মহাকাশযান ও রকেট বিজ্ঞানকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া ফ্যালকন-৯ ও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১

  

পৃথিবীকে পাড়ি দিয়ে মহাশূন্যে উড়াল দেওয়ার বাহন হলো রকেট। এই রকেট যখন মহাশূন্যে যায় তখন তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না। যখন হলিউডের মুভি দেখি তখন দেখা যায় যে, পৃথিবী পাড়ি দেওয়ার সময় ও পৃথিবীর বাহিরে যেয়ে রকেটের বিভিন্ন অংশ মহাশূন্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। আবার রকেট যখন পৃথিবীতে ফিরে আসে তখন তার কিছুই থাকে না। এছাড়া মহাশুন্যে পাড়ি দেয়া বিজ্ঞানীরা পৃথিবীতে ফেরার সময় মহাকাশযানের অবশিষ্টাংশ নিয়ে মহাসাগরে গিয়ে পড়ছে যা দেখতে বেলুনের মত একটি অংশ। যার মানে ঐ মহাকাশযানের সকল অংশের ভিতর বেলুন ছাড়া আর কিছুই নেই। তাই যখন আবার মহাকাশে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে তখন আবার নতুন আরেকটি রকেটের দরকার পড়ে। তারমানে প্রতিটি মিশনের জন্য একটি করে রকেট প্রয়োজন পড়ছে। যার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা খরছ হচ্ছে এই রকেটের পেছনে। একটি রকেট যখন একবারের বেশি ব্যবহার করার উপায় তৈরি হলো, তখন এই আবিষ্কার রকেট বিজ্ঞানকে পুরো বদলে ফেললো। তাই চলুন জেনে নেই রকেটযানের সেই নতুন আবিষ্কার।

ফ্যালকন-৯ ফিরে এসেছে পৃথিবীতে আবার
রকেটের সৃষ্টিলগ্ন থেকে আমরা জেনে আসছি একটি রকেটকে একবার ব্যবহার করা যায়। ব্যবহৃত রকেটের কোন অংশ আর পৃথিবীতে আনা যায়না। তাকে মহাশূন্যে ফেলে দিতে হয়। এই কঠিন সত্যকে এখন আর মানতে হবে না। সেই ধারনা পাল্টে দিল মহাকাশযান তৈরি সংস্থা ‘স্পেসএক্স’। ফ্যালকন-৯ রকেটকে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে মহাকাশে পাঠানো হয়। এই স্পেসএক্স প্রথমবারের মত ‘ফ্যালকন-৯’ রকেটকে প্রথম পর্যায়ে মহাকাশে পাঠায় এবং তাকে পৃথিবীতে সফল ভাবে ফিরিয়ে এনে ইতিহাস সৃষ্টি করে। এই ফিরিয়ে আনা ফ্যালকন-৯ রকেটকে আবার দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যবহার করে এর মাধ্যমে একটি কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয় ২০১৭ সালের ৩১শে মার্চ। স্পেসএক্স ২০১৫ সাল থেকে আটটি রকেট মহাকাশে উৎক্ষেপনের পর তাদেরকে পৃথিবীতে সফল ভাবে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ফ্যালকন-৯ হলো পৃথিবীতে ফিরে আসা কোনো দ্বিতীয় রকেট। স্পেসএক্স তাদের প্রথম রকেট কে দ্বিতীয় বারের মত মহাকাশে পাঠায়নি। বরং সেটা কে তারা ক্যালিফোর্নিয়ার স্পেসএক্স এর হেড কোয়ার্টারে প্রদর্শনীর জন্য রেখেছে। তাই তারা ফিরিয়ে আনা দ্বিতীয় মহাকাশযানটিকে দ্বিতীয় বার ব্যবহার করে মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাঠায়। তাই ‘ফ্যালকন-৯’ রকেট ইতিহাসে একটি অংশ হয়ে থাকবে যাকে কিনা দ্বিতীয়বার পাঠানো হয় মহাকাশে।

