বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন এর জীবনী

সম্পূর্ণ নামঃ বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন (Benjamin Franklin)

জন্মঃ ১৭ জানুয়ারি, ১৭০৬ সাল।

পেশাঃ বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, লেখক।

বিখ্যাত হওয়ার কারণঃ বজ্রনিরোধক যন্ত্র আবিষ্কার, তিনি ধনাত্মক ও ঋণাত্মক আয়ন বিদ্যুতের মতবাদ দেন এবং তিনিই প্রথম প্রমাণ করেছিলেন যে, আকাশে চমকানো বিদ্যুৎ ও বাসা বাড়িতে ব্যবহৃত বিদ্যুৎ একই এবং এর মধ্যে পার্থক্য নেই।

মৃত্যুঃ ১৭ এপ্রিল, ১৭৯০ সাল।

আমেরিকার ইতিহাসে যদি বহুমুখী ব্যক্তিত্বের অধিকারী কোনো পুরুষের নাম করতে হয় যিনি একাধারে ছিলেন মুদ্রাকর, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রের সংবিধানে রচয়িতা, বিজ্ঞানী, আবিষ্কারক, সেই মানুষটির নাম বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। শুধু আমেরিকার ক্ষেত্রে নন, তিনি সমগ্র মানব জাতির তিনি হিতৈষী বন্ধু।

শৈশব ও জন্মস্থানঃ

১৭০৬ সালের ১৭ জানুয়ারি আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ধর্মীয় কারণে ইংল্যান্ড ত্যাগ করে আমেরিকায় গিয়ে বসবাস আর করতেন।

যখন তার আট বছর বয়স, তাঁর বাবা তাকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। স্কুলে পড়ার পর টাকার অভাবে তাঁর স্কুলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বেঞ্জামিনকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে এনে নিজের সাবান তৈরির কারখানায় ঢুকিয়ে দিলেন তাঁর পিতা। কিন্তু কিছুতেই তাঁর এই কাজে মন বসলো না। ব্যবসার প্রতি কোনোদিন তাঁর কোনো আকর্ষণ ছিল না। তাঁর আগ্রহ ছিল সমুদ্রে ভেসে বেড়াবার।

কিশোরকালঃ

মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি “দ্যা নিউ ইংল্যান্ড কারেন্ট” নামক একটি সাময়িকী প্রকাশ করেন। তিনি স্নাতক শেষ করতে পারেন নি।

বিবাহিত জীবনঃ

তিনি ১৭৩০ সালে “ডবেরা” নামক একজন বিদুষী নারীকে বিয়ে করেন।

কর্মজীবনের প্রথম ধাপ

সমাজের প্রতিটি সমস্যার প্রতি তার ছিল তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তিনি দেখেছিলেন দেশে উপযুক্ত গ্রন্থাগারের অভাব। অধিকাংশ মানুষই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে বই কিনতে পারে না। সর্বত্র লাইব্রেরী স্থাপন করাও ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। তাই, ১৭৩০ সালে তিনি স্থাপন করলেন ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী। আমেরিকায় এই ধরনের লাইব্রেরী সেটাই প্রথম ছিল। এর জনপ্রিয়তা দেখে অল্পদিনেই আরও অনেক ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী গড়ে ওঠে।

১৭৩৩ সাল নাগাদ পুওর রিচার্ডস আলমানাক নামে একটি ধারাবাহিক প্রকাশ করলেন। এই রচনা অল্পদিনেই জনপ্রিয় হয়ে উঠল।

