ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ – সংরক্ষিত রাসূল সঃ এর বাণী

ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ

ইসলামে আল্লাহর বাণী কুরআনের পরই হাদীসের অবস্থান। ইসলামি চিন্তাবিদগণ হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ এর উপর বেশি গুরুত্ব দেন। হাদীস হলো ইসলামি শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস। রাসুল صلى الله عليه وسلم এর ইন্তিকালের পর সাহাবায় কেরাম হাদীস সংকলনের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যার উৎকৃষ্ট আয়োজন হলো উমাইয়া খলিফা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ (র.) এর আয়োজন। তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে হাদীস সংকলনের উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় হিজরি তৃতীয় শতকে হাদীস সংকলনের স্বর্ণ যুগ সূচিত হয়।

তৃতীয় হিজরি শতকে আব্বাসীয় খলীফা মুতাওয়াক্কিলের যুগে হাদীস শাস্ত্রের উপর বিশুদ্ধ ছয়টি গ্রন্থ রচিত হয়ে মুসলিম উম্মাহর নিকট গ্রহণযোগ্যতার শীর্ষস্থান দখল করে আছে। তৎকালীন যুগ হতে অদ্যাবধি এ গ্রন্থগুলো ইলমে হাদীসের আলোক বিকিরণ করে চলছে।

ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থ হলো

  • সহীহ বুখারী
  • সহীহ মুসলিম
  • সুনানে নাসায়ী
  • জামেউত তিরমিযী
  • সুনানে আবূ দাঊদ
  • সুনানে ইবনে মাজাহ

নিম্মে الكتب الصحاح الستة এর পরিচিতি তুলে ধরা হল

সহীহ বুখারী

ইমাম বুখারী (র.) [১৯৪-২৫৬ হি.] এর অসামান্য অবদান আস সহীহ আল বুখারী। যার নাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইবরাহীম, কুনিয়াত আবূ আব্দুল্লাহ। তার উপাধি হলো আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীস ও হাফেযুল হুজ্জাত। তিনি ৬ লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে একাধিকবার উদ্ধৃত হাদীসসহ সর্বমোট হাদীস ৯০৮২ টি তন্মধ্যে মুআল্লাক, মুতাবিআত ও মাওক’ফাত বাদ দিয়ে মৌলিক ৭৩৯৭ টি আর একাধিকবার উল্লেখিত হাদীস ২৭৬১ মাতান্তরে ২৬০২ কিংবা দ্বিরুক্তি বাদ দিয়ে ৪০০০ টি হাদীসের সমন্বয়ে বুখারী শরীফ সংকলন করেন।

ইমাম বুখারী তার উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহি- এর অনুপ্রেরণায় এবং স্বপ্নযোগে আদিষ্ট হয়ে সুদীর্ঘ ষোলো বছরে এ গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তিনি হাদীস সংগ্রহের জন্য অক্লান্ত প্ররিশ্রম করে বহুদেশ ভ্রমণ করেন। তার ছয় লক্ষ হাদীস মুখস্থ ছিল। এ বিপুল হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে অত্যন্ত কঠোর নীতিমালার ভিত্তিতে তিনি জামেউস সহীহ সংকলন করেন। প্রতিটি হাদীস লিপিবদ্ধ করার আগে তিনি অজু ও গোসল করে দু’রাকাত নফল নামাজ আদায় করে ইস্তেখারা করে হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তা লিখতেন। তাই এ গ্রন্থটি বিশুদ্ধতার নিরিখে কুরআনের পর পৃথিবীর অন্যান্য সকল গ্রন্থ থেকে সর্বাধিক বিশুদ্ধ। জমহুর মুহাদ্দিসের মন্তব্য-

اصح الكتب بعد كتاب الله الصحيح للبخارى

বুখারী শরীফ একটি জামে গ্রন্থ। এ গ্রন্থটিতে سير [সিয়ার], ادب [আদাব], مناقب [মানাকিব], اشراط [আশরাত], احكام [আহকাম], فتن [ফিতান], عقائد [আকাইদ] ও تفسير [তাফসীর] এ ৮টি বিষয়ের আলোচনায় সমৃদ্ধ। এ গ্রন্থে شاذ ও معلل হাদীস অনুপস্থিত। বুখারী শরীফে ৪৫৩ জন রাবীর মাঝে সমালোচিত রাবী মাত্র ৮০ জন। যা অন্যান্য গ্রন্থের তুলনায় খুবই কম। যে রাবীর সাথে তার উস্তাদের সাক্ষাৎ হয়নি, এমন রাবীর হাদীস এ কিতাবে গৃহীত হয়নি। ইমাম বুখারী (র.) এর অক্লান্ত পরিশ্রম, অভূতপূর্ব মেধা, নিয়তের বিশুদ্ধতা, সততা ও সতর্কতা অবলম্বনের কারণেই আজ হাদীসের দলিল হিসেবে প্রথমে আমরা সহীহ বুখারীর শরণাপন্ন হই। তাই ইমাম বুখারী (র.) নিজেই বলেছিলেন-

