বিচারের দিনে চার সাক্ষীঃ যে সাক্ষ্য মোকাবেলা করতে হবে সবাইকে

আমরা দুনিয়ায় যা করি সবকিছুর জন্য আল্লাহর কাছে যবাবদেহি করতে হবে। আর আমরা দুনিয়ায় কী করি বা করেছি তা রেকর্ড করার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ নিজেই সব কিছু দেখেন এবং জানেন। তাছাড়াও আল্লাহ আরও ব্যবস্থা রেখেছেন যেমন, ফেরেস্তা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, এমনকি জমিনও মানুষের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবে। এই সাক্ষী থেকে আমাদের কাজ গোপন করার কোন সুযোগ নাই। এই সাক্ষীগুলো কোরআন দ্বারা সমর্থিত।

প্রথম সাক্ষী : ফিরিশতা ও তাদের লিপিবদ্ধ আমলনামা

প্রথম সাক্ষী হল ফিরিশতা যারা আমাদের অমলনামা লিপিবদ্ধ করছেন। সকালে সন্ধ্যায়, দিনে রাতে, সদা সর্বদা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, “অবশ্যই তোমাদের জন্য কিছু তত্বাবধায়ক (ফিরিশতা) নিযুক্ত আছে। সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ। তোমরা যা কর তারা সব জানে। পূণ্যবানগণ তো থাকবে পরম স্বচ্ছনেদ্য; এবং পাপাচারীরা তো থাকবে জাহান্নামে” (সূরা ইনফিতার ১০-১৪)

আল্লাহ আরও বলেন, “তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের গোপন কথাবার্তা ও তাদের কানাকানি শুনতে পায় না? অবশ্যই শুনতে পাই। তাছাড়া আমার ফিরিশতাগণ তাদের কাছেই রয়েছে। তারা (সবকিছু) লিপিবদ্ধ করছে” (সূরা যুখরুফ ৮০)

এভাবে পাপের বোঝা ভারি হবে বা পুণ্যের। তারপর কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমার আমলনামা বের করে দিয়ে দিবেন আমার হতে। ইরশাদ হচ্ছে, ‘‘আর কিয়ামতের দিন আমি (তার আমলনামা) লিপিবদ্ধরূপে তার সামনে বের করে দেব, যা সে উন্মুক্ত পাবে” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৩)

এবং আল্লাহ আমাকেই পড়তে বলবেন আমার আমলনামা, ‘‘(বলা হবে) তুমি নিজ আমলনামা পড়। আজ তুমি নিজেই নিজের হিসাব নেয়ার জন্য যথেষ্ট’’ (সূরা বনী ইসরাঈল ১৪)

কারণ সে আমলনামা হবে এক আশ্চর্য আমলনামা। আমলের ছোট বড় কিছুই ছাড়বে না, সব যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে সেখানে। তা দেখে মানুষ সেদিন বলবে, “…এটা কেমন কিতাব (আমলনামা) তা তো ছোট বড় কিছুই বাদ দেয় না; বরং সবই পঙ্খানুপুঙ্খু হিসাব রেখেছে। তারা তাদের কৃতকর্ম সামনে উপস্থিত পাবে। তোমার প্রতিপালক কারও প্রতি যুলুম করেন না” (সূরা কাহ্ফ ৪৯)

সেদিন আমলনামা দেখে কাফের আফসোস করে বলবে- “সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম প্রত্যক্ষ করবে এবং কাফের বলবে, হায়, আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম” (সূরা নাবা ৪০)

আমলনামা হাতে পেয়ে কেউ থাকবে মহানন্দে, আবার কারো আক্ষেপের সীমা থাকবে না। ইরশাদ হচ্ছে- “অতপর যাকে আমলনামা দেওয়া হবে ডান হাতে, সে বলবে, এই যে আমার আমলনামা, তোমরা পড়ে দেখ। আমি আগেই বিশ্বাস করেছিলাম, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সে থাকবে সুখময় জীবনে। সেই সুউচ্চ জান্নাতে- যার ফল থাকবে ঝুঁকে (হাতের নাগালের মধ্যে)। (বলা হবে) তোমরা বিগত জীবনে যেসব কাজ করেছিলে, তার বিনিময়ে খাও ও পান কর স্বাচ্ছন্দ্যে”।

আর যার আমলনামা দেওয়া হবে তার বাম হাতে; তো সে বলবে, “আহা! আমাকে যদি আমলনামা দেওয়াই না হত! আর আমি জানতেই না পারতাম, আমার হিসাব কী? আহা! মৃত্যুতেই যদি আমার সব শেষ হয়ে যেত! আমার অর্থ-সম্পদ আমার কোনো কাজে আসল না! আমার থেকে আমার সব ক্ষমতাও লুপ্ত হয়ে গেল! (এরূপ ব্যক্তি সম্পর্কে হুকুম দেয়া হবে) ধর ওকে এবং ওর গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও। তারপর ওকে নিক্ষেপ কর জাহান্নামে” (সূরা আল-হাক্কাহ্ ১৯-৩১)

