নানা গুণে ভরপুর বনফুল ঘেঁটু

ছবিতে ঘেটু ফুল দেখতে পাচ্ছেন; image source: Wikimedia

বাংলাদেশে বসন্ত গ্রীষ্মে মাঠের পাশে পথের ধারে পল্লীর জঙ্গলে আলো করা রূপে ভাট ফুল ফুটতে দেখা যায়। সে ফুলের রূপে মুগ্ধ হয়ে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহে মত্ত থাকে। কবিরাও সে রস আস্বাদন থেকে বাদ যায় নি। কবি জীবনানন্দ দাশ গ্রামের ঝোপঝাড়ে ভাট ফুল ফুটতে দেখে কাব্য রচনা করেছেন। জীবনানন্দ দাশের মতো ঘেটু ফুল নিয়ে কবিতা লিখেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

ঘেটু নামটি এসেছে পূরানের ঘণ্টাকর্ণ থেকে। প্রাচীনকালে পৌরাণিক ঘণ্টাকর্ণ শব্দের বিবর্তনে আজ হয়েছে ঘেটু। ঘণ্টাকর্ণ ছিলো শিবের এক রুদ্রানুচর। এর সাথে বিয়ে হয়েছিলো দেবী শিতলার। দেবী শিতলা বসন্তকালে বসন্ত রোগ নিয়ে আসেন। সে সংক্রমন থেকে রক্ষা পেতে সেসময় বসন্তকালে দেবী শিতলার পুজা শুরু করা হয়। সেই সঙ্গে ভাটপুজাও দেওয়া হতো চৈত্রসংক্রান্তির দিনে। আর এভাবেই পরিচিত হলো ঘেটু বা বাট।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘেটু আর জীবনানন্দ দাশের ভাট গাছ একই। ফুলও একই ।পার্থক্য শুধু দুই বাংলার। আরণ্যক এর ঘেটু ফুল আমাদের দেশে ভাট ফুল নামে পরিচিত। এর অন্যান্য আরও অনেক নাম আছে। যেমনঃ ভাটগাছ, ভাইটগাছ, ভাইদোরা, কুইদিন ইত্যাদি। গারো ভাষায় বাইটা গাছ, তামিল ভাষায় ভট্টকান্নি। ঘেটু গাছের ইংরেজী নাম গ্লোরি ট্রি এবং উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম clerodendrum viscosum এবং পরিবার ভার্বেনেসী। ঘেটু গুল্ম প্রকৃতির বর্ষজীবী জংলি উদ্ভিদ। গাছ ১ থেকে ২ মিটার উচু হয়। কান্ড ও প্রশাখা চতুষ্কোণাকার। পাতা ধুসর সবুজ, খসখসে, প্রায় গোলাকার, কিছুটা হৃদপিন্ডাকৃতি তবে পাতার আগা খুব সুচালো নয়। কান্ডে পাতা বিপরীতমুখীভাবে বিন্যাসিত। ছড়ায় থোকা ধরে ফুল ফোটে। ঝোপ করে অনেক গাছে ফুল ফুটলে সুন্দর দেখায়। ফুলে হালকা সুবাস আছে।

ফুলের পাপড়ি পাঁচটি এবং এদের রঙ সাদা। কেন্দ্রস্থল বেগুনি বা লালচে। ফল মটর বুটের মতো গোল চকচকে, পাকলে ফলের রঙ হয় কালো। ভালোভাবে পাকা বীজ বুনে চারা তৈরি করা যায়। বীজ গজাতে ২০ থেকে ৬০ দিন সময় লাগে। বীজ ছাড়া শিকড় কেটে লাগালে তা থেকে গাছ হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে ঘেটুগাছ অনেক দেখা যায়।

ঘেটুগাছ তিতা স্বাদের। ক্লিরোডিন নামক একপ্রকার রাসায়নিক দ্রব্যের কারণে এ গাছ তিতা হয়। তিতার কারণেই তা কৃমি নিয়ন্ত্রণ করে। পাতা ও শিকর বেটে মলমের মতো টিউমারের ওপর লাগানো হয় এবং এতে থাকা ক্লিরোডোলন, ক্লিরোডেন এবং কিলোস্টেরল সহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানের কারণে টিউমার নিরাময়ে সাহায্য করে। অর্শের বগিতে ঘেটুপাতার রস লাগালে যন্ত্রণা কমে। পাতার রস খেলে রক্তে চিনির পরিমাণ কমে। এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ হয়।

খাওয়ার জন্য, অজীর্ণ পেটব্যাথা, ম্যালেরিয়া জ্বর, বিছার কামড়, উকুন ইত্যাদি চিকিৎসার ঘেটুগাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here