বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাধা সমূহ

বাংলাদেশ দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরে এদেশের অর্থনীতির  যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং মন্দা অবস্থা দেখা দিয়েছিল, সে অবস্থা অতিক্রম করে উন্নত দেশের কাতারে নাম লেখানো সত্যিই অনেক কঠিন কাজ। বিভিন্ন প্রকার সমস্যায় জর্জরিত এদেশের অর্থনীতি। যারফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে  বাংলাদেশ অগ্রসর হতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের পথে বিভিন্ন বিষয়ের উপস্থিতি বাঁধা বিপত্তি সৃষ্টি করছে। এসব বিষয়ের কারণেই সরকারের গৃহীত উন্নয়নমূলক পদক্ষেপসমূহ ব্যহত হচ্ছে ও পরিকল্পনাসমূহ ভেস্তে যাচ্ছে। আর এর ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারন জনগন। তাদের জীবনযাত্রার মান দিনদিন ব্যহত হচ্ছে। তারা উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং সর্বশেষ ফলস্বরূপ, এদেশ তার কাঙ্খিত উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

আজকে আমরা মূলত সেসব কারণ নিয়ে আলোচনা করবো যেগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের পথে বাধাস্বরূপ বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এইসব কারণ সমূহ দেশের অর্থনীতিকে অনগ্রসর করে দেওয়ার সাথে সাথে দেশের সার্বিক অবস্থার উপর খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এসব কারণ সমূহের মধ্যে মুখ্য কারণগুলো আজকে আমরা আলোচনা করছি।

১. দরিদ্রতা: বাংলাদেশের অর্থনীতির অনুন্নত হওয়ার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে দরিদ্রতা। বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে অধিকাংশই দরিদ্র এবং দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। তাদের পক্ষে প্রতিদিনকার খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করাটাই অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। সেক্ষেত্রে তাদের পক্ষে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারা আকাশকুসুম চিন্তা ছাড়া আর কিছুই না।

২০১০ সালের জরিপ অনুসারে, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৫ শতাংশ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে সংগঠিত জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে আনুমানিক ১৫.৭৯ কোটি মানুষ বসবাস করে এবং এর মধ্যে ৩১.৫% জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে।

কাগজে কলমে, বিভিন্ন জরিপে, দারিদ্র্যের হার কমে আসলেও প্রকৃতপক্ষে এ সমস্যা দিনের পর দিন আরো প্রকট হয়ে উঠছে।

২. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: বাংলাদেশের অর্থনীতির উন্নয়নের অন্তরায় একটি মুখ্য কারণ হচ্ছে এদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল অবস্থা। এদেশের রাজনীতিতে সবসময় উত্থান পতন চলে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও পোড়াও, ভাঙচুর ইত্যাদি এদেশের রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করেছে এবং অর্থনীতির চাকাকে অচল করে দিয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এদেশের ব্যবসায় বানিজ্য সর্বদাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। যারফলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়েছে এবং এদেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে গেছে। এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

৩. ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা: অতিরিক্ত জনসংখ্যা বর্তমানে এদেশের জন্য অভিশাপ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধির ফলে দেশের সীমিত সম্পদের দ্বারা তাদের অসীম অভাব পূরণ করা অসম্ভবপ্রায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যার ভরন পোষণের যে পরিমান অর্থ এবং সম্পদের ব্যয় হচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে এবং এর উন্নয়নকে এক অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিচ্ছে।

অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে এদেশের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বিভিন্নভাবে ব্যহত হচ্ছে এবং তা দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজব্যবস্থা সবকিছুতেই মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। যারফলে এই বিপুল জনসংখ্যার জীবনযাত্রার মান ব্যহত হওয়ার সাথেসাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ব্যাঘাত ঘটছে।

৪. অদক্ষ মানবসম্পদ: বাংলাদেশের জনসংখ্যা এদেশের উপর বোঝা স্বরূপ। আর এর কারণ হচ্ছে, এদেশের মানুষের অদক্ষতা। জনগনকে মানবসম্পদে রুপান্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ যেমনঃ চীন তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন করতে পেরেছে। অন্যদিকে এই দক্ষতার অভাবেই এদেশের জনগন তাদের মেধা ও শক্তি অপচয় করছে এবং দেশের উন্নয়নের পথে বাঁধা হিসেবে কাজ করছে।

অদক্ষতার কারণে আমরা আমাদের পূর্ণ শক্তি, সামর্থ্য, সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে সক্ষম হতে পারছি না। যদি এদেশের জনগন দক্ষ হতো তবে, বাংলাদেশের পক্ষেও এর অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক সম্প্রসারণ করা সম্ভব হতো। কিন্তু, এই অদক্ষতার কারণে এখন এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

