বিশ্বের প্রাচীন সপ্তাশ্চর্য সম্পর্কে জেনে নিন

প্রাচীন সপ্তাশ্চর্য ; image source: 7WONDERSOFTHEANCIENTWORLD

বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগে আকাশচুম্বি অট্টালিকা বা নান্দনিক স্থাপনা নির্মাণ কোনো আশ্চর্য বিষয় নয়। সাংহাই, নিউইয়র্ক বা প্যারিসের মতো নামি-দামি শহরগুলোতে অহরহ এরকম স্থাপত্যশিল্পের দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু একবার প্রাচীন যুগের কথা ভাবুন তো! কোনো ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি বা উন্নত কলাকৌশল ব্যতীত কীভাবে তারা নির্মাণ করেছিল ত্রিশ তলার চেয়ে উচুঁ পিরামিড বা ১০৫ ফুট লম্বা গ্রিক সূর্যদেবতা হিলিয়াসের মূর্তি? ভাবতেই চোখ কপালে উঠে যায়!

এরকম অনেক দানবাকৃতির স্থাপনা নির্মাণ করেছিল প্রাচীন সভ্যতার মানুষেরা। প্রায় সবগুলোই হারিয়ে গেছে ইতিহাসের কালো গহবরে। এগুলোর বর্ণনা আমরা জানতে পারি হেলেনিক যুগের কবি ও পর্যটকদের কলম থেকে। তাদের কেউ কেউ তৈরি করেছিলেন বিশ্বের দর্শনীয় সাতটি স্থানের তালিকা। সেগুলোই আমাদের কাছে পরিচিত ‘প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য’ নামে। তাহলে আর দেরি না করে এখনই জেনে নিই এই প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য সম্পর্কে।

৭. আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর

লাইটহাউজ বা বাতিঘরকে সমুদ্রের ট্রাফিক লাইট বলা চলে। সাগরে চলমান জাহাজগুলোকে বিপদজনক ও অগভীর সমুদ্র থেকে রক্ষা এবং নিরাপদে বন্দরে ভিড়ানো বাতিঘরের কাজ। জিপিএস ও রাডারের যুগে বাতিঘরের প্রয়োজন কমে এলেও কিছুদিন পূর্বেও বাতিঘর ছিল নাবিকদের বিপদের সহায়। এমনই একটি বাতিঘর ছিল আলেকজান্দ্রিয়ার ফ্যারোস দ্বীপে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৮০ অব্দে দ্বিতীয় টলেমি এটি নির্মাণ করেন। বাতিঘরটি নীলনদের জাহাজগুলোকে শহরের ব্যস্ত পোতাশ্রয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়িয়ে ঢুকতে এবং বের হতে সাহায্য করত। পাশাপাশি এটির সৌন্দর্য ছিল মনোমুগ্ধকর। দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা বাতিঘরটি দেখার জন্য ছুটে আসতেন।

আলেকজান্দ্রিয়ার বাতিঘর; image source: ancient. eu

বাতিঘরটি উচ্চতা ছিল ৪৪০ ফুট, যা বর্তমান সময়ের একটি ৪০ তলা বিল্ডিংয়ের সমান। স্থাপনাটির মাথায় রাজা দ্বিতীয় টলেমির ১৬ ফুট লম্বা একটা মূর্তি ছিল। কারো কারো মতে মূর্তিটি ছিল আলেকজান্দ্রিয়া শহরের প্রতিষ্ঠাতা মহাবীর আলেকজান্ডারের। বাতিঘরটিতে দিনে সূর্যের আলো ও রাতে বিরাট আগুনের কুন্ডলিকে দর্পণের সাহায্যে প্রতিফলিত করে বাতির কাজ করানো হতো। এর আলো প্রায় ৩৫ মাইল দূর থেকেও দেখা যেত। ৯৫৬ সাল থেকে ১৪৮০ সালের মাঝে কয়েকটি ভূমিকম্পে বাতিঘরটি ধীরেধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নীলনদের তলদেশে এটির ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

৬. রোডসের মূর্তি

প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যগুলোর মধ্যে সর্বশেষ নির্মিত হয় রোডস দ্বীপে অবস্থিত গ্রীক সূর্যদেবতা হিলিয়াসের মূর্তি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০৪ অব্দে ডিমিত্রিয়াসের বাহিনী রোডস দ্বীপ আক্রমণ করে। তাদের আক্রমণ ব্যর্থ হয়। প্রচুর ধনসম্পদ ও অস্ত্র-শস্ত্র ফেলে তারা মেসিডোনিয়াতে ফিরে যায়। এই সম্পদগুলো বিক্রি করে রোডসবাসী তাদের দেবতা হিলিয়াসের জন্য ১০৫ ফুট লম্বা দানবাকৃতির ব্রোঞ্জের মূর্তি তৈরি করে। এটি তৈরিতে তাদের সময় লেগেছিল ১২ বছর।