ধনী ও খ্যাতিমান ব্যক্তি হিসাবে বেঞ্জামিন ক্রমশই ফিলডেলফিয়া শহরে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। অর্থ উপার্জনের সাথে সাথে সমাজ সংস্কারমূলক কাজে ঝাপিয়ে পড়লেন বেঞ্জামিন । ইতিমধ্যে তিনি ফিলাডেলফিয়া শহরে একটি সংস্থা স্থাপন করেছিলেন, নাম “ডুণ্টো”। এর উদ্দেশ্য ছিল সমাজের উন্নতিতে পারস্পরিক সহায়তা। এই সংস্থায় তিনি যেসব প্রবন্ধ পাঠ করতেন, সেই অনুসারে নানান সমাজ সংস্কারমূলক কাজকর্ম পরিচালনা করতেন।

১৭৩৭ সালে তিনি আমেরিকাতে প্রথম স্থাপন করলেন বীমা কোম্পানি। এই কোম্পানির কাজ ছিল আগুনে পুড়ে যাওয়া সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দেওয়া।

১৭৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন ফিলাডেলফিয়া এ্কাডেমী। এই একাডেমী তাঁর জীবন কালেই পরিণত হয়েছিল ফিলাডেলফিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বেঞ্জামিনের দৃষ্টিভঙ্গি যে কতখানি ব্যপ্ত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় হাসপাতাল নির্মাণের কাজে। ডাক্তার না হয়েও তিনি অনুভব করেছিলেন হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা। তার বন্ধু ডাক্তার বন্ডকে পরামর্শ দিলেন হাসপাতাল তৈরির কাজে হাত দিতে। বেঞ্জামিনের আন্তরিক সহযোগিতায় ডাক্তার বন্ডের প্রচেষ্টায় ১৭৫১ সালে আমেরিকায় গড়ে উঠল প্রথম হাসপাতাল।

এইসব বহুমুখী কাজের মাধ্যমে বেঞ্জামিন হয়ে উঠেছিলেন আমেরিকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষ।

বৈজ্ঞানিক হিসেবে কর্মজীবনঃ

১৭৪০/৪১ সাল নাগাদ তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজকর্ম শুরু করেন। আবিষ্কারক হিসাবে তার প্রথম উদ্ভাবন খোলা উনুন (Open stove)। এই উনুন অল্পদিনেই ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে বিদ্যুৎ শক্তির প্রতি আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। একদিন আকাশে ঘুড়ি উড়ানোর সময় আকাশের বিদ্যুৎ চমকানো দেখে প্রথম অনুভব করলেন আকাশের বিদ্যুৎ আর কিছুই নয়, বিদ্যুৎ এক ধরনের ইলেকট্রিসিটি। ইতিপূর্বে মানুষের ধারণা ছিল আকাশে যে বিদ্যুৎ চমকায় তা দেবরাজ জিউসের হাতের অস্ত্র। যখন তিনি মানুষকে ধ্বংস করতে চান তখনই তার এই অস্ত্র প্রয়োগ করেন। তাই, আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে মানুষ ভীত হয়ে পড়ত, পূজা-অর্চনা করত। ফ্রাঙ্কলিন সেই ভ্রান্ত ধারণাকে চিরদিনের জন্যে মুছে দিলেন। তিনি দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবার পর প্রমাণ করলেন বৈদ্যুতিক শক্তি দু ধরনের। একটিকে বলে নেগেটিভ, অন্যটিকে বলে পজেটিভ। তাঁর আবিষ্কৃত এই নতুন তত্ত্ব বৈদ্যুতিক গবেষণার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সংযোজন।

আধুনিক কালে আমরা যে টিউব লাইট দেখি তা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈদ্যুতিক শক্তি সংক্রান্ত এইসব আবিষ্কারের গবেষণাপত্র তিনি প্রথম পেশ করেন লন্ডনের রয়েল সোসাইটিতে। তারপর থেকেই তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

রয়্যাল সোসাইটিতে সদস্যপদ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ডক্টর উপাধি প্রাপ্তিঃ

ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে সমুদ্রস্রোতের গতি, প্রকৃতি সম্বন্ধে কয়েকটি গবেষণাপত্র রয়্যাল সোসাইটিতে জমা দেন। এছাড়া তিনিই প্রথম বাইফোকাল লেন্সের ব্যবহার শুরু করেন। তার বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং এই সম্পর্কিত বিভিন্ন রচনা অল্পদিনেই ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিজ্ঞানী মহলে সাড়া জাগাল। এই সমস্ত দেশের বিজ্ঞানীরা তাকে বিপুলভাবে সম্মান জানাল। ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি তাঁকে তাদের সদস্য হিসাবে নির্বাচিত করল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডক্টর উপাধিতে ভূষিত করল।

রাজনৈতিক জীবনের শুরুঃ

ইতিমধ্যে তিনি হয়ে উঠেছিলেন পেনসিলভেনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তি। জনগণের পক্ষ থেকে তাঁকে সংসদ নির্বাচিত করা হল (১৭৫০)। এই সময় থেকে তিনি ক্রমশই রাজনৈতিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়লেন। তিনি চেয়েছিলেন আমেরিকার সমৃদ্ধি, শ্রীবৃদ্ধি। তাঁর এই রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বিচক্ষণতার জন্য তিনি আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যের তরফ থেকে প্রতিনিধি হিসাবে একাধিকবার ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড গিয়েছেন। যেখানেই তিনি গিয়েছেন সেখানেই পেয়েছেন অভূতপূর্ব সম্মান আর সংবর্ধনা।

এদিকে সমস্ত দেশ জুড়ে ইংল্যন্ডের বিরুদ্ধে আমেরিকার অধিবাসীদের মনে ক্ষোভ জমে উঠতে থাকে। আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখা দিল। ১৭৭৫ সালের ১৯শে এপ্রিল আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ আরম্ভ হলো।

পরের মাসেই ফিলাডেলফিয়া শহরে আমেরিকান কংগ্রেসের অধিবেশন বসলো। এখানেই জর্জ ওয়াশিংটনকে আমেরিকান বাহিনীর প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করা হলো। দেশের এই স্বাধীনতা যুদ্ধে অসাধারণ সাংগঠনিক প্রতিভা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বেঞ্জামিন। তাকে আমেরিকার প্রতিনিধি হিসাবে পাঠানো হল ফ্রান্সে। তিনি অল্পদিনেই ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র ও সৈন্য সংগ্রহ করলেন।

গভর্নর হিসেবে দায়িত্বঃ

১৭৮৩ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর তিনি দেশের উন্নয়নের কাজে ঝাপিয়ে পড়লেন। তাঁকে পেনসিলভেনিয়ার শাসন পরিষদের সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত করা হল।

নতুন আমেরিকা গড়ে উঠবার পর নতুন শাসনতন্ত্র রচনার প্রয়োজন দেখা দিল। ডাক পড়ল বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনের। তিনি আরও কয়েকজনের সহযোগিতায় রচনা করলেন আমেরিকা সংবিধান। এই সংবিধানের মধ্যে দিয়ে তিনি আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করলেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। এই বয়সেও তিনি ছিলেন তরুণদের মতই উদ্যমী কর্মঠ।

শেষ জীবন ও মৃত্যুঃ

সকল মানুষের প্রতি ছিল তার আন্তরিক ভালবাসা। জীবনের অন্তিম পর্যায়ে এসে নিগ্রো দাসদের খারাপ অবস্থা দেখে বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। তাই দাসপ্রথা বিলোপের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি যে কাজের সূত্রপাত করেন, উত্তরকালে লিঙ্কন তা সমাপ্ত করেন।

১৭৯০ সালে সামান্য রোগভোগের পর তার মৃত্যু হয়। বিজ্ঞান, দর্শন রাজনীতি, অর্থনীতি সকল ক্ষেত্রেই অসংখ্য অবদানের মধ্যে দিয়ে নিজের অসামান্য প্রতিভা দেখিয়েছেন। এজন্য তাঁকে, মানবজাতির সবচেয়ে হিতৈষী বন্ধু বলা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here