দর্শনের ইতিহাস (পর্ব ১৭): এনলাইটেনমেন্ট যুগের দার্শনিকগণ

স্যার আইজাক নিউটন (১৬৪৩-১৭২৭ খ্রিঃ)
সপ্তদশ শতকের বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তক আইজাক নিউটন মূলত পদার্থ ও গণিতবিদ ছিলেন, যিনি আধুনিক পদার্থবিদ্যার নীতির উন্নয়ন ঘটান। নিউটনের জন্ম ইংল্যান্ডের লিংকনশায়ারে। তিনি বিজ্ঞানী হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও দার্শনিক চিন্তাকেও বিরাটভাবে প্রভাবিত করেছেন। প্রকৃতি এবং যুক্তি দ্বারা বোধগম্য মৌল নীতিসমূহের আলোকে নিউটনই প্রথম মহাবিশ্বের ধারণাকে পরিষ্কার করতে সমর্থ হন।আলোকিত যুগের আদর্শের সূচনা এখান থেকেই।
নিউটন তার সবচেয়ে বিখ্যাত বই ‘Philosophiae Naturalis Principia Mathematica (1687)’ তে গতির সূত্র এবং মহাকর্ষ তত্ত্ব বর্ণনা করেন। তার দেয়া সূত্র ও মৌল নীতিগুলোই চিরায়ত বলবিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন যে একই প্রাকৃতিক নিয়মে পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সকল বস্তু পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর গবেষণার ফলেই সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের সন্দেহগুলো দূরীভূত হয়ে বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ত্বরান্বিত হয়। তার সর্ব ব্যপক মধ্যাকর্ষন তত্ত্ব যেমন সূর্য কেন্দ্রিক সৌরজগতের ধারনাকে পূর্নতা দান করে তেমনি বস্তু জগত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া সমূহের ব্যাখ্যার উপায় প্রদান করে। নিউটন মনে করতেন সত্তার বাস্তব অস্তিত্ব আছে এবং মানুষ বিশ্বজগতের জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম। সময়ের প্রেক্ষিতে বস্তুর চালিকাশক্তি আসে ঈশ্বর থেকে। জ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি বলতেন যে, তিনি অনুমানের উপর ভিত্তি করে কোন কথা বলেননা। ‘হাইপোথিসিস ননফিঙ্গো’ যেটা অষ্টাদশ শতকে বিজ্ঞানের বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার নীতি হয়ে দাঁড়ায়। এবং তিনি মনে করতেন জ্ঞানের জগত অসীম। তার সেই বিখ্যাত উক্তি, ‘ আমি জ্ঞান সমুদ্রের তীরে নুড়ি সংগ্রহ করে চলছি’ দার্শনিক তাৎপর্যে অনুপ্রেরণাদায়ক উক্তি হয়ে আছে।

জর্জ বার্কলে (১৬৮৫-১৭৫৩ খ্রিঃ)
জর্জ বার্কলের জন্ম আয়ারল্যান্ডের কিলকেনিতে। তিনি ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মযাজক ও ভাববাদী দার্শনিক। বলা হয় প্লেটো থেকে শুরু করে কান্টের পূর্ব পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী ভাববাদী দার্শনিক ছিলেন বার্কলে। তাকে প্রধান তিন জন অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিকদের একজন মনে করা হয় (অপর দুজন হলেন জন লক ও ডেভিড হিউম)। ফ্রান্সিস বেকনের পর্যবেক্ষণমূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, নিউটনের মহাকর্ষ তত্ত্ব এবং জন লকের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সমর্থনের ভাবধারার সাথে সাথে দর্শন ও বিজ্ঞান যে নতুন সমাজ গড়ে তোলার দিকে আগাচ্ছিল, সে প্রেক্ষাপটে প্রচলিত ধর্মীয় ভাবধারা খুবই বিপন্ন বোধ করে। সেই প্রেক্ষিতে বার্কলে ধর্মীয় চিন্তার সাথে সমন্বয় ও প্রচলিত বস্তুবাদের জবাবে তার দর্শন প্রচার করেন। বলা হয় বার্কলের বিখ্যাত বই ‘Principles of human knowledge’ তার পূর্ববর্তী দার্শনিক জন লকের দর্শনের সমালোচনা ও এর জবাবে লেখা। জ্ঞানের ক্ষেত্রে বার্কলে বস্তুকেই জ্ঞানের উৎস মনে করতেন না। তার মতে বস্তুকে জ্ঞানের উৎস ধরা হলে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়। বস্তুই তখন পরম সত্তা হয়ে দাঁড়ায়। বার্কলের মতে জ্ঞানের মূল উপাদান হলো ধারণা। আমরা কেবল ধারণাকেই প্রত্যক্ষ করি। কেবল মন ও মনের ভাবেরই অস্তিত্ব আছে। বাহ্যবস্তুর পৃথক কোন সত্তা নেই। বস্তুর অস্তিত্ব নির্ভর করে মনের উপর বা প্রত্যক্ষের উপর। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাই জ্ঞান অর্জনের উপায় হলে বস্তুর পৃথক অস্তিত্ব স্বীকার করতে পারিনা। কারণ বস্তুর অস্তিত্ব প্রত্যক্ষের বিষয় নয়। আর বস্তুর অস্তিত্ব ব্যক্তির মনের উপরে নির্ভর করে না। এক্ষেত্রে বার্কলে দুটি সূত্রের অবতারণা করেন।
১.ব্যক্তিক মনের বাইরে এক স্বাধীন চরম মনের অস্তিত্ব আছে। সেই চরম মনই হচ্ছে ঈশ্বর।
২. ঈশ্বরের মনে সমস্ত ভাব সুপ্ত অবস্থায় আছে। বিধাতার ইচ্ছায় সেই ভাব ব্যক্তি মনে উৎসারিত ঠহয়। বিজ্ঞানের বিষয়ে তার অভিমত হলো, বিজ্ঞানের কাজ হলো জগতের মূলে যে স্রষ্টা আছেন তার প্রকাশ বোঝার চেষ্টা করা, জাগতিক কার্যকারণ সম্পর্ক দিয়ে জগতকে ব্যাখ্যা করা না।