রোডসের মূর্তি; image source: Wikipedia

সপ্তাশ্চর্যগুলোর মাঝে সর্বশেষে নির্মিত হলেও মূর্তিটি সবার আগে ধ্বংস হয়ে যায়। মাত্র ৫৬ বছরের মাথায় ভূমিকম্পে এটি ভেঙ্গে পড়ে। এরপর আর কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয় নি। প্রায় আটশো বছর এটির ধ্বংসাবশেষ পড়েছিল। ঐতিহাসিক থিওফ্যানের মতে সপ্তম শতাব্দীতে মুসলমানরা মিসর জয় করলে ধ্বংসাবশেষ এডেসার এক ইহুদি ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রি করে দেওয়া হয়। মূর্তিতে ব্যবহৃত ব্রোঞ্জের পাতগুলো নেয়ার জন্য প্রায় নয়শ উটের প্রয়োজন পড়েছিল।

৫. হ্যালিকারনেসাসের সমাধিসৌধ

সম্রাট মোসোলাস ছিলেন পারস্য সম্রাটের অধীনস্থ একজন গভর্ণর। তিনি বর্তমান তুরষ্কের হ্যালিকারনেসাস নামক স্থানে গড়ে তুলেছিলেন তার রাজধানী। তাঁর মৃত্যুর পর রাণী আর্তিমিসিয়া সে সময়কার ঐতিহ্য অনুযায়ী তার জন্য সমাধিসৌধ নির্মাণের আদেশ দেন। সেটিই ইতিহাসে অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী ও জাঁকজমকের জন্য ‘হ্যালিকারনেসাসের সমাধিসৌধ’ নামে খ্যাত।

হ্যালিকারনেসাসের সমাধিসৌধ; image source: ancient. eu

সমাধিসৌধটির উচ্চতা ছিল ১৩৫ ফুট। এটিতে তিনটি ধাপে মিশ্রণ ঘটেছিল লিসিয়ান, গ্রিক ও মিসরীয় স্থাপত্যশৈলীর। প্রথম ধাপে ৬০ ফুট উঁচু আয়তকার ভিত্তি, দ্বিতীয় ধাপে ৫৬ ফুট লম্বা ৩৮টি স্তম্ভ এবং তৃতীয় ধাপে ছিল পিরামিড আকৃতির গম্বুজ। সবার উপরে ছিল চারটি ঘোড়ার রথের একটি ভাস্কর্য। পুরো স্থাপনাটি তৈরি হয়েছিল মার্বেল পাথর দিয়ে।

১৩ শতকের একটু ভূমিকম্পে সমাধিসৌধটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বহুদিন এ অবস্থাতেই পড়েছিল। ১৪৯৪ সালে এতে ব্যবহৃত পাথরগুলো মাল্টায় একটি দূর্গ তৈরির কাজে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানেও দূর্গটিতে প্রাচীন পাথরগুলোর দেখা পাওয়া যায়।

৪. অলিম্পিয়াস জিউসের মূর্তি

গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, জিউস ছিলেন আকাশ ও বজ্রপাতের দেবতা এবং অলিম্পিয়াস পাহাড়ে বসবাসকারী সকল দেবতাদের রাজা। তাকে উৎসর্গ করে খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে দক্ষ ভাস্কর ফিডিয়াস ৪১ ফুট লম্বা একটি প্রকাণ্ড মূর্তি তৈরি করেন। কথিত আছে, মূর্তিটি তৈরি হবার পর জিউস খুশি হয়ে বজ্রপাতের মাধ্যমে এটিকে আশীর্বাদ করেন।

অলিম্পিয়াস জিউসের মূর্তি; image source: Wikipedia

মূর্তিটিতে সিংহাসনে বসা অবস্থায় জিউসকে চিত্রিত করা হয়। মাথা ছিল একেবারে মন্দিরের ছাদ লাগোয়া। এজন্য ভূগোলবিদ স্ট্র‍্যাবো লিখেছেন, ‘মূর্তিটি দাড়ালে বোধহয় মন্দিরের ছাদ ভেঙে যাবে।’ মূর্তিটির ভিত্তি ছিল কাঠের, পুরো শরীর হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি। শরীরের উপর স্বর্ণের আলখেল্লা জড়ানো। সাতজন মিস্ত্রি আড়াই বছর পরিশ্রম করে এটি তৈরি করেন।

চতুর্থ শতকে খ্রিষ্টধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা পেলে জিউসের মন্দিরটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর এটির ভাগ্যে কী হয়েছিল, সঠিকভাবে  জানা যায় নি। ঐতিহাসিক জর্জিস কেন্দ্রেনসের মতে, এটিকে কন্সট্যান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) নিয়ে যাওয়া হয়। ৪৭৫ খ্রিস্টাব্দে এক অগ্নিকাণ্ডে মূর্তিটি ধ্বংস হয়ে যায়।

