বাংলাদেশ সরকারের আয় ও ব্যয়ের বিভিন্ন খাতসমূহ

আমরা সাধারন জনগণেরা কি কখনো ভাবি যে, আমাদের দেশ পরিচালনার জন্য বা এর উন্নয়নের জন্য যেসব অর্থসম্পদ দরকার তার উৎস কী? সরকারের একার পক্ষে এত বেশি পরিমাণ অর্থ এককভাবে ব্যবস্থা করা অসম্ভব। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা এবং বাস্তবায়ন করার জন্য যে অর্থায়নের প্রয়োজন তার ব্যবস্থা কীভাবে করা হয়? অথবা সরকারি সঞ্চয় এবং অর্থসম্পদ সরকার কীভাবে এবং কোথায় ব্যয় করে তা কি আমরা জানি?

একটি দেশ পরিচালনার জন্য সে দেশের সরকার যেসব অর্থসম্বন্ধীয় ব্যবস্থা এবং নিয়ম নীতি গ্রহণ করে তাকে সরকারের অর্থব্যবস্থা বলে। এই সরকারি অর্থব্যবস্থার প্রধান ভূমিকা হচ্ছে সরকারের আয় ব্যয় সংক্রান্ত সকল প্রকার বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করা।

আজকে আমরা মূলত আলোচনা করতে যাচ্ছি, বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন প্রকারের আয় এবং ব্যয়ের খাতসমূহ নিয়ে।

বাংলাদেশ সরকারের আয় এবং ব্যয়

বাংলাদেশ সরকারের আয় এবং ব্যয়ের বিভিন্ন খাত রয়েছে। আয়ের খাতসমূহ থেকে সংগৃহীত অর্থসম্পদই ব্যয়ের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা হয় দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য, জনগনের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য, প্রশাসনিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য, আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে সমতা অর্জনের জন্য ইত্যাদি। তাই, এই আয় এবং ব্যয় খাতসমূহ সম্পর্কে আমাদের বিশদভাবে ধারণা রাখা উচিত।

সরকারের আয়ের বিভিন্ন খাতসমূহ

সরকার প্রধানত কর ও কর বহির্ভূত খাতসমূহ থেকে আয়ের ব্যবস্থা সৃষ্টি করে। এসবের মধ্যে রয়েছে:

১. আয়কর: আয়কর বাংলাদেশে সরকারের আয়ের একটি অন্যতম উৎস। একজন ব্যক্তির সর্বমোট আয়ের উপর সাধারণত আয়কর ধার্য করা হয়।  র্অথ আইন ২০১৫ এর আওতায়,

(১) মহিলা এবং ৬৫ বৎসর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতা ব্যক্তির ক্ষেত্রে আয় যদি ৩,০০,০০০ টাকা এর উপরে হয় তবে তিনি আয়কর প্রদানের উপযুক্ত হবনে।

(২) প্রতিবনন্ধী করদাতার ক্ষেত্রে আয় ৩,৭৫,০০০ টাকা এর উপরে হলে তিনি আয়কর প্রদানের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হবেন হবেন।

(৩) গেজেট ভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার ক্ষেত্রে আয় যদি ৪,২৫,০০০ টাকা এর উপরে হয় তবে তিনি আয়কর প্রদানের জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হবেন।

২. মূল্য সংযোজন কর: মূল্য সংযোজন কর একটি পরোক্ষ ধরনের কর যা একটি দেশে উৎপাদিত ভোগ সামগ্রীর উপর উৎপাদন থেকে ভোগ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সংযোজিত মূল্যের উপর ভিত্তি করে ধার্য করা হয়। মূল্য সংযোজন করকে ভ্যাট ও বলা হয়। বাংলাদেশে এই ভ্যাটের হার ১৫%।

. ভূমি রাজস্ব: ভূমি রাজস্ব সরকারের আয়ের একটি অতি প্রাচীন উৎস। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ভূমি রাজস্ব ২৫ বিঘা জমির চেয়ে অধিক জমি থাকলে তখন ধার্য করা হয়। তাই, এই খাতে আয়ের পরিমাণ অন্যান্য খাত থেকে অনেকাংশেই কম।

৪. আবগারি শুল্ক: আবগারি শুল্কও সরকারের আয়ের একটি উৎস। সরকার, বিভিন্ন ধরনের পণ্যসামগ্রী যেমন চা, চিনি, তামাক, কেরোসিন, সিগারেট, দিয়াশলাই, প্রসাধনী সামগ্রী, ঔষুধ ইত্যাদি উপর আবগারি শুল্ক ধার্য করে।

