দর্শনের ইতিহাস (পর্ব ১৬): এনলাইটেনমেন্ট যুগ

ইউরোপের এনলাইটেনমেন্ট বা আলোকায়নের যুগের সূত্রপাত সপ্তদশ শতকে। মানুষের স্ব-আরোপিত অপরিপক্বতা ও অজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসাটাই হলো এনলাইটেনমেন্ট। আর এই অপরিপক্বতা বা নাবালকত্ত বলতে অন্যের পরামর্শ-উপদেশ বা নির্দেশনা ছাড়া নিজের যুক্তিবোধ ও বিবেচনাবোধকে ব্যবহার না করতে পারাকে বুঝায়। এনলাইটেনমেন্টের মূলে ছিলো নিজেকে জানার দুঃসাহস তৈরী করা। নিজের বোঝাপড়া, নিজের উপলব্ধি ও বিবেচনাবোধ কে ব্যবহার করবার দুঃসাহস সঞ্চয় করা। তাই সপ্তদশ শতকের এই বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মূখ্য উপজীব্য ছিল ব্যক্তিস্বকীয়তা, মানুষের স্বাধীনতা, মানব ঐতিহ্য ও যুক্তিবাদের প্রতিষ্ঠা। প্রথাগত বিশ্বাস ও কুসংস্কারের শাসন থেকে মানুষকে মুক্ত করে, বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞানের বিকাশ ও সমাজকে মানবিকতার পথে পরিচালিত করাই ছিলো এ আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই আন্দোলনের পূর্বে দর্শন চর্চা থেকে শুরু করে  প্রায় সকল সামাজিক  কর্মকাণ্ডই পরিচালিত হত সমাজের ধনিক ও অভিজাত শ্রেণির দ্বারা। এবং তাদের সংকীর্ণ গণ্ডিতেই তা আলোচিত ও সীমাবদ্ধ ছিলো। আধুনিক যুগের প্রথম দিকে উদ্ভাবনী দর্শনের চর্চা আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্র গুলো থেকে পৃথক ভাবে চলেছে। অক্সফোর্ডের এরিস্টটলবাদকে হবস তীব্র অবজ্ঞার সাথে দেখেছে। দেকার্তেও সোরবোনের মধ্যযুগীয় চর্চাকে ভালো চোখে দেখেন নি। হাইডেলবার্গে দর্শনের শিক্ষকতার প্রস্তাবকে স্পিনোজা ফিরিয়ে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে  দর্শন চর্চা শুরু হতে আরো শত বছর লেগে গেছে। 

মূলত সত্যিকারের এনলাইটেনমন্টের সূচনা হয় স্যার আইজাক নিউটন ও জন লক কর্তৃক।

 বিস্তৃত পরিসরে গণিতের উপর ভিত্তি করে প্রকৃতির বৈজ্ঞানিক সংশ্লেষণ শুরু করেন কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিও।  গ্যালিলিও ও কোপার্নিকাসের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আন্দোলন সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে মূলত নিউটনের বিখ্যাত বই ‘Philosophiae Naturalis Principia Mathematica (1687)’ রচনার মধ্য দিয়ে। নিউটনের এই কাজেরই ফসল ছিলো স্বকীয় যুক্তিবাদ ও এর কর্তৃত্বের প্রাধান্য, যেটা আঠার শতকের সব ধরনের দর্শন চর্চায় প্রভাব বিস্তার করেছে।  এসময় সমাজ ও দার্শনিক সমস্যার সমাধানে কিছু মূলনীতির উদ্ভব হয়। সে মূলনীতিগুলো হলো কোন বিষয় সম্পর্কে উপসংহারে আসার জন্য সঠিক যুক্তি ব্যবহার করা, যুক্তিগুলো প্রত্যক্ষ প্রমাণ দিয়ে ঝালিয়ে নেওয়া এবং পুনরায় প্রমাণের আলোকে মূলনীতিগুলো পর্যালোচনা করা। কিন্তু দুটি বড় দার্শনিক সমস্যা রয়ে যায়। একটি হলো যুক্তির উৎসের একটি ব্যাখ্যা দেয়া। আর দ্বিতীয়টি হলো বস্তু জগত থেকে মানুষের প্রকৃতিতে এর প্রয়োগ। প্রথম সমস্যাটি সমাধান জন লক তার ‘Essay Concerning Human Understanding (1690)’ লিখেন।আর হিউমের ‘Treatise of Human Nature’ বইটা লেখা হয় দ্বিতীয়  সমস্যার সমাধানে।  এখানে পরীক্ষামূলক যুক্তি পদ্ধতি কিভাবে নৈতিক মানুষের উপর প্রয়োগ করা যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

