পতাকার জন্মকথা – মিশে আছে রক্ত ও রাজকীয়তা

পতাকার জন্মকথা ও ইতিহাস
পতাকার জন্মকথা

পতাকার প্রচলন শুরু প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ অব্দ থেকে। তখন পতাকা ব্যবহৃত হত রাজকীয় নিদর্শনস্বরূপ কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক হিসেবে। পতাকার জন্মকথা  মানে হলো বহু জাতি ও দেশের যুদ্ধের কথা। প্রাচীনকালে যুদ্ধের ময়দানে পতাকাবাহীর পতনকে পরাজয়ের পূর্বলক্ষণ মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে পতাকা একটি জাতির গৌরবের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি প্রতিনিধিত্ব করে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের। রাষ্ট্রীয়কার্য থেকে আপামর জনতার জীবনযাত্রা, সবক্ষেত্রেই পতাকার ব্যবহার রয়েছে।

পাঠক! ভূমিকা পড়েই বুঝতে পারছেন, প্রবন্ধটি পতাকা নিয়ে। তবে পতাকার ইতিহাস বা ব্যবহারের নিয়মাবলী নয়, এ প্রবন্ধটিতে আলোচনা করা হবে, আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর পতাকায় বিদ্যমান বিভিন্ন বৈচিত্র্য নিয়ে।
⚾পতাকার আকৃতি
সাধারণত বিশ্বের সকল দেশের পতাকাই আয়তাকার।  তবে এ নিয়মের ভিন্ন দেশ তিনটি।
সুইজারল্যান্ড, ভ্যাটিকান সিটি ও নেপাল। তন্মধ্যে সুইজারল্যান্ড ও ভ্যাটিকান সিটির পতাকা বর্গাকার অর্থাৎ ১:১।
আর নেপালের পতাকা দুটি ত্রিভুজের সমন্বয়ে গঠিত। ত্রিভুজ দুটির উচু অংশ নির্দেশ করে হিমালয় পর্বতের দুটি পর্বতশৃঙ্গ। পতাকায় রয়েছে একটি করে চাঁদ ও সূর্য। নেপালিদের বিশ্বাস, যতদিন চাঁদ ও সূর্য থাকবে ততদিন নেপালও টিকে থাকবে।
⚾রংবৈচিত্র্য
বিভিন্ন রঙে নকশা করা পৃথিবীর পতাকাগুলো।এসকল রঙের মাঝে সবচেয়ে বেশী ব্যবহৃত হয়েছে লাল রঙ। প্রায় ১৪৮ টি দেশের পতাকায় রয়েছে এ রঙটি। তারপরে সাদা ও নীল রঙ রয়েছে যথাক্রমে ১৪০ টি ও ১০২ টি দেশের পতাকায়। ৩০টি পতাকায় একইসাথে রয়েছে লাল, সাদা ও নীল রঙ। জ্যামাইকাই একমাত্র দেশ, যার পতাকায় এই তিনটির কোনোটিই ব্যবহার করা হয়নি। পতাকার জন্মকথা এর সাথে মিশে আছে এর রং ও আকর্ষনীয় নকশা।
⚾পতাকার জগতে বয়োজ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ
বর্তমান আধুনিক পতাকাগুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে প্রাচীন এ নিয়ে দেশে দেশে ব্যাপক মতপার্থক্য।  গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী, সবচেয়ে প্রাচীন পতাকার অধিকারী দেশ ডেনমার্ক। ত্রয়োদশ শতকে এর ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে, লিন্ডানিসের ক্রুসেডে রাজা দ্বিতীয় ভালদেমার যখন পরাজয়ের সম্মুখীন হয়েছিলেন, তখন আকাশ থেকে ক্রুশসম্বলিত এ পতাকা পড়ে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পতাকার জগতে কনিষ্ঠতার বিষয়টি বলা দুষ্কর। কেননা প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক,  ঐতিহাসিক কিংবা সাংস্কৃতিক কারণে নতুন নতুন পতাকার উৎপত্তি হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নতুন পতাকার অধিকারী দেশ মৌরিতানিয়া। ২০১৭ সালের ৫ই আগস্ট গণভোটে ৮৫ শতাংশ মানুষের সমর্থনে ৫৮ বছরের পুরনো পতাকায় পরিবর্তন আনা হয়।
⚾ ইউনিয়ন জ্যাক
প্রতিটি দেশের পতাকার রং বা ব্যবহৃত চিহ্নগুলো সে দেশের কোনো বৈশিষ্ট্যকে ফুটিয়ে তোলে। যুক্তরাজ্যের পতাকার জন্মকথা যদি বলি তাহলে বলা যায় এটিকে ইউনিয়ন জ্যাক। এই ইউনিয়ন জ্যাক। মূলত যুক্তরাজ্য স্বাধীন চারটি রাজ্যের সমন্বয়ে গঠিত। ইংল্যান্ড, ওয়েলস, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড। তন্মধ্যে ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের পতাকা নিয়ে নকশা করা হয়েছে ইউনিয়ন জ্যাক। পতাকাটির লম্বালম্বি ক্রুশচিহ্ন ইংল্যান্ডের, আড়াআড়ি ক্রুশচিহ্ন আয়ারল্যান্ডের এবং সাদা অংশ ও নীল ব্যাকগ্রাউন্ড স্কটল্যান্ডের পতাকা থেকে নেয়া। যুক্তরাজ্য ছাড়াও পূর্বে ব্রিটিশ উপনিবেশভুক্ত কয়েকটি দেশ এখনও তাদের পতাকায় ইউনিয়ন জ্যাক ব্যবহার করে। দেশগুলো হচ্ছে ফিজি, টুভ্যালু, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া।
⚾ পতাকায় ধর্মীয় প্রতীক
পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ দেশের পতাকায় কোন না কোনো ধর্মীয় প্রতীক রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ খ্রিস্টধর্মের প্রতীক আছে ৩ টি দেশে। ২১টি দেশের পতাকায় ব্যবহার করা হয়েছে ইসলাম ধর্মীয় প্রতীক। একমাত্র ইহুদি দেশ ইসরায়েলের পতাকা পুরোপুরি ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নকশা করা। পতাকার জন্মকথা শুধু ঐক্য নয় বরং ধর্মীয় বিশ্বাসও উপস্থাপন করা হয়।
কম্বোডিয়া, নেপাল ও ভারতের পতাকায় একইসাথে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক রয়েছে। এককভাবে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক রয়েছে ভূটান ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় পতাকায়।
জাপানের জাতীয় পতাকার উদীয়মান সূর্য জাপানি সাম্রাজ্যের শিনতো ধর্মের প্রতীক। ইনকা সভ্যতার সূর্যদেবী ইনতির (Inti) প্রতিচ্ছবি রয়েছে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার পতাকায়। অ্যাজটেক দেবতা Huitzilopochti কে চিত্রিত করা হয়েছে মেক্সিকোর পতাকায়। কিংবদন্তি অনুসারে, দেবতা অ্যাজটেকদেরকে শহর নির্মাণের স্থান নির্বাচনের জন্য একটি চিহ্ন বাতলিয়ে দেন। ঠোটে সাপ বহনকারী ঈগল ক্যাকটাসের উপর বসা অবস্থায় যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই নির্মাণ করা হবে শহর। এই ঈগলই মেক্সিকোর পতাকায় দেবতারূপে এসেছে।

