দর্শনের ইতিহাস (পর্ব ১৫): আধুনিক যুগ

প্রথমদিককার রেনেসাঁস দর্শনে মধ্যযুগীয় বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। রেনেসাঁসের পরবর্তী পর্যায়ে থমাস হবসের বস্তুবাদ, বেকনের অভিজ্ঞতাবাদ দর্শনকে মধ্যযুগীয় ধারা থেকে বের করে আনে।বেকনের বৈজ্ঞানিক সূত্র, দেকার্তের আত্মজৈবনিক অনুধ্যান, হবসের সুসংবদ্ধ গদ্যরীতি এগুলো আধুনিক যুগের সূচনা রেখা স্বরূপ।  মূলত আধুনিক দর্শনের শুরু হয় রেঁনে দেকার্ত ও তার বিখ্যাত উক্তি ‘I Think, therefore I exist’ অর্থাৎ ‘আমি চিন্তা করি বলেই আমি অস্তিত্বশীল’ এর মাধ্যমে। এছাড়া  ফ্রান্সিস বেকনের অভিজ্ঞতাবাদ ও থমাস হবসের বস্তুবাদ আধুনিকতার দিকে যাত্রাকে তরান্বিত করে।  সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে দেকার্তের দর্শন প্রভাবশালী হয়ে উঠে। দেকার্তে অতীতের দর্শনকে এমনভাবে সংশ্লেষণ করেন যেটা তার মৌলিকত্ব ধরে রেখেই সময়ের বৈজ্ঞানিক ধারার উপযোগী হয়ে উঠে। পরবর্তী সব ঐতিহাসিকই দেকার্তেকে আধুনিক দর্শনের জনক হিসেবে স্বীকার করেছেন।

রেঁনে দেকার্তেঃ (১৫৯৬-১৬৫০খ্রিঃ)

দার্শনিক ও গণিতবিদ রেঁনে দেকার্তে ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ বছর বয়সে তিনি সৈনিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।  সামরিক বাহিনীর চাকরি শেষে তিনি হল্যান্ডে যান এবং সেখানে প্রায় বিশ বছর দর্শন ও বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। তার বৈজ্ঞানিক মতবাদের কারণে হল্যান্ডের গোঁড়া ধার্মিকরা তাকে হল্যান্ড ত্যাগ করতে বাধ্য করেন।  হল্যান্ড ছেড়ে সুইডেনে গমন করেন তিনি। দেকার্তের হাত ধরেই আধুনিক দর্শনে বুদ্ধিবাদের বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে বুদ্ধিবাদ একটা শক্তিশালী ধারা হিসেবে বিকাশ লাভ করে। বেকনের মতো দেকার্তেও মনে করতেন, প্রাকৃতিক কার্যকারণ জ্ঞাত হয়ে প্রকৃতিকে জয় করা ও মানুষের চরিত্রের উন্নয়নই হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য। দেকার্তের মূল দার্শনিক জিজ্ঞাসা ছিলো কিভাবে কোনো কিছুর জ্ঞানে নিশ্চিত হওয়া যায়। তার যুগান্তকারী চিন্তা হচ্ছে সংশয়বাদ(scepticism)। তিনি ছিলেন পদ্ধতিগত সংশয়বাদী। তার মতে কোন কিছুকে ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রত্যক্ষ না করা পর্যন্ত আমরা যেমন সেটাকে সত্য বলে ধরে নেইনা। তেমনি কোন জটিল সমস্যাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগে বিভক্ত করে প্রত্যেকটা নিয়ে আলাদা আলাদা চিন্তা ও বিশ্লেষণ করে সত্য উদ্ঘাটন করতে পারি। চিন্তার ক্ষেত্রে সহজ থেকে জটিলের দিকে এগোতে হয়। তার ‘Meditation on first philosophy’ বইটাতে চিন্তার এই সূত্র দেখতে পাই। ইন্দ্রিয় থেকে শুরু করে সবকিছুকে সন্দেহ করলেও, চিন্তা যে কর্তা করছেন, তাকে সন্দেহ করা যায় না। এই সূত্র আকারেই তার বিখ্যাত উক্তি হলো, ‘আমি চিন্তা করি বলেই আমি অস্তিত্বশীল’। দেকার্তে বলেন ‘মানুষের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত অজ্ঞানতা থেকে মুক্তি লাভ করা।’ তার মতে অস্পষ্ট ধারণার উপর ভিত্তি করে কোন কিছু বিচার করতে নেই,কেউ যদি এমন করে তো ভুলই করবে। জ্যামিতি ও বলবিদ্যার ক্ষেত্রে তিনি গতি ও স্থিতির আপেক্ষিক সূত্র ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নিয়ম আবিষ্কার করেন। তিনি সৃষ্টি জগতের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে বস্তুর মৌলিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার স্থান নির্ভর বিস্তার। বস্তুর অন্যান্য ধর্ম যেমন-স্বাদ, গন্ধ, রং ইত্যাদি মানুষের মনের উপর নির্ভর করে। কিন্তু স্থানিক বিস্তার বস্তুর অনন্য বৈশিষ্ট্য। এবং বস্তু জগতের গতি ও স্থিতির কারণ হচ্ছেন ঈশ্বর।তিনি মানুষের দেহ ও মনের দ্বৈতবাদী ব্যাখ্যা দিয়েছেন।  তিনি মনে করতেন মানুষ দেহ ও মন, উভয়ের মিলিত সংগঠন। দেহ হচ্ছে মনহীন বস্তু আর মন হচ্ছে বস্তুহীন সত্তা।  দেকার্তে বস্তুবাদী মত দিয়ে যেমন গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন তেমনি অতি-প্রাকৃতিক অস্তিত্বের মূল স্থাপন করে আধুনিক দর্শনে ভাববাদী ধরারও সূচনা করেন।

