বাংলাদেশের সবচেয়ে বিষাক্ত ৫টি সাপ


প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি সরীসৃপ প্রানী। সরীসৃপ জাতির মধ্যে সাপ যেনো আরো কৌতুহলের জিনিস। সেই প্রাচীন বেহুলা লখীন্দরের কাহিনী কিংবা সাপ খেলা। বাংলার লোকমুখে আজীবন প্রচলিত থাকবে। সরীসৃপ কূলের মধ্যে সাপকে বোধহয় মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। সাপ দেখলেই মানুষের ধারণা এটি বিষধর এবং কামড়ালেই মৃত্যু হবে। তবে সবচেয়ে তাজ্জব বিষয়কি বাংলাদেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ পাওয়া যায় এর মধ্যে ৮০ টাই নির্বিষ। এর মধ্যে স্থলে বাস করে ৭/৮ টা বাকীগুলো সমুদ্রে। সবচেয়ে বেশি মিথ রয়েছে দাড়াশ,জলঢোড়া এবং ঘরগিন্নী নিয়ে। এই সাপগুলো বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এগুলোর সবগুলোই নির্বিষ। তবে বিষধর সাপ যে বাংলাদেশে একেবারেই নেই তেমন নয়। এখানে যেমন নির্বিষ দাড়াশ কিংবা ঘরগিন্নি সাপ দেখা যায় তেমনি দেখা যায় গোখরা কিংবা চন্দ্রবোড়ার মত ভয়াবহ বিষধর সাপ। আজ আমরা এমনি ৫ টি বিষধর সাপ সম্পর্কে জানব যা আমাদের দেশে রয়েছে এবং এদের ছোবলে আমাদের মৃত্যও হতে পারে।


১. শঙ্খচূড়ঃ সব প্রানীরই একজন রাজা বা প্রধান থাকে। শঙ্খচূড় কে বলা হয় সাপেদের রাজা। শঙ্খচূড় নাম অনেকের কাছে পরিচিত না হলেও কিং কোবরা কিংবা রাজ গোখরা নামটি অপরিচিত হওয়ার কথা নয়। জি!হ্যা এইটাই কিং কোবরা। ভারতবর্ষে ১৮ ফুট লম্বা কিং কোবরাও পাওয়া গেছে। কিং কোবরার একটি সাধারণ দংশন একজন সাধারণ মানুষকে মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ঠ। এই সাপের বিষ নিউরোটক্সিন এবং দংশিত প্রানীর স্নায়ুতন্ত্র আক্রমণ করে। এর দংশনে মৃত্যুর হার শতকরা ৭৫%। ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং পূর্বাংশে এবং বাংলাদেশের সুন্দরবন এবং পার্বত্য অঞ্চলের গহীন বনে কিংকোবরা দেখা যায়। কিং কোবরা ছোট ছোট অজগর,ইঁদুর এবং অন্যান্য সাপ খেয়ে বেচে থাকে।


২. শঙ্খীনিঃ বিষের ভয়াবহতার দিক দিয়ে কিং কোবরার পরেই আসবে শঙ্খীনি সাপের নাম। কালো এবং হলুদ ছোপ ছোপ দাগের সাপটিকে বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই দেখতে পাওয়া যায়। ছোপ ছোপ দাগ হওয়ায় একে অনেকে ডোরা কাল কেউটে বলে ডাকে। এদের নিউরোটক্সিন বিষ মানুষের মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট হলেও এর কামড়ে বাংলাদেশে মৃত্যুর কেস নেই।মানুষ দেখলে সাপটি পালিয়ে যায় এবং ভীতু প্রকৃতির সাপ।এই সাপের উপকারীতা নেহায়েত কম নয়। মানুষের জন্য মারাত্মক চন্দ্রবোড়া এবং কালাচ এদের প্রধান খাদ্য। চন্দ্রবোড়া এবং কালাচ সাপকে খেয়ে এটি যেমন আমাদের ওইসব সাপ থেকে বাচায় তেমনি আবার ইঁদুর খেয়ে ধান নষ্ট হওয়ার হাত থেকেও রক্ষা করে।


