দর্শনের ইতিহাস (পর্ব ১৩): রেনেসাঁ দর্শন -১

 

দর্শনের ইতিহাসে মধ্যযুগের পর থেক ১৬৫০ সাল পর্যন্ত দর্শনের ধারাকে রেনেসাঁ দর্শনকাল বলা হয়। সাধারণভাবে এটা ধরা ১৩৫৫ থেকে ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়কে । রেনেসাঁস শব্দের অর্থ পুনর্জন্ম। এটি একটি ফরাসি শব্দ। এ সময় মধ্যযুগের ধর্মভিত্তিক ধ্যান-ধারণার বাইরে গিয়ে স্বাধীন চিন্তার দিকে যাত্রা শুরু হয়। এসময় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর গীর্জার আধিপত্যকে অস্বীকার করে চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষ  চলে আসে। মূলত সামাজিক প্রয়োজনীয়তায় সাড়া দিতেই এ সময়ের দর্শন বিকশিত হয়। মধ্যযুগের ধর্মভিত্তিক দর্শনে অধিকাংশ চিন্তকই ছিলেন যাজকশ্রেণীর। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের দিকে নতুন নতুন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার সাথে সাথে শুরু হয় নতুন নতুন দার্শনিক প্রচেষ্টার।

রেনেসাঁস সময়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে নতুন তিন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। একটি হচ্ছে গানপাউডার।  দেয়।যেটা সামন্ততন্ত্র ও চার্চের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে পরিগনিত হয়। এবং জাতীয়তাবাদের স্পিরিটে পরিণত হয়। দ্বিতীয়টি হচ্ছে ছাপাখানা।  যার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের ব্যপক বিস্তৃতি হতে থাকে। যেটা গীর্জার একচ্ছত্র  বুদ্ধি-বৃত্তিক আধিপত্যকে কমিয়ে আনে। এবং গ্রীক ও রোমান দর্শনকে সহজলভ্য করে দেয়। তৃতীয়টি হচ্ছে কম্পাস। যেটা নৌযাত্রাকে সহজ করে দেয়ার মাধ্যমে প্রাকৃতিক জগতের রহস্য উন্মোচন ও নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণার পথ সুগম করে।

এই আবিষ্কারগুলো বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরির পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক নতুন নতুন সমস্যার উদ্ভব ঘটায়।এই পরিবর্তিত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশে দর্শনের কার্য সীমাও বাড়তে থাকে। প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারের প্রভাবে তখন একচ্ছত্র ধর্মীয় আধিপত্য কমে আসছিলো। সার্বজনীন হিসেবে স্বীকৃত ল্যাটিন ভাষার জায়গায় স্থান করে নিচ্ছিলো স্থানীয় ভাষাগুলো। সেই প্রেক্ষাপটে দার্শনিকরা যাজকতন্ত্রের চেয়ে জাতিগত উৎসের সাথেই বেশি সম্পর্কিত ছিলো।

আলবার্ট ম্যাগনাস, থমাস একুইনাস, জন ডানস স্কটাস প্রভৃতি দার্শনিকদের দর্শনের সাথে তাদের জন্মভূমির সম্পর্ক ছিলো না।কিন্তু নিকোলা ম্যাকিয়াভেলির দর্শন সরাসরি ইতালির অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। তেমনি ফ্রান্সিস বেকনের দর্শনের কেন্দ্রে ছিলো জাতি ইংরেজের অভিজ্ঞতা।অর্থাৎ সারা ইউরোপ জুড়ে জাতীয়তাবাদের উত্থান শুরু হয়।       জ্ঞানকে বর্তমান দুনিয়ায় সামাজিক বিজ্ঞান, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, মানবিক প্রভৃতি ভাগে ভাগ করা হয়। কিন্তু রেনেসাঁস ইউরোপে এ ধরনের সূক্ষ্ম বিভাজন ছিলো না। মূলত সকল বিষয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক দর্শন চর্চা হতো তখন।

রেনেসাঁসের সময়ে যেহেতু দার্শনিকগণ প্রতিষ্ঠিত ধর্ম ও চার্চকেন্দ্রিক দর্শন, স্কলাস্টিসিজম, এরিস্টটল প্রভৃতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে দর্শন চর্চার নতুন ধারা তৈরি করেছে।তাই তাদের আগ্রহ গিয়ে পড়ে নাগরিক সমাজ, মানুষ ও প্রকৃতিতে। এই তিনটি ক্ষেত্র থেকে রেনেসাঁ দর্শনে তিনটা শাখার সৃষ্টি হয়। সেগুলো রাজনৈতিক দর্শন, মানবতাবাদ ও প্রকৃতির দর্শন।

রাজনৈতিক দর্শন

যেহেতু ধর্মনিরপেক্ষ দার্শনিকগণ যাজকতন্ত্রের ও প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং ধর্ম থেকে রাজনীতির দিকে আগ্রহটা ঝুঁকে পড়ে, তাই এটা স্বাভাবিক যে তারা নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হবেন। বিশেষত রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রকৃতি ও সেটার নৈতিক অবস্থান নিয়ে। এ সময়ে জাতিগত ঐক্য গঠিত হওয়ার ফলে রাষ্ট্র ক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার প্রভৃতি বিষয় ইতালি, ফ্রান্স, হল্যাণ্ড ও ইংল্যান্ডে নতুন রাজনৈতিক দর্শন জন্ম দিতে বড় প্রণোদনা যোগায়। ইতালির ম্যাকিয়াভেলি তার দেশের সামাজিক ও জাতীয় বিকাশের জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব নীতি ব্যাখ্যা করেন। যা ইতিহাসে ‘ম্যাকিয়াভেলির নীতি’ হিসেবে পরিচিত।  ম্যাকিয়াভেলির নীতিতে কোন নৈতিকতায় আবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য যা কিছু দরকার তা করতে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। তিনি রাষ্ট্রকে ধর্ম ও নীতির বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন।