৩. ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান

ব্যাবিলনিয়ান সম্রাট নেবুচাদনেজার খ্রিস্টপূর্ব ৬০৫ সাল থেকে ৫৬২ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে ঝুলন্ত উদ্যানটি নির্মাণ করেন। সম্রাটের স্ত্রী অ্যামটিস ছিলেন ইরাকের পাহাড়বিশিষ্ট সবুজ-শ্যামল অঞ্চলের বাসিন্দা। তাকে খুশি করার জন্য সম্রাট রুক্ষ মরুভূমির মাঝে কৃত্রিম ঝুলন্ত উদ্যানটি নির্মাণ করেন।

ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান; image source: Wikipedia

এই বাগানটিকে ঝুলন্ত বলার কারণ, এটি মাটি থেকে ৮০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ছিল। দূর থেকে দেখলে এটিকে শূন্যে ভাসছে বলে মনে হতো। ইউফ্রেটিস নদী থেকে পেঁচানো নলের সাহায্যে এত উঁচুতে পানি পৌঁছানো হতো। বাগানটিতে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার জাতের ফুলের সমারোহ ছিল। পুরো বাগানের পরিচর্যার জন্য ছিল ১০৫০ জন মালী।

মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদরা এই উদ্যানের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান। কারণ এত বিশাল হওয়া সত্ত্বেও বাগানটির কোনো ধ্বংসাবশেষের সন্ধান আজও পাওয়া যায় নি। তাছাড়া বাগানটি সরাসরি দেখেছেন, এমন কোনো ঐতিহাসিকের বর্ণনাও ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় না। তাই, তারা মনে করেন ঝুলন্ত উদ্যানের গল্প কবি-সাহিত্যিকদের মগজ থেকে তৈরি।

২. আর্টেমিসের মন্দির

গ্রীক পুরাণের শিকার ও ফসলের দেবী আর্টেমিসকে উৎসর্গ করে নির্মিত হয়েছিল আর্টেমিসের মন্দির। মন্দিরটির অবস্থান ছিল ইফিসাস নামক স্থানে, যা বর্তমান তুরস্কে অবস্থিত। মন্দিরটি কয়েকবার নির্মিত হয়েছে। প্রতিবারই মানুষের হাতে অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়।

আর্টেমিসের মন্দির

মন্দিরটির সবচেয়ে সুন্দর সংস্করণ নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে। এটি নির্মাণের সময় লেগেছিল ১২০ বছর। কিন্তু ৩৫৬ অব্দে হিরোট্রেটাস নামে এক ব্যক্তি ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাবার লোভে মন্দিরটিতে আগুন ধরিয়ে ধ্বংস করে দেয়। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার নাম উচ্চারণও নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ঐতিহাসিক স্ট্রাবো তার লেখা ইতিহাসে এই ব্যক্তিটির নাম উল্লেখ করেছেন।

পরবর্তীতে ইফিসাসবাসী মন্দিরটি আবারও নির্মাণ করে। কিন্তু গথদের আক্রমণে আবারও ধ্বংস হয়। পুনরায় নির্মাণ করা হলেও ৪০১ সালে সেন্ট জন ক্রিসোস্টমের নেতৃত্বে খ্রিস্টানদের আক্রমণে এটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর আর কখনও নির্মাণ করা হয়নি।

১. গিজার পিরামিড

বর্তমান সময়ে মিশরে প্রায় ৮০টি পিরামিড রয়েছে। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় হলো কায়রোর উপকণ্ঠে অবস্থিত গিজার পিরামিড। এটিকেই ইতিহাসের সপ্তাশ্চর্য গুলোর মাঝে একটি হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যান্য আশ্চর্য স্থাপনাগুলো ধ্বংস হয়ে গেলেও একমাত্র গিজার পিরামিড আধুনিক সময় পর্যন্ত টিকে আছে।

গিজার পিরামিড

পিরামিড নির্মিত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ অব্দ থেকে ২৫০০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে। তারপর থেকে আইফেল টাওয়ার নির্মিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত চার হাজার বছর ধরে এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থাপনা, যার উচ্চতা ৪৮১ ফুট। এটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে বিশাল বিশাল পাথর খন্ড। এক একটি পাথরের ওজন প্রায় ৬০ টন। ২০ বছরে আনুমানিক ১ লাখ শ্রমিক পিরামিডটি তৈরিতে অংশ নেয়।

বর্তমান সময় পর্যন্ত টিকে থাকলেও গিজার পিরামিড পুরোপুরি বহাল তবিয়তে নেই। বিশেষজ্ঞদের ধারণা,  পিরামিডের অভ্যন্তরীণ ধন-সম্পদের অধিকাংশই এটি বানানোর ২৫০ বছরের মাঝে লুট হয়ে গেছে। আধুনিক সময়েও এখান থেকে পাথর চুরি করে কায়রোতে ঘর বাড়ি বানানো হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here