৫. বেকারত্ব: অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে আরেকটি অন্যতম বাঁধা হচ্ছে বেকার সমস্যা। বাংলাদেশে বেকার সমস্যা খুবই প্রকট। এদেশে কর্মসংস্থানের এতটাই অভাব যে লাখ লাখ তরুণ সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করার পরেও কোনো কাজ খুঁজে পায় না। এই বেকার সমস্যা শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত উভয় সমাজের জন্যই ভয়ংকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেকারত্বের সমস্যার কারণে এদেশের জনগন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোনো প্রকার অবদান রাখতে পারছে না। যারফলে তারা অনুৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি করছে। যার ফলাফলস্বরূপ দেশের মধ্যে অনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর হয়ে যাচ্ছে।

৬. আইনশৃঙ্খলার অনিয়ম: অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অনুকুলে থাকা অত্যন্ত জরুরী। কিন্তু বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা সত্যিই অনেক বিপর্যস্থ। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যাকান্ড, টেন্ডারবাজি, ঘুষ, অপহরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ইত্যাদি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাহত করে এবং জনজীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এমন বিপর্যস্থ অবস্থায় কোনোভাবেই অর্থনীতির উন্নয়ন সম্ভব না।

৭. দুর্নীতি: দুর্নীতি হচ্ছে এমন একটি সামাজিক সমস্যা যা ক্যান্সাসের মত আজকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থার রন্ধ্রেরন্ধ্রে প্রবেশ করে সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতার অনুপস্থিতিতে দুর্নীতি বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম বাঁধা হচ্ছে দুর্নীতি

একটি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নির্ভর করে সে দেশের স্বচ্ছ প্রশাসন ব্যবস্থার উপর। তাই, স্বচ্ছ জবাবদিহিতামূলক এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ব্যবস্থার উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতি দুর্নীতির করাল গ্রাসের শিকার হয় উঠছে। লাগামহীনভাবে এই সামাজিক অনাচারের চর্চা হচ্ছে।

দুর্নীতির কারণে দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে না। যারফলে, দেশের চালালোন ব্যয়ভার ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এছাড়া এই কারণে বিনিয়োগের ব্যাপারে শিথিলতা দেখা দিচ্ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অর্থায়ন করতে বিদেশী উদ্যোক্তারা অনিচ্ছা পোষণ করছে। এসব কারণে সার্বিকভাবে দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন করা সম্ভবপর হচ্ছে না।

৮. অনুন্নত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা: বাংলাদেশের অবকাঠামোগত অবস্থা  এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা অনুন্নত। শিল্পায়ন বা উন্নত প্রযুক্তির ব্যবস্থা করার জন্য যে ধরনের অবকাঠামো দরকার, তা এ দেশে অপ্রতুল। তাছাড়া এই বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতার জন্য যেধরনের সুযোগ সুবিধা দরকার তা এ দেশে কম রয়েছে।

একটি দেশ যত সম্পদশালী বা উৎপাদন ক্ষমতার অধিকারী হোক না কেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া কখনই উন্নতি করতে পারে না। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্থানেই যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত।  যারফলে, কিছু কেন্দ্রগত স্থান ছাড়া বাকি সকল স্থানে শিল্পায়ন বা অবকাঠামোগত প্রকল্প গড়ে তোলা হয় নি। তাই, সব জায়গায় সমানভাবে আর্থিক উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা নেয়াও সম্ভব হয়নি।

. কৃষি ও শিল্পখাতে বিনিয়োগের অনুপস্থিতি: বাংলাদেশ অর্থনীতি কৃষির উপর নির্ভরশীল। এদেশের প্রায় ৮০% জনগন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু কৃষিখাতে যথাযথ বিনিয়োগের অভাব, কৃষি জমি ধ্বংস, কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের অভাব ইত্যাদির কারণে এদেশের কৃষিখাতের আয় ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে শিল্পখাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে দেশের পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে হচ্ছে না। একারণে বেকার সমস্যা সমাধান হচ্ছে না, দেশে নতুন আয়ের খাত কম সৃষ্টি হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন কম হচ্ছে।

এছাড়াও, আমদানি রপ্তানির অসামঞ্জস্য অনুপাত, স্বল্প মাথাপিছু আয়, সঞ্চয়ের অভাব, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদির কারণ সমূহ অর্থনীতির সমৃদ্ধি অন্তরায় থাকতে পারে। এসব সমস্যার সমাধান না করতে পারলে বাংলাদেশ কখনই কাঙ্খিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here