এর অর্ধশতাব্দিরও পরে ফ্রান্সের রাজনৈতিক দার্শনিক জ্যাঁ বডিন (Jean Bodin) বলেন যে রাষ্ট্রকে  অবশ্যই এককেন্দ্রিক একক ও একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। তিনি জাতি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার নীতির কথা বলেন,যেটা সকল আইনগত বৈধতার উৎস হবে

ইংল্যান্ডের হবস (Hobbes) মানব সভ্যতার আদিম মানবদের নিয়ে ‘প্রকৃতির রাষ্ট্র’ নামক ফিকশন তৈরি করে। সভ্যতার আদিতে মানুষ নিজেদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধারণ করতো। এবং মানুষের জীবন ছিলো বিচ্ছিন্ন, দরিদ্র, অশ্লীল ও বর্বর। তাই সেই আদিরূপ নয়,বরং আমাদের এমন একটা সামাজিক চুক্তি তৈরি করতে হবে, যেখানে সকল ব্যক্তিক অধিকার একটা সার্বভৌম কেন্দ্রীয় ক্ষমতার নিকট থাকবে। বিনিময়ে তিনি সাধারণকে রক্ষা করবেন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। তিনি মনে করতেন আইন হচ্ছে সার্বভৌমের আদেশ। তিনি সকল ধরনের বিদ্রোহের অধিকারকে অস্বীকার করতেন যদি না সার্বভৌম সাধারণকে রক্ষা ও তাদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হন।

সাধারণত রেনেসাঁ ও প্রাক-আধুনিক দর্শন হলো দ্বৈতবাদী দর্শন। রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা যুগপৎভাবে কাজ করেছে।

 ম্যাকিয়াভেলি মানবিক সৎগুণ নিয়েই বেশি ভেবেছেন। আবার বডিন স্বাভাবিক ন্যায়বিচার অনুসারে শাসনের কথা বলেছেন। এমনকি সার্বভৌমকেও প্রাকৃতিক আইন মানতে হবে। এবং হবস স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক আইনের মধ্যেই যৌক্তিক উদ্দীপনা খুঁজে পেয়েছেন যেটা মানুষকে নিরাপত্তা ও শান্তি খুঁজতে প্রণোদনা দেয়। রেনেসাঁস ও প্রাক আধুনিক রাজনৈতিক দর্শন পরবর্তীতে গ্রীক দার্শনিক থ্রাসিম্যাকাসের (৪৮০ -৪১১ খ্রিস্টপূর্ব) নীতিকে সমর্থন দেন। থ্রাসিম্যাকাস মনে করতেন ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় এগুলো বস্তুনিষ্ঠভাবে প্রাকৃতিক না। বরং সামাজিকভাবে নির্ধারিত নিয়ম। তিনি ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত স্বার্থকেই ন্যায় বলেছেন।

মানবতাবাদ

রেনেসাঁসের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো গণিত, চিকিৎসা ও ধ্রুপদী সাহিত্যের প্রতি আগ্রহের পুনর্জীবন। গণিত ও চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যয়নের ফলে ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে বিজ্ঞানের বিপ্লব ঘটে যায়। আর ধ্রুপদী সাহিত্য অধ্যয়ন মানবাতাবাদী রেনেসাঁ দর্শনের ভিত্তি গড়ে তোলে। ইতালিতে মানবতাবাদের জন্ম। পরে এটি সারা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। মানবাতাবাদী দার্শনিকগণ মধ্যযুগের চেয়ে প্রাচীন লেখক ও চিন্তকদের প্রাধান্য দিতেন।এবং মূল ভাষায়ই বই পড়তেন। এরা নৈতিক দর্শনের উপর অধিক জোর দিতেন। কারণ দর্শনের এই শাখাই তাদের চাহিদাকে যথাযথ পূরণ করতে পারে। তারা দর্শকদের সাথে গ্রহণযোগ্য আচরণে কথা বলতেন। এবং ব্যক্তিক ও সামষ্টিক সৎগুণগুলো বিকশিত করার চেষ্টা করতেন। তারা অধিবিদ্যা ও তত্ত্বগত প্রশ্নে তেমন আগ্রহ দেখাতেন না। গ্রীক দার্শনিক প্রোটাগোরাসের অনুসরণে এরা ঘোষণা করে যে মানুষই হচ্ছে সবকিছুর মাপকাঠি।  মানুষ এক অনন্য জীব। বিচিত্র তার চিন্তা ভাবনা, অসীম তার সম্ভাবনা। এরা ঈশ্বর ও পরকাল নিয়ে তেমন মাথা ঘামাতেন না। ইরাসমাস, কোলেটমোর, লেফেভর প্রমূখ কিছু প্রখ্যাত মানবতাবাদী দার্শনিক।  মানবতাবাদের এই ধারা দুইটা ভাগে বিভক্ত হয়। একটা খ্রিস্টান মানবতাবাদ ও আরেকটা ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক মানবতাবাদ। খ্রিস্টান মানবতাবাদে ক্রিশ্চিয়ান ধর্মতত্ত্বের সাথে নতুন মানবতাবাদী চিন্তাকে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়।  আর ধর্মনিরপেক্ষ মানবাতাবাদীরা জীবন ও জগত সম্পর্কে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নেন।

তথ্য সূত্রঃ

১.দর্শনকোষ- সরদার ফজলুল করিম

২.এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা 

৩. উইকিপিডিয়া 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here