বিষ্ময়কর সৌরজগৎ

সৌরজগৎ নিয়ে সবার মনেই কমবেশি কৌতুহল রয়েছে। তবে আমরা অনেকেই জানি না যে, এই সৌরজগৎ আসলে কী? আজকে আমরা সৌরজগৎ, সৌরজগতের গ্রহ, উপগ্রহ ও সৌরজগতের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধারণা জেনে নিবো।

আমাদের বাসস্থান পৃথিবীর সকল শক্তির উৎস সূর্য। সূর্য এবং তার গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণুপুঞ্জ, অসংখ্য ধুমকেতু ও অগণিত উল্কা নিয়ে সৌরজগৎ গঠিত। সূর্য সৌরজগতের কেন্দ্রে অবস্থান করে। গ্রহগুলো মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। সৌরজগতে ৮ টি গ্রহ, শতাধিক উপগ্রহ, হাজার হাজার গ্রহাণুপুঞ্জ ও লক্ষ লক্ষ ধুমকেতু রয়েছে।

সূর্য: সূর্য একটি হলুদ বর্ণের নক্ষত্র যা পৃথিবী থেকে ১৩ লক্ষ গুণ বড়। সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। শতকরা ৫৫ ভাগ হাইড্রোজেন, ৪৪ ভাগ হিলিয়াম এবং ১ ভাগ অন্যান্য গ্যাস নিয়ে সূর্য গঠিত। পৃথিবী সহ অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহের তাপ ও শক্তির মূল উৎস হচ্ছে সূর্য।

সূর্যের মাঝে কিছু কালো দাগ দেখা যায়। যার নাম সৌরকলঙ্ক । সূর্যের বুকে তৈরি হওয়া এক ধরনের চৌম্বকক্ষেত্রের কারণে এমন হয়। সূর্যের কেন্দ্রে সৃষ্টি হওয়া প্রচণ্ড তাপ পৃথিবীতে আসতে পারে না। এখান থেকে তাই এসব জায়গার তাপমাত্রা অনেকটা কম। সৌরকলঙ্কের নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। এদের আয়তন ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি।

সূর্য প্রায় ২৫ দিনে নিজের অক্ষের উপর একবার আবর্তন করে। সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে আটটি গ্রহ। এরা হলো – বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস, নেপচুন। গ্রহদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৃহস্পতি এবং সবচেয়ে ছোট বুধ।

বুধ: সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম এবং সূর্যের নিকটতম গ্রহ হচ্ছে বুধ। এর ওজন পৃথিবীর ৫০ ভাগের ৩ ভাগের সমান। সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে আসতে বুধের সময় লাগে ৮৮ দিন। তাই, সেখানে ৮৮ দিনে এক বছর। বুধের মাধ্যাকর্ষণ এতো কম যে, এটি কোনো বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারে না। এই গ্রহে মেঘ, বৃষ্টি, বাতাস, পানি কিছুই নেই। তাই, এখানে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। এই গ্রহে দিনের বেলায় তাপমাত্রা ৪৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াস এবং রাতের তাপমাত্রা -১৮০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। মার্কিন মহাশূণ্যযান মেরিনার-১০ ১৯৭৪ সালে বুধের যে ছবি পাঠায় তা থেকে দেখা যায় বুধের উপরিতল একদম চাঁদের মতো, ভূত্বক গর্তে ভরা ও এবড়ো-থেবড়ো। কিন্তু এখানে আছে অসংখ্য পাহাড় ও সমতল ভূমি।