দ্বিতীয় সাক্ষী : অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ

দ্বিতীয় সাক্ষী হল আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যা আমাদের কাছে আল্লাহর আমানত। আল্লাহ তো দুনিয়াতে বান্দাকে সুযোগ দিয়েছেন; নিজ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইচ্ছামতো পরিচালনার স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু বিচারের দিনে এই আমানতের খেয়ানতের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “আজ আমি তাদের মুখে মোহর লাগিয়ে দিব। ফলে তাদের হাত আমার সাথে কথা বলবে এবং তাদের পা সাক্ষ্য দেবে তাদের কৃতকর্মের” [সূরা ইয়াসীন ৬৫]

শুধু কি তাই! আমার শরীরের চামড়াও সাক্ষী দিবে আমার বিরুদ্ধে, যদি আমি তা আল্লাহর নাফরমানিতে ব্যবহার করি। “অবশেষে যখন তারা জাহান্নামের কাছে পৌঁছবে, তখন তাদের কান, তাদের চোখ ও তাদের চামড়া তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে” [সূরা হা-মীম আসসাজদাহ্ ২০]

তখন মানুষ নিজের শরীরের চামড়াকে বলবে, “তারা তাদের চামড়াকে বলবে, তোমরা আমাদের বিরম্নদ্ধে সাক্ষ্য দিচ্ছ কেন?” সেগুলো উত্তর দিবে, “আল্লাহ আমাদেরকে বাকশক্তি দান করেছেন, যিনি বাকশক্তি দান করেছেন প্রতিটি জিনিসকে” [সূরা হা-মীম আসসাজদাহ্ ২১]

আল্লাহর দেয়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কি আমি আল্লাহর আনুগত্যে ব্যবহার করছি না তাঁর নাফরমানিতে। তা কি কিয়ামতের ঐ কঠিন মুহূর্তে আল্লাহর সামনে, সকল সৃষ্টিজীবের সামনে আমার পক্ষে সাক্ষী দিবে না বিপক্ষে!

তৃতীয় সাক্ষীঃ যমীন

তৃতীয় সাক্ষী হল এই যমীন। যমীনের এই সাক্ষী হওয়ার বর্ণনা আলকুরআনুল কারীমে ও হাদীস শরীফে এভাবে এসেছে। আল্লাহ বলেন, “সেদিন যমীন তার যাবতীয় সংবাদ জানিয়ে দেবে” (সূরা যিলযাল ৪)

রাসুল সাঃ বললেন, তোমরা কি জানো, ‘যমীনের সংবাদ’ কী? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তখন রাসূল সাঃ বললেন, ‘তার সংবাদ’ হল, প্রতিটি বান্দা-বান্দি যমীনে যা করেছে সে তার সাক্ষী দিবে; অমুক বান্দা অমুক অমুক কাজ করেছে, অমুক দিনে করেছে। এটাই হল, ‘তার সংবাদ’। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪২৯

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

চতুর্থ সাক্ষী : আল্লাহ

আল্লাহ্ই হলেন সবচেয়ে বড় সাক্ষী, প্রথম ও শেষ সাক্ষী। যাঁর থেকে গোপন থাকে না আসমান যমীনের কোনোকিছু। ইরশাদ হচ্ছে- “এটা কি তোমার রবের সম্পর্কে যথেষ্ট নয় যে, তিনি সর্ববিষয়ে অবহিত?” [সূরা হা-মীম আসসাজদাহ ৫৩]

তিনি আমাকে দেখছেন, আমি যে অবস্থায়ই থাকি, যেখানেই থাকি। তাঁর কাছে আসমান যমীনের কোনো কিছুই গোপন নয়।
“নিশ্চিত জেনে রাখ, আল্লাহর কাছে আসমান যমীনের কোনো কিছুই গোপন থাকে না” [সূরা আলে ইমরান ৫]

আল্লাহ বান্দাকে সতর্ক করে বলছেন-“সে কি জানে না যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন” [সূরা আলাক ১৪]

আমাদের কেউ যদি বুঝে যে, কথাও সিসি ক্যামেরা আছে বা অমুক আমার গুনাহের কথা জেনে গেছে বা আমাকে গুনাহের কাজে দেখে ফেলেছে, তাহলে ভয় আর লজ্জার শেষ থাকে না। কিন্তু আল্লাহ নিজে দেখেন, দেখার জন্য দুনিয়াতে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা রেখেছেন তাতেও আমাদের ভয় হয়না। কোরানের প্রতি বিশ্বাস থাকলে এগুলোর প্রতি ভয় থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। সুতরাং যদি স্মরণ রাখি, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, তাহলে আমাদের কোন অন্যায় কাজ করতে ভয় হবে।

মাজহারুল ইসলাম, আইনজীবী এবং কোরআন গবেষক

Mail: mazharkj528@gmail.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here