৩. গোখড়াঃ উপরের দুটি সাপ নিয়ে বাংলাদেশ খুব সমস্যা হয়না। কারণ কিং কোবরা গহীন বনে বাস করে এবং শঙ্খচূড় ভীতু প্রকৃতির সাপ। বাংলাদেশের সাপের কামড়ে প্রতিবছর যত মানুষ মারা যায় তার মধ্যে বেশ বড় অংশ মারা যায় গোখরার কামড়ে। এর ইংরেজী নাম মনোকল্ড কোবরা এবং বৈজ্ঞানিক নাম কোবরা নাজা নাজা। এই সাপ ফণা তুলতে পারে এবং ফনায় একধরণের বিশেষ চিহ্ন পাওয়া যায়। এই সাপ নিয়ে বিভিন্ন মিথ রয়েছে যে এর মণি রয়েছে এবং সেই মণি কেউ পেলে সে সাত রাজার চেয়েও বেশি ধনী হয়ে যায়। আদতে এ ধরণের কথার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এরা নিশাচর। মানুষের বসতবাড়ির আশেপাশে, চাষের জমি, বনাঞ্চল বা ধানক্ষেতের আশেপাশের ইদুরের গর্তে থাকতে ভালবাসে। কিন্তু যদি তার কাছে কাউকে প্রাণ সংশয়কারী মনে হয় তাহলে ফণা তুলে জোরে হিস হিস শব্দ করে। আত্মরক্ষার্থে কামড়ও দিতে পারে। এই সাপের প্রধান খাবার ইদুর। ইদুর খেয়ে প্রতিবছর এরা বেশ ভালোপরিমানে ধান নষ্ট হওয়া থেকে বাচায়।


৪. কালাচঃ বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় কালাচ সাপের কামড়ে। এরা নিশাচর প্রানী এবং মানুষের কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। এরা প্রায়ই মানুষের বিছানায় উঠে আসে। এবং ঘুমের ঘোরে এদের গায়ে পা লাগলেই ছোবল মারে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো এ সাপ কামড় দিলে দাগ খুব স্পষ্ট হয়না। ফলে উপসর্গ দেখার আগে বোঝা যায়না কামড়েছে কিনা। যদি কারো ঘুম থেকে উঠার পর আবার প্রচুর ঘুম পায় এবং চোখ লাল হয়ে যায় তবে তাকে অতিসত্বর ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। কালাচের কামড়ের এটা সর্বজনসীকৃত উপস্বর্গ। এদের বিষের নাম নিউরোটক্সিন এবং এদের দেহ কালোর মাঝে হালকা সাদা ছোপ ছোপ দাগ থাকে। এরাও ইদুরখেকো প্রাণী। যদি আমরা ব্যাপকা হারে কালাচ নিধন শুরু করি তবে ইদুরের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাবে।

কালাচ সাপ। Image: aajkaal.in


৫. রাসেল ভাইপারঃ রাসেল ভাইপার বাংলাদেশে চন্দ্রবোড়া নামে পরিচিত। এই সাপ পৃথিবীর সবচেয়ে আক্রমনাত্মক সাপের মধ্যে একটি। সাপের ধর্ম যেখানে মানুষ দেখলে পালিয়ে যাওয়া সেখানে রাসেল ভাইপার কারণ ছাড়াই মানুষকে আক্রমণ করে বসে।চন্দ্রবোড়ার দেহ মোটাসোটা, লেজ ছোট ও সরু। প্রাপ্তবয়স্ক সাপের দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত এক মিটার।দেহের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ১.৮ মিটার পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এ সাপের বিষের নাম হোমোটক্সিন এবং রাসেল ভাইপারের কামড়ে রক্তজমাট বেধে যায় এবং বেশ দীর্ঘ যন্ত্রনায় আক্রান্তের মৃত্যু হয়। দংশিত স্থান পচেও যেতে পারে। চন্দ্রবোড়া নিচু জমির ঘাসযুক্ত উন্মুক্ত পরিবেশে এবং কিছুটা শুষ্ক পরিবেশে বাস করে। এরা নিশাচর, এরা খাদ্য হিসেবে ইঁদুর, ছোট পাখি, টিকটিকি ও ব্যাঙ ভক্ষণ করে। একটি স্ত্রী সাপ গর্ভধারণ শেষে ২০ থেকে ৪০টি বাচ্চা দেয়। তবে কোনো কোনো চন্দ্রবোড়া সাপের ৭৫টি পর্যন্ত বাচ্চা দেয়ার রেকর্ড আছে। লুপাস অ্যান্টিকোয়াগুল্যান্ট নামে গর্ভপাতকারী এক রোগ নির্ধারণের পরীক্ষায় (ডাইলিউট রাসেল ভাইপার ভেনম টাইম টেস্ট) চন্দ্রবোড়ার বিষ ব্যবহৃত হয়।


সাপ যতই বিষাক্ত হোক না কেন এদের উপকারের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এদের বিষ থেকে যেমন তৈরি হয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তেমনি এরা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ মেরে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষা করে। অতয়ব অবশ্যই আমাদের সাপ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

Feature Image: priyo.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here