সূর্য থেকে গড় দূরত্ব : ৫.৮ কোটি কিলোমিটার

ব্যাস : ৪,৮৫০ কিলোমিটার

আয়তন : ৭৪,৮০০ বর্গ কিলোমিটার

উপগ্রহ: বুধের কোনো উপগ্রহ নেই।

শুক্র: সূর্য থেকে দ্বিতীয় দুরত্বের গ্রহ শুক্র। এটি পৃথিবীর নিকটতম গ্রহ। এর অপর নাম ভেনাস। এই নামটি এসেছে রোমান প্রেমের দেবী ভেনাসের নাম থেকে। সন্ধ্যার পশ্চিম আকাশের সন্ধ্যাতারা এবং ভোরের পূর্ব আকাশের শুকতারা দুটো আর কিছু নয় বরং শুক্র গ্রহ! এই গ্রহটি ঘন মেঘে ঢাকা। তাই, এর উপরিভাগ থেকে সূর্যকে কখনোই দেখা যায় না। শুক্রের মেঘাচ্ছন্ন বায়ুমন্ডলে শতকরা ৯৬ ভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড আছে। তাই এই গ্রহটি প্রাণির বসবাসের অযোগ্য। এটি সৌরজগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল এবং সবচেয়ে উত্তপ্ত গ্রহ। এই গ্রহে এসিড বৃষ্টি হয়। শুক্র গ্রহে ২২৫ দিনে এক বছর হয়। শুক্রের আকাশে বছরে দুইবার সূর্য উদিত হয় এবং অস্ত যায়। সকল গ্রহই নিজ অক্ষের উপর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে পাক খেলেও একমাত্র শুক্র পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে পাক খায়।

সূর্য থেকে গড় দূরত্ব : ১০.৮ কোটি কিলোমিটার

পৃথিবী থেকে দূরত্ব : ৪.৩ কোটি কিলোমিটার

ব্যাস : ১২,১০৪ কিলোমিটার

আয়তন : ৪৬,০২,৩০,০০০ বর্গ কিলোমিটার

 উপগ্রহ: শুক্র গ্রহেরও কোনো উপগ্রহ নেই।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

পৃথিবী: সূর্যের তৃতীয় নিকটতম গ্রহ আমাদের এই বাসস্থান। সূর্যকে একবার প্রদিক্ষণ করে আসতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৭ সেকেন্ড। তাই পৃথিবীতে ৩৬৫ দিনে এক বছর হয়। এটি একমাত্র গ্রহ যার বায়ুমণ্ডলে পর্যাপ্ত অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও সঠিক তাপমাত্রা রয়েছে। তাই সৌরজগতের একমাত্র এই গ্রহতেই প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে।

সূর্য থেকে গড় দূরত্ব : ১৫ কোটি কিলোমিটার

ব্যাস : ১২,৬৬৭ কিলোমিটার

উপগ্রহ: পৃথিবীর একটি প্রাকৃতিক উপগ্রহ রয়েছে চাঁদ। পুরো সৌরজগতের সব উপগ্রহের মাঝে এটি পঞ্চম বৃহত্তম উপগ্রহ। পৃথিবীকে একবার পরিক্রমণ করতে চাঁদের ২৯ দিন ১২ ঘন্টা সময় লাগে।

পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব ৩,৮১,৫০০ কিলোমিটার।

মঙ্গল: পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী মঙ্গলগ্রহ। মঙ্গল গ্রহকে খালি চোখে লালচে দেখা যায়। কারণ, এই গ্রহের পাথরগুলোতে মরিচা পড়েছে। মঙ্গলের উপরিভাগে রয়েছে গিরিখাত ও আগ্নেয়গিরি। এখানে অক্সিজেন ও পানির পরিমাণ খুবই কম। কিন্তু কার্বন ডাই অক্সাইড এর পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। এর বায়ুমণ্ডলে ৩ ভাগ নাইট্রোজেন ও শতকরা দুইভাগ আর্গন গ্যাস আছে। মঙ্গল গ্রহের দিন রাত পৃথিবীর প্রায় সমান। সূর্যের চারদিক প্রদিক্ষণ করতে মঙ্গলের সময় লাগে ৬৮৭ দিন।