ডেভিড হিউম (১৭১১-১৭৭৬ খ্রিঃ)
ডেভিড হিউমকে নিয়ে একটা গল্প প্রচলিত আছে যে তিনি নিজেকে দার্শনিক হিসেবে উপাস্থাপন করার জন্য দর্শন বিষয়ক একটি বই লিখেন। কিন্তু বইটি বিক্রি না হওয়ায় বইয়ের অধ্যায়গুলোকে আলাদা আলাদা করে পুনরায় লিখে প্রকাশ করেন। কিন্তু একই অবস্থা, বই আর বিক্রি হয় না। এই অবস্থা দেখে তিনি দার্শনিকগিরি বাদ দিয়ে ব্রিটেনের ইতিহাস লেখার সিন্ধান্ত নেন এবং ইংল্যান্ডের প্রথম ঐতিহাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ডেভিড হিউমের জন্ম ১৭১১ সালে, এডিনবার্গে। ঐতিহাসিক ও দার্শনিক ডেভিড হিউম অর্থনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক ও মনোবিজ্ঞানী হিসেবেও বিখ্যাত ছিলেন। যিনি দার্শনিক সমীচীন ভাবধারতা ও প্রকৃতিবাদে তার অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যবস্থার জন্য সুপরিচিত। তার প্রধান দার্শনিক রচনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘A Treatise of Human Nature’, ‘The Enquiries concerning Human Understanding’ ও ‘Concerning the Principles of Morals’। সমসাময়িক রক্ষণশীল চিন্তকগণ তাকে নাস্তিক ও সন্দেহবাদী হিসেবে আখ্যা দিলেও, নৈতিক দর্শন ও তার বন্ধু এডাম স্মিথের অর্থনীতি বিষয়ক লেখায় তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব লক্ষণীয়। কান্ট দাবি করেছেন হিউমের লেখা তাকে গোঁড়া ও যুক্তিহীন তন্দ্রা থেকে জাগ্রত করেছে। ডারউইন হিউমের লেখাকে বিবর্তনের মূল প্রভাবক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জ্ঞানের সমস্যা সমাধানে হিউম যে ব্যাখ্যা দেন তা পরবর্তী ভাববাদী দর্শনকে ব্যপকভাবে প্রভাবিত করে। জ্ঞানের মূল হলো ভাব। এই আপ্তবাক্য দুইটা ধারার সৃষ্টি করে। বার্কলে বলেন যে, ভাবের মূল হচ্ছে মন। আর লকের মতে ভাবের মূলে আছে অভিজ্ঞতা। এক্ষেত্রে হিউম এসে বললেন এই বিরোধিতার মাধ্যমে মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব না। বস্তু আছে কি নেই,ভাবের তত্ত্ব দ্বারা এ প্রশ্নের সমাধান সম্ভব না। হিউম মনে করেন বস্তু আছে কি নেই, জ্ঞান দ্বারা এ প্রশ্নের উত্তর মানুষ দিতে পারেনা। আসলে মানুষ বস্তুর জ্ঞান অর্জনই করতে পারেনা। তার মানে এই নয় যে মানুষ জেনে ফেলেছে যে বস্তু নেই। আসলে বস্তুর সঠিক জ্ঞান বলতে কিছু নেই। সঠিক জ্ঞান কেবল অঙ্কশাস্ত্রেই সম্ভব। কারণ অঙ্কের কাজ বস্তু নিয়ে নয়, সংখ্যা ও সূত্র নিয়ে।তবে জ্ঞানের উদ্দেশ্য বস্তুর অস্তিত্ব নির্ণয় করা নয়। জ্ঞানের কাজ মানুষের জীবন যাপনে সহায়ক হওয়া। বস্তু আছে কি নেই, সেটা বিশ্বাসের ব্যাপার, প্রমাণের বিষয় নয়। আমরা বিশ্বাস করি বস্তুর মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক আছে। একটাকে আরেকটার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করি। কিন্তু ঘটনার মধ্যে কারণ বা ফল আছে তা প্রমাণ করা যায় না। সময় সম্পর্কে মানুষের ধারণা অনুযায়ী ঘটনাসমূহকে আগে-পরে হিসেবে কল্পনা করে থাকে।কিন্তু কার্যকারণ সম্পর্ক খুঁজে তার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ বাানী করা চলেনা। অনিবার্য পুনরাবৃত্তির নিয়ম সে আবিষ্কার করতে পারে না। তবে তাই বলে জগৎ বিশৃঙ্খল নয়। মানুষের অভিজ্ঞতায় ঘটনাসমূহকে শৃঙ্খলার সাথেই ঘটতে দেখে। কিন্তু ঘটনাসমূহের কার্যকারণ সম্পর্কে বিশ্বাস ও প্রমাণ একই বিষয় নয়। অর্থাৎ জ্ঞানের ক্ষেত্রে হিউম মনে করতেন মানুষের পক্ষে বস্তুর জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য তাকে অজ্ঞেয়বাদী বলা হয়।
তথ্য সূত্রঃ
১.দর্শনকোষ- সরদার ফজলুল করিম
২.এনসাক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
৩. উইকিপিডিয়া

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here