৫. বাণিজ্যিক শুল্ক: বাণিজ্য শুল্ক সরকারের আয়ের একটি প্রধান উৎস। বিভিন্ন প্রকার বাণিজ্যিক কার্যক্রম সংগঠিত করার জন্য ব্যবসায়ীদের যে শুল্ক প্রদান করতে হয় সেটাই হচ্ছে বাণিজ্যিক শুল্ক। উদহারনস্বরূপ আমরা বলতে পারি, আমদানি রপ্তানি ব্যবসায়ে যেসব শুল্ক ধার্য করা হয় তাদের কথা।

৬. রেজিস্ট্রেশন এবং স্ট্যাম্প: বর্তমানে  রেজিস্ট্রেশন থেকে প্রাপ্ত আয়কে সরকারি আয়ের জন্য একটি সুপরিচিত খাত হিসেবে গণ্য করা হয়। জমিজমা, যানবাহন, বাড়িঘর এবং অন্যান্য বিভিন্ন প্রকারের সম্পত্তির দলিল করতে রেজিস্ট্রেশন করার প্রয়োজন হয়। আর এরজন্য রেজিস্ট্রেশন ফি সরকারকে দিতে হয়।

অন্যদিকে বিভিন্ন দলিল, পাসর্পোট, চিঠিপত্র, মামলা মোকাদ্দমার আবেদনপত্র ইত্যাদির জন্য স্ট্যাম্পের প্রয়োজন হয়, যা বিক্রির মাধ্যমে সরকার কিছু পরিমাণ রাজস্ব আয় করে।

৭. বিনিয়োগ এবং ঋণ: সরকারের আরও একটি আয়ের উৎস হচ্ছে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ। সরকার বিভিন্ন মেয়াদে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ করে, যা থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ সরকারের আয় হিসেবে গণ্য করা যায়।

অন্যদিকে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক সংস্থাকে সুদের বিনিময়ে বিভিন্ন মেয়াদে ঋণ প্রদান করে। এই ঋণ থেকে প্রাপ্ত সুদও সরকারের আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত।

৮. সেবা প্রদান: সরকার তার জনগণকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি সেবা প্রদানের বিনিময়ে অর্থ সংগ্রহ করে। এ ক্ষেত্রেও সরকারের আয়ের সুযোগ রয়েছে।

৯. রাষ্ট্রায়ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান: বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য আর্থিক সংস্থা থেকে লভ্যাংশ সংগ্রহ সরকারের আয়ের আরেকটি উৎস।

১০. যাতায়াত: সরকারের আরেকটি আয়ের উৎস হচ্ছে, যাতায়াত থেকে সংগৃহীত আয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ বিমান, বিআরটিসি ইত্যাদি সংস্থার মাধ্যমে সরকার জনগণকে সেবা প্রদানের মাধ্যমে, রাজস্ব আয় সংগ্রহ করে।

১১. ডাক, তার ও টেলিফোন: ডাক বিভাগ সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি উৎস। তাছাড়া টেলিফোন, ফ্যাক্স ইত্যাদি সেবা প্রদানের মাধ্যমেও সরকার রাজস্ব আয় সংগ্রহ করে।

১২. সমুদ্র বন্দর থেকে আয়: সরাসরি সরকারিভাবে সবচেয়ে বেশি আয়ের উৎস হলো সমুদ্র বন্দর। বর্তমান বাংলাদেশের তিনটি সমুদ্র বন্দর থেকে সরকারের প্রচুর আয় হয়।

সমুদ্র বন্দর গুলোর মাধ্যমে সরকারের প্রচুর আয় হয়ে থাকে; image source: wikipedia

এছাড়াও সরকার বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ যেমনঃ বনজ সম্পদ, গ্যাস, কয়লা, চিনামাটি ইত্যাদি বিক্রির মাধ্যমেও রাজস্ব সংগ্রহ করে থাকে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অনুদান বা সাহায্যও সরকারের আয়ের অন্যতম আরেকটি উৎস। এছাড়াও ভ্রমণ কর, পেট্রোল ও গ্যাসের উপর কর, সেচ কর, প্রমোদ কর, সম্পত্তি কর ইত্যাদি খাতের থেকেও সরকার রাজস্ব আয় সংগ্রহ করে থাকে।