সূর্য থেকে গড় দূরত্ব : ২২.৮ কোটি কিলোমিটার

পৃথিবী থেকে দূরত্ব : ৭.৮ কোটি কিলোমিটার

ব্যাস : ৬,৭৮৭ কিলোমিটার

উপগ্রহ : ফোবস ও ডিমোস নামে দুটি উপগ্রহ আছে।

বৃহস্পতি: সৌরজগতের সবচেয়ে বড় গ্রহ হলো বৃহস্পতি। তাই, বৃহস্পতিকে গ্রাহরাজ বলা হয়। এই গ্রহেও জীবের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই গ্রহটির সূর্যকে একবার আবর্তন করতে সময় লাগে প্রায় ১২ বছর। নিজ অক্ষের উপর আবর্তন করতে সময় লাগে ৯ ঘন্টা ৫৩ মিনিট। পৃথিবীর একদিনে বৃহস্পতিতে দুইবার সূর্য উঠে ও অস্ত যায়। এই গ্রহের উপরিভাগের তাপমাত্রা খুবই কম কিন্তু অভ্যন্তরের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি প্রায় ৩০,০০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস।

সূর্য থেকে দূরত্ব : ৭৭.৮ কোটি কিলোমিটার। তাই পৃথিবীর ২৭ ভাগের এক ভাগ তাপ পায়।

ব্যাস : ১,৪২,৮০০ কিলোমিটার

আয়তন : পৃথিবী থেকে ১,৩০০ গুণ বড়

উপগ্রহ: বৃহস্পতির উপগ্রহের সংখ্যা ৬৭ টি। ইউরোপা, গ্যানিমেড, লো, ক্যাপলিস্টো প্রধান উপগ্রহ।

শনির বলয় ও উপগ্রহ। Image: astronomylovers.com

শনি: সৌরজগতের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রহ এটি। এই গ্রহটি গ্যাসের তৈরি একটি বিশাল গোলক। যার উপরিভাগ বরফ দিয়ে আবৃত। বায়ুমণ্ডলে রয়েছে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের মিশ্রণ, মিথেন ও অ্যামোনিয়া গ্যাস। শনি তিনটি উজ্জ্বল বলয় দ্বারা বেষ্টিত। তবে এই বলয়গুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। একসময় হয়তো বলয়গুলো আর দেখা যাবে না। শনি গ্রহের সূর্যকে প্রদিক্ষণ করতে সময় লাগে ২৯ বছর ৫ মাস।

সূর্য থেকে দূরত্ব : ১৪৩ কোটি কিলোমিটার

ব্যাস : ১,২০,০০০ কিলোমিটার

উপগ্রহ :শনির ৬২ টি উপগ্রহ রয়েছে। টাইটান, ক্যাপিটাস, হুয়া, টেথিস, রিয়া এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ধারণা করা হয়, রিয়া উপগ্রহেরও বলয় আছে। (শনি এর উপগ্রহ নিয়ে আমাদের এই ওয়েবসাইটে একটি লেখা রয়েছে। আপনারা সেটি পড়ে আসতে পারেন।)

ইউরেনাস: সৌরজগতের তৃতীয় বৃহত্তম গ্রহ হলো ইউরেনাস। সূর্যকে প্রদিক্ষণ করতে সময় লাগে ৮৪ বছর। ইউরেনাস গ্রহটি হাইড্রোজেন সালফাইড এর মেঘে আবৃত। হাইড্রোজেন সালফাইড থাকার কারণে এখানে পঁচা ডিমের মত বাজে গন্ধ আছে। শনির মতো ইউরেনাসেরও বলয় রয়েছে। ১৩ টি বলয় থাকার পরও অধিকাংশ মানুষ এই ব্যপারটি জানে না। কারণ, ইউরেনাসের বলয় গুলো উজ্জ্বল নয়। ভূ-পৃষ্ঠ না থাকায় কোনো স্পেস ক্রাফ্ট এই গ্রহে অবতরণ করতে পারে না।

সূর্য থেকে দূরত্ব : ২৮৭ কোটি কিলোমিটার

গড় ব্যাস : ৪৯,০০০ কিলোমিটার

 উপগ্রহ : ইউরেনাসের উপগ্রহ ২৭ টি। টাইটানিয়া সবচেয়ে বড় উপগ্রহ। অন্যান্য উপগ্রহের মধ্যে আছে মিরিন্ডা, ওবেরন এবং এরিয়েল।