তারকাখচিত পতাকা

বিশ্বের পতাকাগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে তারকার ব্যবহার। বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে তাদের পতাকায় এ প্রতীকটি ব্যবহার করেছে। এ সম্পর্কে কিছুটা আলোচনা না করলে পতাকা সম্বন্ধে এ প্রবন্ধটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
  • ১. যুক্তরাষ্ট্রের পতাকায় অঅঙ্গরাজ্যের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে ৫০টি তারকা সংযোজিত হয়েছে। বুরুন্ডি, কসোভা, ফিলিপাইন, ভেনিজুয়েলাসহ অনেক দেশের পতাকায় তারকা দ্বারা বিভিন্ন প্রদেশ বা অঞ্চল বুঝানো হয়েছে।
  • ২. মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ১৪টি দেশ ধর্মীয় প্রতীক হিসেবে চাঁদতারা ব্যবহার করেছে। সিঙ্গাপুর একমাত্র দেশ, যা মুসলিম অধ্যুষিত না হওয়া সত্ত্বেও পতাকায় চাঁঁদতারা রয়ে
  • ৩. অস্ট্রেলিয়ার  পতাকায় তারকার সংযোজন জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত। পতাকার চারটি তারকাকে বলা হয় Southern Cross যা শুধুমাত্র দক্ষিণ গোলার্ধ থেকেই দেখা যায়। ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, সামোয়া ও পাপুয়ানিউগিনির পতাকায়ও রয়েছে এ তারকাপুঞ্জের ব্যবহার।
  • ৪. নাউরু ও পানামার পতাকায় তারকা দ্বারা বিশ্ব মানচিত্রে দেশদুটোর অবস্থান দেখানো হয়েছে।
  • ৫. তারকার ব্যবহারের দিক দিয়ে হন্ডুরাসের পতাকার জন্মকথা যেন একটু ব্যতিক্রম। কারণে  তাদের পতাকায় পাঁচটি তারকা দ্বারা কোনো প্রদেশ নয়, পাঁচটি দেশ বুঝানো হয়েছে। দেশগুলো হলো কোস্টারিকা, গুয়াতেমালা, এল সালভাদর, নিকারাগুয়া ও স্বয়ং হন্ডুরাস। ১৮২১ সাল থেকে ১৮৩৯ সাল পর্যন্ত দেশগুলো একতাবদ্ধ ছিল। তারকার উপস্থিতি দ্বারা পুনরায় একতাবদ্ধ হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে।
এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ১০ টি দেশ সম্পর্কে জানতে পড়ুন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here