স্পিনোজা (১৬৩২-১৬৭৭ খ্রিঃ)

দার্শনিক বারুখ স্পিনোজা বা বেনেডিক্ট ডি স্পিনোজা ১৬৩২ সালে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম এক ইহুদি পরিবারে। আমস্টারডামের ইহুদি স্কুলে তার পড়াশোনা শুরু হয়। সেখান থেকে তিনি ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা পান। পরে ইহুদি দার্শনিক ও কাব্বালা নামক মরমীবাদের সাথে পরিচিত হন। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান নিয়েও অধ্যয়ন করতে থাকেন। তিনি ধর্ম, দর্শন ও রাজনীতিসহ নানা বিষয়ে লিখেছেন। আধুনিক বুদ্ধিবাদী দর্শনের অন্যতম দার্শনিক স্পিনোজা। তার যুক্তিবাদী ও মুক্ত চিন্তার কারণে ইহুদি সম্প্রদায় তাকে সমাজচ্যুত করে। স্পিনোজাও বেকন ও দেকার্তের মতো মনে করতেন, জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হবে প্রকৃতিকে বশে আনা ও মানুষের কল্যাণ করা। প্রাকৃতিক বিধান মিথ্যা নয়। মানুষ প্রাকৃতিক বিধানের রহস্য উন্মোচন করবে। মানুষ প্রাকৃতিক বিধান দ্বারা চালিত হয়।  তবু মানুষ প্রকৃতির হাতের খেলনা নয়। মানুষের কর্মের স্বাধীনতা আছে। জগত ও ঈশ্বর এই ধরনের দ্বৈত বিভাজন তিনি করতেন না। তিনি মনে করতেন জগতই একমাত্র সত্তা, এর কোন দ্বিধা বিভাজন দরকার নেই। জগত নিজেই এর কারণ ও সৃষ্টি।  এর সৃষ্টির পেছনে কোন আদি কারণ থাকার প্রয়োজন নেই।  দর্শনে তিনি জ্যামিতিক পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। তিনি অভিজ্ঞতালব্ধ ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জ্ঞানকেই চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করতেন না। তার মতে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাই জ্ঞানের নির্ভরযোগ্য উৎস। সত্তাগত জ্ঞানই সংশয়োর্ধ্ব জ্ঞান। সংশয়হীন জ্ঞানই চূড়ান্ত সত্য।  আর এ জ্ঞান শুধু প্রজ্ঞার মাধ্যমে পাওয়া যায়। ধর্ম নিয়ে স্পিনোজার মত হলো, ধর্মের উদ্দেশ্য মানুষের চরিত্রের উন্নয়ন ঘটানো। মানুষ স্বাধীনভাবে জীবন, জগত ও ঈশ্বর নিয়ে চিন্তা করবে। রাষ্ট্র বা ধর্মের উচিত নয় তাকে বাঁধা দেয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি গণতন্ত্রের পক্ষে মত দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক সরকারই হচ্ছে রাষ্ট্রের সার্বভৌম শক্তি।  মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমেই এ সার্বভৌম শক্তির নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব। ধর্ম, দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে স্পিনোজার এমন মুক্ত  চিন্তা সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের বস্তুবাদী চিন্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