নেপচুন: নেপচুন আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৮৪০ এর দশকে। নেপচুন সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী ও শীতলতম গ্রহ। এই নামটি এসেছে রোমান সমুদ্র দেবতার নাম থেকে। এই গ্রহটি আয়তনে প্রায় ৭২ টি পৃথিবীর সমান। ১৭ টি পৃথিবীর সমান ভর নেপচুনের। সূর্যকে একবার পরিক্রমণ করতে সময় লাগে ১৬৫ বছর। গ্রহটি কিছুটা নিলাভ বর্ণের । কারণ, এখানকার বায়ুমণ্ডল মিথেন ও অ্যামোনিয়া গ্যাস দিয়ে তৈরি। নেপচুনেরও বলয় রয়েছে।

সূর্য থেকে দূরত্ব: ৪৫০ কোটি কিলোমিটার

ব্যাস: ৪৮,৪০০ কিলোমিটার

উপগ্রহ: নেপচুনের উপগ্রহের সংখ্যা ১৪ টি। এর মধ্যে ট্রাইটন সবচেয়ে বড়।

নেপচুন আবিষ্কৃত হওয়ার পর এর গতি পর্যবেক্ষণ করে আরো একটি গ্রহের উপস্থিতি ধারণা করা হয়। এর নাম দেওয়া হয় প্ল্যানেট এক্স বা প্ল্যানেট নাইন। ১৯৩০ সালে নতুন আবিষ্কারের পর হৈচৈ পরে যায়। এর গ্রহ নাম রাখা হয় প্লুটো। নামটি এসেছে পাতালের দেবতার নাম থেকে।

২০০৬ সাল পর্যন্ত আমরা গ্রহের সংখ্যা ৯ টি জেনে এসেছি। ১৯৩০ সালে আবিষ্কৃত হওয়া বামন গ্রহ প্লুটো ছিল নবম গ্রহ হিসেবে। ১৯৭৮ সালে প্লুটোর উপগ্রহ শ্যারন আবিষ্কৃত হলে এর ভর যথাযথ ভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়। দেখা যায়, প্লুটোর ভর পৃথিবীর মাত্র ০.২ শতাংশ। এছাড়া দেখা যায় প্লুটোর কক্ষপথ কিছুটা উপবৃত্তাকার। প্লুটো সূর্যের চারদিকে আবর্তন করতে করতে নেপচুনের কক্ষপথে ঢুকে যায়। নেপচুনের ভর প্লুটোর চেয়ে অনেক বেশি। গ্রহের মর্যাদা পেতে হলে যেসব বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়, প্লুটোতে সবগুলো বৈশিষ্ট্য না থাকায় ২৪ আগস্ট ২০০৬ তারিখে প্লুটো কে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই কারণে মানুষ আন্দোলনও করেছিল যাতে গ্রহের সংজ্ঞা বদলে প্লুটোকে গ্রহের তালিকায় রাখা হয়।

গ্রহাণুপুঞ্জ: মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রহাণু একত্রে পুঞ্জিভূত হয়ে পরিক্রমণ করছে। এই পরিসরের মধ্যে আর কোনো গ্রহ নেই। এই গ্রহাণু গুলো কঠিন শিলাময় ধাতব বস্তু। আর এগুলোই গ্রহাণুপুঞ্জ নামে পরিচিত।

ধুমকেতু: ধুমকেতু হলো কিছু সৌরজাগতিক বস্তু। গ্যাস, বরফ, ধুলিকণা এসব পদার্থ দিয়ে ধুমকেতু তৈরি। যখন ধুমকেতু সূর্যের কাছাকাছি আসে তখন সূর্যের তাপে এর কিছু অংশ সহজেই গ্যাসে পরিণত হয় এবং সূর্যের তাপে গ্যাসীয় ও কঠিন পদার্থ নির্গত হয়ে আকাশে ছড়িয়ে পরলে একে লেজের মত দেখা যায়। ১৯১১ ও ১৯৮৬ সালে হ্যালীর ধুমকেতু দেখা গেছে। ২০৬২ সালে আবার এই ধুমকেতু দেখা যাওয়ার কথা।

আশা করা যায় যে, লেখাটি পড়ে আজকে আমরা সৌরজগৎ ও এর গ্রহ-উপগ্রহ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে অনেক কিছুই জানতে পারলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here