রেনেসাঁস পরবর্তী সময়ে এই দুটি মৌলিক কাজ দর্শনের নতুন দিক উন্মোচন করে। রেনেসাঁসের সময়ে দার্শনিকদের মধ্যে গণিতের প্রতি যে প্রবল আগ্রহ ছিলো, সেটাই এ সময়ে যৌক্তিক নীতিমালার দিকে ঝুঁকতে সহায়ক হয়। এসময় যেহেতু দর্শন অনেক বেশি মানুষের প্রকৃতি কেন্দ্রিক হয়ে যায়, তাই  দার্শনিকগণ প্রকৃতির বাস্তবতা থেকে মানুষের মনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এনলাইটেনমেন্টের এ যুগে শুধু গণিতকেন্দ্রিক না হয়ে বরং জ্ঞানের সংবেদনশীল ও পরীক্ষামূলক উপাদান কেন্দ্রিক চর্চার শুরু হয়। রেনেসাঁসের দর্শন যেখানে অধিবদ্যক ও যুক্তিবাদী ছিলো, এনলাইটেনমেন্টের দর্শন সেখানে বেশি মাত্রায় অভিজ্ঞতামূলক ও জ্ঞানতত্ত্বীয়। জন লক, জর্জ বার্কলে ও ডেভিড হিউম এই তিনজন ব্রিটিশ অভিজ্ঞতাবাদী কান্টের পূর্ব পর্যন্ত এনলাইটেনমেন্টের প্রভাবশালী দার্শনিক ছিলেন।

জন লক (১৬৩২-১৭০৪ খ্রিঃ)

জন লকের জন্ম ১৬৩২ সালে ইংল্যান্ডের রিংটোনে। তার বাবা ছিলেন ব্রিটিশ সংসদের একজন পিয়ন।

তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় ওয়েস্টমিনিস্টার স্কুলে। স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে অসাধারণ ফলাফলের কারণে অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজে স্কলারশিপে পড়ালেখার সুযোগ পান তিনি। সেখানে মানবিকে স্নাতক শেষ করে শিক্ষকতা শুরু করেন।  তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং ‘ন্যাচারাল ফিলসফি’ বা প্রাকৃতিক দর্শনের প্রতি তার ছিলো প্রবল আগ্রহ। পরে তিনি ডাক্তারি বিদ্যা ও প্রাকৃতিক দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিখ্যাত  প্রাকৃতিক দার্শনিক রবার্ট বয়েলের  সান্নিধ্যে এসে তার জ্ঞানতৃষ্ণা আরো বেড়ে যায়। তার প্রধান দার্শনিক রচনা হচ্ছে ১৯৬০ সালে প্রকাশিত ‘Essay Concerning Human Understanding’ বইটি।