লিবনিজ (১৬৪৬-১৭১৬ খ্রিঃ)

দার্শনিক, গণিতবিদ ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাত গটফ্রেড উইলহেম লিবনিজের জন্ম জার্মানিতে। এছাড়াও তিনি ভূতত্ত্ববিদ , প্রাণীবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিকও ছিলেন। তার জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা ছিলো বহুমুখী। তাকে বাস্তব-ভাববাদী দার্শনিক বলা হয়। ডিফারেনসিয়াল ক্যালকুলাসের একজন আবিষ্কর্তা হিসেবে ধরা হয় লিবনিজকে। পদার্থবিদ্যায় ‘শক্তি সঞ্চয়’ বিধান আবিষ্কারের পূর্বাভাস দেন তিনি। সমাজজীবনে তিনি ছিলেন নিরলস সংগঠক। বার্লিন বিজ্ঞান একাডেমির মূল পরিকল্পনা ছিলো তার করা । সপ্তদশ শতকের দার্শনিকদের মধ্যে লিবনিজের দর্শন ছিলো সবচেয়ে যুক্তি নির্ভর। লিবনিজ মনে করতে বুদ্ধি মানুষের এক অভূতপূর্ব শক্তি। বুদ্ধি অভিজ্ঞতা থেকে অনেক কিছুই গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু মানুষ অভিজ্ঞতা থেকে বুদ্ধিকে গ্রহণ করতে পারেনা। অভিজ্ঞতা মানুষের মনে জ্ঞানের সার্বিক সূত্র জন্ম দিতে পারেনা। জ্ঞানের সার্বিক সূত্রগুলোর সাহায্যই মানব মন অভিজ্ঞতাকে বুঝতে পারে। তার এই জ্ঞানতত্ত্বকে ভাববাদী বুদ্ধিবাদ বলা হয়।

বার্টান্ড রাসেল লিবনিজকে আঙ্কিক যুক্তি শাস্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। বিশ্বজগতের রহস্যের ব্যাখ্যায় তিনি ‘মোনাড’ তত্ত্ব দিয়েছেন। তার মতে বিশ্বজগত অসংখ্য মোনাড দিয়ে গঠিত। বিশ্ব গঠনের মৌলিক সত্তা হচ্ছে মোনাড। তবে মোনাড বস্তু নয়, অবস্তু সত্তা। মোনাড অবিভাজ্য, প্রত্যক্ষদর্শীও আত্মক্রিয়। তবে এই মোনাডের মধ্যে কোন কার্যকারণ সম্পর্ক নেই। মোনাডে মোনাডে সম্পর্কিত হয়ে গড়ে উঠেছে সুসংহত বিশ্ব। সর্বশ্রেষ্ঠ মোনাড বা বিধাতার সঙ্গতির ছায়াই যেন পড়েছে জগতে প্রতিটি মোনাডে।

তথ্য সূত্রঃ

১.দর্শনকোষ- সরদার ফজলুল করিম

২.এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা 

৩. উইকিপিডিয়া 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here