দর্শনের ইতিহাস (পর্ব ১৪): রেনেসাঁ দর্শন- ২

প্রকৃতির দর্শন  

আধুনিক সময়ের দর্শন হলো আত্ম-সচেতনতার শিক্ষা। এটি যেমন ধর্ম থেকে নিজেকে আলাদা করেছে তেমনি প্রকৃত বিজ্ঞান থেকেও স্বতন্ত্র্য হয়ে উঠেছে৷ কিন্তু এই পৃথকীকরণ আঠার শতকের আগে ছিলো না। প্রাচীন গ্রীসের দার্শনিকগণ বস্তু জগত নিয়ে তত্ত্ব দিয়ছে। তখন দার্শনিক, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, গণিতবিদ এভাবে বিভাজন করা হতো না। পিথাগোরাস ও প্লেটো দার্শনিকও ছিলেন, ছিলেন গণিতবিদও। এরিস্টটলের মধ্যেও দর্শন ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোন ফারাক লক্ষ্য করা যায় না। রেনেসাঁস যুগেও এই ধারাই চলতে থাকে।  গ্যালিলিও ও দেকার্তে গণিতবিদ, পদার্থবিদ ও দার্শনিক ছিলেন। মূলত স্যার আইজাক নিউটনের মৃত্যুর পরে প্রাকৃতিক দর্শন পদার্থবিদ্যা হিসেবে  (Physics) প্রতিষ্ঠা পায়।

রেনেসাঁ দার্শনিকগণ প্রকৃতির বিশালতা, তাৎক্ষণিকতা ও ঐক্যকে খুঁজে পেয়েছেন। যেখানে মধ্যযুগের দার্শনিকগন বিশ্বকে ঈশ্বরের সৃষ্টি একটি ধারাবাহিক জৈব সত্তা হিসেবে দেখেছেন।  মধ্যযুগে যেখানে ঐশী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে জগত নিয়ে চিন্তা করা হয়েছে।  রেনেসাঁসে এসে দার্শনিকগণ সৃষ্টিজগতকে যান্ত্রিক ও গানিতিক বিন্যাসে বিন্যস্ত হিসেবে চিন্তা করা শুরু করেন।তারা শক্তি ও কার্যকারণ সম্পর্ক অনুসন্ধান করেন। এ সময় দার্শনিক প্রক্রিয়ার প্রধান নীতিগুলো হয়  প্রায়োগিক মীতি, পদ্ধতিগত বিজ্ঞান ও গাণিতিক ব্যাখ্যা। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দার্শনিক বর্ণনা হয় প্রায়োগিক ও গানিতিক। তবে তখনো প্রাকৃতিক দর্শন আধুনিক বিজ্ঞানে রূপ নেয়নি। বরং রেনেসাঁস দর্শনকে একইসাথে রক্ষণশীল বলা হয়,কেননা  এটি অতীতের ধারা থেকে একদম বের হয়ে আসতে পারেনি। আবার এটাকে আধুনিক দর্শনের অগ্রদূত হিসেবেও ধরা হয়।

টমাস হবস (১৫৮৮-১৬৭৯ খ্রিঃ)

 টমাস হবস সপ্তদশ শতকের একজন বস্তুবাদী দার্শনিক। হবসের জন্ম ইংল্যান্ডে।  সে সময় ইউরোপে ধনতান্ত্রিক বিপ্লব চলছিলো। যেটা দ্বারা হবস বিশেষভাবে প্রভাবিত হন। দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও ইতিহাসবেত্তা হবস সবচেয়ে বেশি পরিচিত তার রাজনৈতিক দর্শনের কারণে।  হবসের সেরা গ্রন্থ লেভিয়েথান (১৬৫১)  থেকে তার রাজনৈতিক দর্শনের পরিচয় পাই। হবস রাষ্ট্রকে সামষ্টিক নিরাপত্তা বিধানের যন্ত্র হিসেবে দেখেছেন। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে শাসকের ঐশ্বরিক অধিকারের তত্ত্বকে নাকচ করে তিনি সামাজিক চুক্তি তত্ত্বকে সমর্থন করেন। তার মতে সমাজ তৈরি হয় মানুষের সম্মিলিত চুক্তির ভিত্তিতে।রাজাও সেই চুক্তির ভিত্তিতে রাজ্য শাসন করেন। সম্মিলিত চুক্তির ভিত্তিতে শাসকের হাতে অধিকার অর্পণের পর জনসাধারণ শাসককে আর অমান্য করতে পারেনা। তিনি রাজতন্ত্রকে সর্বোত্তম শাসন বলে মনে করেছেন।  মানুষ স্বভাবতই স্বার্থপর ও অন্যের স্বার্থের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন। ফলে একচ্ছত্র ও শক্তিশালী শাসক না হলে রাজ্যে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। তবে  শাসক একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হলেও ব্যক্তি তার জীবন রক্ষার্থে বিদ্রোহ করতে পারেন বলে হবস মত দিয়েছেন। হবসকে যান্ত্রিক বস্তুবাদের ভাষ্যকার বলা হয়। তিনি মনে করতেন বিশ্ব-জগত  বস্তু দিয়ে তৈরি। বস্তুর জটিল ক্রিয়ায় সকল বস্তু এবং মানুষ সৃষ্টি হয়েছে।  মানুষের মধ্যে দেহের অতিরিক্ত কোন আত্মা নেই।  ঈশ্বরও মানুষের কল্পনার সৃষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়। তিনি ঈশ্বরকে অস্বীকার করলেও বস্তুজগতের বাইরের এমন এক শক্তির কথা বলেছেন, যে শক্তির বলেই জগতের সমস্ত কিছু চালিত হচ্ছে।

নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি (১৪৬৯-১৫২৭ খ্রিঃ)

নিকোলা ম্যাকিয়াভেলির জন্ম  ১৪৬৯ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে। তিনি ছিলেন ইতালির জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক ও চিন্তক৷  সে সময়টা ইতালিতে এক টালমাটাল অবস্থা চলছিল। ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব হলেও, ইতালি তখনো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামন্ততান্ত্রিক রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। ঘনঘন সরকার পরিবর্তন, পোপদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রবণতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, পার্শ্ববর্তী  বড় রাষ্ট্রগুলোর ইতালির রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ প্রভৃতি কারণে ইতালির অবস্থা ছিলো বেশ নাজুক।  ইতালির এমন পরিস্থিতিতে ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের জন্ম লাভ করে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন সামাজিক ও জাতীয় বিকাশের জন্য জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। ১৪৮৮ থেকে ১৫১২ সাল পর্যন্ত ইতালির রাজ্যগুলোকে একত্র করার জন্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৫১২ সালে ম্যাকিয়াভেলিকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে নির্বাসিত করা হয়।  এরপর তিনি সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে রাজনীতিক রচনায় মনোযোগ দেন। ম্যাকিয়াভেলির বিখ্যাত দুটি রচনা হলো ‘ডিসকোর্স’ এবং তার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর প্রকাশিত ‘প্রিন্স’ বইটি। তিনি রাষ্ট্রকে ধর্ম ও নীতির বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র মানুষের সৃষ্টি। এর পরিচালনাও মানুষের দ্বারা ও মানুষের কল্যাণের জন্য। তাই এর জন্য কোন ঐশ্বরিক বিধিমালা অনুসরণের দরকার নেই। তিনি রাজতন্ত্রকেই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য শাসন মনে করতেন। কারন বিশৃঙ্খল ইতালিতে জাতীয়ভাবে ঐক্য আনার জন্য একচ্ছত্র ক্ষমতার দরকার। ইতালিকে শুধু ঐক্যবদ্ধ নয়, সম্প্রসারিতও হতে হবে। মানুষের ক্ষেত্রে যেমন বিকাশ ও বৃদ্ধি দরকার। তেমনি রাষ্ট্রেরও বিকাশ ও সম্প্রসারণ দরকার। সেটা যদি অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে হয় তবুও। এটাই রাষ্ট্রের জীবন। রাষ্ট্র শাসনে তিনি কূটকৌশল ও শক্তি প্রয়োগের উপর জোর দিতেন। শাসককে দয়ালু ও দুর্বল হলে চলবেনা, তাকে জনসাধারণের মধ্যে ভয় ও সমীহের ভাব সৃষ্টি করতে হবে। ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্র দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি রাষ্ট্রকে ঐশ্বরিক নয়, মানুষের প্রয়োজনে ও মানুষেরই সৃষ্টি হিসেবে দেখেছেন।  তার দর্শন তখনকার পরিবেশে ঐক্য আনতে সমর্থ হয় সত্য। কিন্তু রাষ্ট্রে ‘নীতি হীনতা’ পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।

ফ্রান্সিস বেকন (১৬৬১-১৬২৬ খ্রিঃ)