ما كتبت فى الصحيح حديثا الا اغتسلت فبل ذلك وصليت الخ

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

সহীহ মুসলিম

ছয়খানা বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ এর ভেতর ইমাম মুসলিম (র.) [২০৪-২৬১ হি.] এর সর্বশ্রেষ্ঠ অবদান সহীহ মুসলিম গ্রন্থ রচনা। সুদীর্ঘ পনেরো বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনার ফসল সহীহ মুসলিম ¯^কীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তার নাম আবুল হোসাইন আসাকিরুদ্দীন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ ইবনে দাউদ ইবনে কুশাদ আল কুশাইরী আন নিশাপুরী (র.)। বিশুদ্ধতার আলোকে বিচার করলে ছয়খানা হাদীস গ্রন্থের মধ্যে ইমাম মুসলিমের অনবদ্য সৃষ্টি সহীহ মুসলিম শরীফ দ্বিতীয়। ১২০০০ হাদীস দ্বারা সমৃদ্ধ গ্রন্থ মুসলিম শরীফ। আর তাকরার বা পুনউল্লেখ ব্যতীত প্রায় ৪০০০ টি হাদীস রয়েছে এ গ্রন্থে।

ইমাম মুসলিম (র.) সরাসরি তার উস্তাদদের থেকে শ্রæত তিন লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে গ্রন্থটি রচনা করেন। সহীহ মুসলিমে রাবীদের সংরক্ষণ ক্ষমতা ও ন্যায়নীতির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার তদপুরি এ গ্রন্থে উল্লেখিত ৬২০ জন রাবীর মধ্যে ১৬০ জন সমালোচিত। রুবাইয়াত ধারার বর্ণিত তথা প্রতি স্তরে চার রাবীর সনদে বর্ণিত হাদীস প্রায় ৮০ এর ঊর্ধ্বে রয়েছে।

সুনানে নাসায়ী

সুনানে নাসায়ী ইমাম নাসায়ী (র.) [২১৫-৩০৩ হি.] কর্তৃক সংকলিত ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ এর ভেতর অন্যতম। ইমান নাসায়ী (র.) এর পূর্ন নাম হচ্ছে- আবূ আবদুর রহমান আহমদ ইবনে শুয়াইব ইবনে আলী ইবনে বাহার ইবনে সিনান আন নাসায়ী। ইমাম নাসায়ী (র.) কয়েক লক্ষ হাদীস থেকে এ গ্রন্থে মাত্র ৫৭৬১ টি নির্ভূল হাদীস সংগ্রহ করেন। এতে রয়েছে ৫১ টি অধ্যায় ও ২১৩৮ টি পরিচ্ছেদ।

নাসায়ী প্রকৃত অর্থে একটি সুনান গ্রন্থ। কেননা এ গ্রন্থে ইবাদত ও তাহারাত বিষয়ক হাদীস অধিক। ইমাম নাসায়ী হাদীস নির্বাচনে ইমাম বুখারী ও মুসলিমের রীতি অনুসরণ করেন। এ গ্রন্থের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ইমাম নাসায়ী (র.) ¯^য়ং দাবি করেন-

المنتخب المسمى بالمجتبى صحيح كله

জামেউত তিরমিযী

তিরমিযী শরীফ, ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী (র.) [২০৯-২৭৯ হি.] এর সংকলিত গ্রন্থটি ছয়টি সহীহ হাদিস গ্রন্থ এর মধ্যে অনবদ্য একখানা গ্রন্থ। ইমামের পূর্ণ নাম: আল ইমামুল হাফেজ আবূ ঈসা মুহাম্মদ ইবনে ঈসা ইবনে সাওরাতা ইবনে মূসা ইবনে যাহহাস আস সুলামী আত তিরমিযী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত কষ্টসাধ্য শ্রমের মাধ্যমে পাঁচ লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে মাত্র ১৬ শত হাদীসের সমন্বয়ে এ গ্রন্থ সংকলন করেন।

সিহাহ সিত্তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে একমাত্র তিরমিযী শরীফ জামে ও সুনানরূপে সংকলিত। এতে জামে এর ৮ টি বিষয়ের সাথে ফিকহী তারতীব এর আলোচনাও করা হয়েছে। জামেউত তিরমিযী শরীফের অন্যতম দিক এ গ্রন্থে جمع بين الصلاتين ও فتل شارب الخمر হাদীস ছাড়া বাকি সব হাদীসের উপর কোনো না কোনো মাযহাবের লোক আমল করে। অতএব আমলের হাদীস অন্বেষণে জামেউত তিরমিযীর অপর জুড়ি নেই।

