই ধরনের  বিরোধিতা  এভাররইস্টদের, ধর্ম বিশ্বাসের বাইরে গিয়ে, দার্শনিক প্রশ্নের  উত্তর  খোঁজার যে ধারা সেটাকে রুখতে পারেনি। ধর্মতাত্ত্বিকগণ ক্রমাগত এসব দার্শনিকদের কর্মকাণ্ডকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে।এবং ধর্ম ও দর্শনের সমন্বয়ের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়ে।

তথ্য সূত্রঃ

১.দর্শনকোষ- সরদার ফজলুল করিম

২.এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা 

৩. উইকিপিডিয়া 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here