ফ্রান্সিস বেকন ১৫৬১ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। শারীরিক দুর্বলতার কারনে শৈশবে গৃহেই তার পড়ালেখা শুরু হয়। তার জানার আগ্রহ কোন একটা বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিলো না। দর্শন, রাষ্ট্রনীতি আইন, বিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রেই তার সৃষ্টিশীল মননের পরিচয় পাওয়া যায়।  তিনি বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের প্রবক্তা এবং জ্ঞানান্ধতা ও গোঁড়ামিবিরোধী হিসেবেও সুখ্যাত হন।শুধু তত্ত্বগত জ্ঞান অর্জনই নয়,ব্যক্তিজীবনেও ক্ষমতা অর্জনের প্রয়াস চালান তিনি।তিনি ইংল্যান্ডের ‘লর্ড চ্যান্সেলর’ ও ‘এটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির উদ্ভাবক বলা হয় বেকনকে। যদিও বাস্তবিকে তিনি  বিজ্ঞানী ছিলেন না, দার্শনিকই ছিলেন। জ্ঞান অর্জনের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠায় তিনি ঘোষণা করেন যে, মানুষ জ্ঞান অর্জন করবে বিশ্ব প্রকৃতিকে জানার ও একে বশে আনার জন্য। তিনি অভিজ্ঞতালব্ধ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সূত্রপাত করেন। তার মতে জ্ঞান অর্জনের একমাত্র উপায় হচ্ছে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরিবর্তনশীল বিশ্বপ্রকৃতির প্রকৃত কারণ জানা। যেটা পরবর্তীতে ফলিত বিজ্ঞানের ভিত্তি রচনা করে।বেকনের পদ্ধতি ছিলো, তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংগঠিত উপায়ে তা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সত্য অনুধাবন করা। তার মতে প্রচলিত ধর্ম  ও দর্শন কল্পনার জাল বিস্তার করে বিশ্ব-প্রকৃতির ব্যাখ্যা করতে চায়। বস্তুত এভাবে সত্য জানা যায় না। সত্যিকার জ্ঞান শুরু হয় সন্দেহ ও প্রশ্ন দিয়ে। তিনি বলেন জ্ঞান অর্জনের পথে বাঁধা হিসেবে চার ধরনের অবদেবতা আসন গেড়ে বসে আছে। মানুষের মনকে এই অপদেবতা থেকে মুক্ত করতে হয়।  প্রথমটি হলো জাতিগত অপদেবতা। মানুষ হিসেবে মানুষের মধ্যে জাতিগত কুসংস্কার ও অবান্তর ধারনা বদ্ধমূল হয়ে আছে। সত্য নির্ধারণে মানুষ নিরপেক্ষ নয়। বরং তাকেই সত্য হিসেবে গ্রহণ করে যেটা তার স্বার্থ রক্ষা করে। এ কারণে ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞানকেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া চুড়ান্ত সত্য বলে মনে করে। দ্বিতীয় অপদেবতা হচ্ছে মানুষের মনের অন্ধকার বিবরের দেবতা। প্লেটোর গুহামানবদের মতোই প্রত্যেকটা মানুষ নিজ জীবনের অন্ধকার গুহায় বন্দী।  যার কারনে সে সত্যকে বুঝতে পারেনা। সত্যের ছায়াকেই সত্য মনে করে আঁকড়ে থাকে। কিন্তু মানুষকে এই অন্ধকার বিবর থেকে বের হয়ে আসতে হয়। যে তত্ত্বের প্রতি তার আগ্রহ বেশি সেটাকে সন্দেহ ও প্রশ্ন করে যাচাই করে নিতে হয়। বেকন তৃতীয় অপদেবতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন ভাষার সীমাবদ্ধতাকে। যেটাকে তিনি বাজারী অপদেবতা বলেছেন।  ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ অপরের কথা সঠিকভাবে বুঝেনা। নিজের ইচ্ছেমতো অপরের কথাকে ব্যাখ্যা করে।  তাই দর্শন ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সঠিক অর্থ নির্দিষ্ট করা জরুরি। বেকনের চতুর্থ অপদেবতা হচ্ছে থিয়েটার বা মঞ্চের অপদেবতা। প্রচলিত দর্শনকে তিনি থিয়েটার অপদেবতা বলেছেন।  মঞ্চ যেমন কৃত্রিম জগত তৈরি করে আসলকে ঢেকে রাখে, তেমনি দার্শনিকরা সত্যকে আড়াল করে মিথ্যা জগতের পরিবেশ তৈরি করে।  তাই এই অপদেবতাকে দূর করতে হবে।

বেকনের দার্শনিক ব্যাখ্যায় কখনো কখনো বস্তুবাদকে ছাপিয়ে ধর্ম প্রাধান্য পেয়েছে। তার দেখানো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হয়ত এখন হুবহু অনুসরণ করা হয়না। কিন্তু জ্ঞানার্জনের যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রবর্তন করেছেন, তার জন্য তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন।

তথ্য সূত্রঃ

১.দর্শনকোষ- সরদার ফজলুল করিম

২.এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা 

৩. উইকিপিডিয়া 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here