সরকারের ব্যয়ের বিভিন্ন খাতসমূহ

বিভিন্ন খাত থেকে সংগৃহীত আয়সমূহকে সরকার বিভিন্ন খাতে ব্যয় করে থাকে। এইসব ব্যয় খাতসমূহের মধ্যে রয়েছে:

১. প্রতিরক্ষা খাত: সরকারের একটি অন্যতম প্রধান ব্যয়ের খাত হচ্ছে প্রতিরক্ষা খাত। দেশ ও তার জনসংখ্যাকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে দক্ষ ও সমৃদ্ধ প্রতিরক্ষা শক্তির প্রয়োজন। এই সামরিক শক্তির পরিচালনা, প্রশিক্ষণ বাবদ ব্যয়, বেতন-ভাতা প্রদান, আধুনিক অস্ত্র সরঞ্জামাদি বাবদ সরকারের অনেক ব্যয় হয় যা অর্থায়ন সরকারের রাজস্ব আয় থেকেই করা হয়।

 ২. শিক্ষা: সরকারের ব্যয় খাতসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি খাত হচ্ছে শিক্ষা। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করার লক্ষ্যে সরকার এ খাতে প্রতি বছর ব্যাপক পরিমান অর্থ ব্যয় করে।

৩. স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা: স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসা খাত হচ্ছে আরেকটি অন্যতম ব্যয় খাত। উন্নত সেবা ব্যবস্থা এবং সাধারন জনগণকে সে সেবা প্রদানে সরকার তার রাজস্ব আয় ব্যয় করে থাকে।

৪. বেসামরিক প্রশাসনিক ব্যয়: সরকার সারাদেশ ব্যাপী বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্য ব্যাপক অর্থ ব্যয় করে। এসব ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনভাতা বাবদ ব্যয়, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সঞ্চালন বাবদ ব্যয় ইত্যাদি।

৫. পুলিশ এবং আনসার বাহিনী: দেশের আভ্যন্তরিক সুরক্ষা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সরকার পুলিশ এবং আনসার বাহিনী প্রতিষ্ঠিত করেছে। এইসব বাহিনীর বেতনভাতা, সম্মানী, পরিচালনা খরচ বাবদ সরকারকে ব্যাপক অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়।

৬. পূর্ত বিভাগ: পূর্ত বিভাগের কাজ হচ্ছে দেশে বিভিন্ন সরকারি ভবন, রাস্তাঘাট, সেতু, কার্লভাট প্রভৃতি নির্মাণ করা। এসকল কাজের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হয় যা সরকারের জন্য ব্যয়ের খাত সৃষ্টি করে।

৭. বিচার বিভাগ এবং কারা বিভাগ: দেশে আইনের সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগ রয়েছে। এই বিচার বিভাগের পরিচালনা বাবদ যে ব্যয় হয় তা সরকারকেই বহন করতে হয়। এছাড়া কারাগার ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার তার রাজস্ব ব্যয় করে থাকে।

৮. সরকারি প্রশাসনিক ব্যয়: সরকারি মালিকানাভুক্ত বিভিন্ন বিভাগ যেমন আয়কর বিভাগ, ভূমি রাজস্ব বিভাগ, টেলিভিশন ও বেতার বিভাগ ইত্যাদি পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ বাবদ বিপুল অর্থ সরকারকে ব্যয় করতে হয়।

৯. সামাজিক উন্নয়নবাবদ ব্যয়: জনগণের কল্যাণ, আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা করার জন্য সরকার বিভিন্ন পার্ক, জাদুঘর, স্টেডিয়াম, লাইব্রেরি, ক্লাব, পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে থাকে। এসবের জন্য সরকার ব্যাপক অর্থ ব্যয় করে থাকে।

১০. অপ্রত্যাশিত বা অনিশ্চিত ব্যয়: বিভিন্ন সময়ে দেশ বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমনঃ বন্যা, খরা, সাইক্লোন, ঘূর্নিঝড়, ভূমিকম্প ইত্যাদির শিকার হয়। অথবা বিভিন্ন যুদ্ধ বিগ্রহ, হরতাল, অবরোধ ইত্যাদির কারণেও দেশের জনগণকে ব্যাপক ক্ষতির স্বীকার হতে হয়। এক্ষেত্রে, সমস্যার সমাধানের জন্য সাধারণ জনগণকে  ত্রান, সাহায্য, অনুদান, ভর্তূকি ইত্যাদি প্রদান করা হয় যা সরকারের জন্য ব্যয়ের সৃষ্টি করে।

আজকের এই আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান আয় ও ব্যয় এর খাতসমূহ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে অবগত হতে পারলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here