জামে তিরমিযীতে প্রয়োজনের তাগিদে মাত্র অল্প কয়েকটি হাদীস ব্যতীত আর কোনো হাদীসের তাকরার করা হয়নি। এ গ্রন্থে মাত্র ৮৩ টি হাদীস তাকরার পাওয়া যায়। মোট হাদীস সংখ্যা ৪৪৬৫ টি। এ গ্রন্থে হাদীস বর্ণনার পাশাপাশি রাবীর পরিচয় ও অবস্থান ও তুলে ধরা হয়েছে। এ কিতাবে হাদীসের প্রকারভেদ যেমন- সহীহ, হাসান, যঈফ, গরীব প্রভৃতি শ্রেণির বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং কোনটি কোন শ্রেণির তাও বলে দেওয়া হয়েছে। ইমাম তিরমিযী (র.) এ গ্রন্থ সংকলনের পর এর সম্পর্কে বলেন-

من كان فى بيته هذا الكتاب فكأنما فى بيته نبي صلى الله عليه وسلم يتكلم

সুনানে আবূ দাঊদ

ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ এর মধ্যে সুনানে আবূ দাঊদ অন্যতম। আর এ হাদীসগ্রন্থ সুনান পর্যায়ভুক্ত। ইমাম আবূ দাঊদ [২০২-২৭৫ হি.] যার পূর্ন নাম- আবূ দাঊদ সুলাইমান ইবনে আশআস ইবনে ইসহাক আল আসাদী আস সিজিস্তানী। তিনি পাঁচ লক্ষ হাদীস থেকে যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৪ হাজার ৮ শত হাদীস দ্বারা এ গ্রন্থ সংকলন করেন। এতে ৩০ টি অধ্যায় ও ১৫৪৪ টি পরিচ্ছেদ রয়েছে। সুনানে আবূ দাঊদে অনেক সুলাসিয়াত (সাহাবীর স্তর থেকে ইমাম আবূ দাঊদ (র.) পর্যন্ত তিন রাবী বিশিষ্ট] হাদীস স্থান পেয়েছে, যা এর মর্যাদাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিপুল গ্রহণযোগ্যতার কারণে সুনানে আবূ দাঊদ সর্বজনগ্রাহ্য সংকলনের মর্যাদা অর্জন করেছে। এ সম্পর্কে স্বয়ং ইমাম আবূ দাঊদ (র.) বলেন-

ما ذكرت فى كتابى حديثا اجتمع الناس على تركه

সুনানে ইবনে মাজাহ

সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীসশাস্ত্রের ছয়টি হাদীস গ্রন্থ এর মধ্যে মুল্যবান একটি হাদিস গ্রন্থ। এটা হাদীসের মূল্যবান ছয়টি গ্রন্থের একটি। ইমাম ইবনে মাজাহ (র.) [২০৯-২৭৩ হি.] যার পূর্ন নাম: আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মাজাহ। তিনি হাদীস জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি প্রসিদ্ধ সুনান গ্রন্থের রচিয়তা। তিনি গ্রন্থটির অধ্যায়সমূহ ফিকহশাস্ত্রের অনুসরণে বিন্যাস করেছেন বিধায় একে সুনান নামে নামকরণ করেছেন।

ইমাম ইবনে মাজাহ অপরিসীম সাধনা এবং লক্ষ লক্ষ হাদীস যাচাই-বাছাই করার পর চার হাজার হাদীসকে বিভিন্ন অধ্যায়ে সাজিয়েছেন। এতে ৩২ টি পরিচ্ছেদ ১৫০০ অধ্যায় এবং মোট ৪৩৩৮ টি হাদীস স্থান পেয়েছে। ইবনে মাজাহ গ্রন্থে সিহাহ সিত্তার অপর পাঁচটি গ্রন্থের তুলনায় যঈফ হাদীসের সংখ্যা একটু বেশি হওয়ার কারণে ছয়টি হাদীস গ্রন্থের মধ্যে এর স্থান সর্বশেষে। মুহাদ্দিস সনদী (র.) এর সুত্রে বলা হয়-

وبالجملة فهو دون الكتب الخمسة فى المرتبة

সর্বপ্রথম সহীহ হাদীসের সংকলিত গ্রন্থ মুয়াত্তা মালেকী। রাসুল صلى الله عليه وسلم এর জীবদ্দশায় সকল বাণী, কর্ম ও মৌনসম্মতিই হলো হাদীস আর এ হাদীস বর্ণনায় অধিক সমাদৃত হওয়ার দিক থেকে সিহাহ সিত্তাকে প্রথম স্তরের এবং দ্বিতীয় স্তরে মুয়াত্তা মালেকী, সুনানে বায়হাকী, সুনানে দারে কুতনী, সুনানে দারেমী, সুনানু সাঈদ ইবনে মানসুর সহ আরো অনেক কিতাব ও তৃতীয় স্তরের হাদীসগ্রন্থের মাঝে শরহে মায়ানিল আসার সহ অনেক কিতাব রয়েছে। যার সবগুলো সহীহ, হাসান, যইফ ইত্যাদির সমন্বয়ে সংকলন করা হয়। ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ এর মাধ্যমে রাসূল সঃ এর কথাগুলো সংরক্ষিত হয়ে আছে ও থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here