 লকের এই লেখা আধুনিক দর্শনের নতুন ধারা তৈরি করে। এই বইয়ের লক্ষ্য ছিলো মানুষের জ্ঞানের উৎস, এর নিশ্চয়তা ও বিস্তার অনুসন্ধান। এর জন্য তিনিটা কাজ করতে হয়। প্রথম মানুষের চিন্তা-ভাবনার উৎস আবিষ্কার করা। দ্বিতীয় এটার নিশ্চয়তা ও প্রামাণিক মূল্য নির্ধারণ করা। তৃতীয়টি হলো যে জ্ঞান গুলো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, সেগুলো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। লকের মতে জ্ঞান অর্জনের   মূল লক্ষ্য  হচ্ছে জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন। তিনি জ্ঞানের সীমানাকে অসীম বলেন নি। মানুষ বস্তু ও অবস্তু জগতের অনেককিছুই জানতে পারেনা, তাই বলে জ্ঞানের ক্ষেত্রে মানুষ অসহায় নয়। লকের জ্ঞানতত্ত্ব মূলত বস্তুবাদী অভিজ্ঞতাবাদের জ্ঞানতত্ত্ব। তিনি মনে করতেন অভিজ্ঞতার বাইরে বা জন্মগত কোন ভাবের অস্তিত্ব নেই। মানুষের মনের সকল ভাবের মূলেই রয়েছে অভিজ্ঞতা। মৌল ও অ-মৌল বস্তুজগত মানুষের ইন্দ্রিয়ের উপর আঘাত হানে। এই আঘাতের ফলেই মানুষের মনে ইন্দ্রিগত ভাবের সৃষ্টি হয়। আবার সে নিজের মানসিক ক্রিয়াকলাপের উপর দৃষ্টি দিয়ে মনোগতভাবেরও সৃষ্টি করতে পারে।  এই মনোগতভাবের ধারনার মধ্য দিয়ে তিনি ভাববাদের সাথে কিছুটা আপোস করতে সচেষ্ট হয়েছেন। লক মনে করতেন ভাব মাত্রই জ্ঞান নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে ইন্দ্রিয় যে ভাব সংগ্রহ করে তা জ্ঞানের কাঁচামাল। এই কাঁচামালের সংশ্লেষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে জ্ঞানের সৃষ্টি হয়। জন্মগত কোন ভাব মানুষের থাকেনা। জন্মের সময় মানুষ মন থাকে দাগহীন শ্লেটের মতো। বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়ে মানুষের  অভিজ্ঞতাও বৃদ্ধি পায়। এবং তা ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে এই দাগহীন শ্লেটে দাগ কাটে। এই দাগগুলোই হলো ভাব বা জ্ঞানের কাঁচামাল।

 জন লকের জীবন কালে, ইংল্যান্ডে ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। তা সমাপ্তি ঘট গ্লোরিয়াস বিপ্লবের মাধ্যমে।  রাজনৈতিক তত্ত্বে তিনি মানুষের আদিম স্তর থেকো ক্রমান্বয়ে সভ্যতার উত্থান নিয়ে আলোচনা করেছেন। আলোচনা করেছেন সরকারের প্রকারভেদ নিয়ে। তার মতে সকল রাজনৈতিক শক্তির উৎসই হচ্ছে ‘স্টেট অব ন্যাচার’। স্টেট অব ন্যাচার হচ্ছে এমন অবস্থা যখন মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ ছিল না।  প্রত্যেকেই ছিলো স্বাধীন। কেউ ঈশ্বর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে শাসন করবে আর বাকিরা তার দাসত্ব করবে এমন নয়। তাই রাষ্ট্রের কাজ হলো নাগরিকদের ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষা ও তাদের সম্পদের নিরাপত্তা বিধান করা। সরকারের কাজ জনগণের অধিকার হরণ করা নয়, রক্ষা করা। রাষ্ট্রের এ ভূমিকা লঙ্ঘন করে যদি শাসক স্বৈরাচারী হয়ে উঠে তখন নাগরিকগণ সে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দার্শনিকদের একজন জন লক, যিনি মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার পথের এক ঐতিহাসিক পাথেয় হিসেবেই স্মরণীয়। তাকে অনেকেই রাজনৈতিক দর্শনের জনক হিসেবেও অভিহিত করেন।

তথ্য সূত্রঃ

১.দর্শনকোষ- সরদার ফজলুল করিম

২.এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা 

৩. উইকিপিডিয়া 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here