৩১শে মার্চ ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল এরোস্পেস স্টেশন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় ফ্যালকন-৯। নয় মিনিট পর ফ্যালকন-৯ এর প্রথম অংশটিকে আটলান্টিক মহাসাগরে স্পেসএক্স এর ভাসমান প্লান্টের উপর সফলভাবে অবতরণ করাতে সক্ষম হয়। উৎক্ষেপনের ২ মিনিট পর ফ্যালকন-৯ এর প্রথম ও ২য় অংশ আলাদা হয়ে যায়। ২য় অংশটি উপগ্রহটিকে বহন করে পৃথিবী থেকে ২২ হাজার মাইল উপরের কক্ষপথে নিয়ে যায়। এই উপগ্রহটিকে পাঠানো হয় ল্যাটিন অ্যামেরিকা বা দক্ষিণ আমেরিকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করার জন্য। রকেটকে পুনায় ফিরিয়ে এনে আবার তাকে দ্বিতীয় বারের মত মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাঠানো স্পেসএক্সের ক্ষেত্রে যেমন এটা বিশাল অর্জন তেমনি পুরো মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে একটি মাইল ফলক অর্জন এবং রেকর্ডও বটে। কিছু অর্জন যেমন মানুষ ভুলে না তেমনি স্পেসএক্সের এই অর্জন মানুষ কখন ভুলবেনা। মানুষ ভুলবে না বললে আসলে ভুল হবে। যারা মহাকাশ নিয়ে একটু আধটু জানে বা কাজ করে, তারা কখনও ভুলবে না। একটি রকেটকে মহাকাশে পাঠিয়ে আবার তাকে ফিরিয়ে আনা এই আবিষ্কার পুরো মহাকাশের ইতিহাসকে পাল্টিয়ে দিয়েছে।

ফ্যালকন-৯ এর ডিজাইন
ফ্যালকন ৯ একটি দুই ধাপের রকেট। অ্যালুমিনিয়াম-লিথিয়ামের বিশেষ যৌগ দিয়ে তৈরি এর ইঞ্জিনগুলো দু’টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। ফ্যালকন নাইন প্রথম স্টেজে রয়েছে নয়টি ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিনগুলোর বার্ন টাইম ১৬২ সেকেন্ড। দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে একটি ইঞ্জিন এবং এর বার্ন টাইম ৩৯৭ সেকেন্ড। ফ্যালকন-৯ উৎক্ষেপনের ২ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড পর রকেটের প্রথম স্টেজের ইঞ্জিনগুলো মূল বডি থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং দ্বিতীয় স্টেজের ইঞ্জিন জ্বলতে শুরু করে। সেই সাথে পৃথিবীতে ফেরত আসার জন্য রওনা দেয় এর প্রথম স্টেজ। আটলান্টিক মহাসাগরে ভাসমান প্লান্টের উপর প্রথম অংশটি ভার্টিক্যাল ল্যান্ড করে উৎক্ষেপণের মাত্র ৯ মিনিটের মাথায়। স্পেসএক্স জানায়, ফ্যালকন-৯ এর এই অংশটা ব্যবহার করা যায় ১০ বারের বেশি।

এতোক্ষণ তো আমরা ফ্যালকন-৯ সম্পর্কে জানলাম। এবার এই ফ্যালকন-৯ সম্পর্কে আরও কিছু জেনে নিই, যা আমাদের দেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আপনি কি জানেন যে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে যায় ফ্যালকন-৯ ব্লক-৫?
ইতিহাস সৃষ্টি কারি এই ফ্যালকন-৯ রকেটটির উৎক্ষেপণের পর ভূ-পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৩৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ডের মধ্যে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যায়। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের জন্য ফ্যালকন-৯ ব্লক-৫ রকেটের মাধ্যমে ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ কে কক্ষপথে নিয়ে যায়। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ মহাকাশের কে ১১৯.১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে নিজস্ব অরবিটাল স্লটে বা কক্ষপথে পৌঁছে দিতে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার পারি দেয় এই ফ্যালকন-৯।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

উৎক্ষেপন খরচ
একটি ফ্যালকন-৯ উৎক্ষেপনের জন্য খরচ পড়ে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। এখনকার বাজারে ১ ডলার এর মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৩ থেকে ৮৪ টাকা। তাহলে এবার এটা টাকার অংকে কত হয়, সেটা হিসাব করে ফেলুন। এর দ্বিতীয় অংশ দ্বিতীয়বার ব্যবহার করার কারণে খরচ কমে এসেছে ৩০%। বার বার ব্যবহার করার কারণে এই খরচ আরও অনেক কমে যাবে বলে মন্তব্য করেছে স্পেসএক্স। এই খরচ কমিয়ে আনাটা মহাকাশ গবেষনার জন্য বিশাল সুসংবাদ। একটি রকেটকে ২য় বার উৎক্ষেপনের জন্য ঠিক করতে সময় লেগেছে ৪ মাস। স্পেসএক্স এর প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্ক জানান, ‘আমাদের এখন টার্গেট হল একটি রকেটকে ফিরিয়ে আনার পর তাকে আবার ২৪ ঘন্টার ভিতর মহাকাশে পাঠানো’। এই কাজটি যদি স্পেসএক্স করতে পারে তাহলে তা হবে মহাকাশ গবেষণারর ক্ষেত্রে আরেক মাইল ফলক অর্জন।

Image: spaceflightinsider.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here