ব্যবসায় ঝুঁকি কী? ব্যবসায় যেসব ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয় এবং তা যেভাবে মোকাবেলা করবেন

বর্তমানকালে চাকরির বাজারের অবস্থা এমন হয়ে উঠেছে যে, একটা ভালো চাকরি পাওয়া এখন সোনার হরিণ পাওয়ার মতই। ক্রমান্বেয়ে বাড়তে থাকা তরুণদের সংখ্যা অনুপাতে চাকরির সংখ্যা খুবই সীমিত। তাই, অধিকাংশ মানুষেরাই ব্যবসায় করার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। কেননা, অধিকাংশ লোকেরাই এখন বুঝতে পেরেছে যে, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা ব্যবসা করেই উপার্জনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করতে পারবে।

আবার অনেকেই এখন ব্যবসায়কেই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করছে। তাদের মতে, অন্যের হয়ে কাজ করার চেয়ে নিজেই নিজের এবং অন্যদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারাটা বেশি সম্মানের। মানুষের ব্যবসাইয়ের প্রতি এই ইতিবাচক চিন্তাভাবনা আসলেই স্বাগত জানানোর মতো।

কিন্তু ব্যবসা করা শব্দটা শুনতে আমাদের কাজে যতটুকু সহজ মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে ব্যবসায়ের সাথে সম্পৃক্ত হতে পারা এবং এবং সফলতার সাথে ব্যবসায় পরিচালনা করা ততটা সহজ কাজ নয়। ব্যবসায়ের সাথে বিভিন্ন প্রকার ঝুঁকি, বিভিন্ন পক্ষ, বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট থাকে, যেগুলো সঠিক উপায়ে পরিচালনা করতে পারা ব্যবসায়কে সফল করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আজকের এই প্রতিবেদনে, আমরা ব্যবসায় ঝু্ঁকি কী? একজন ব্যক্তি ব্যবসা করতে গেলে যেসব ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে, এইসব ঝুঁকির কারণে ব্যবসায়ে কতটা প্রভাব পড়তে পারে এবং কিভাবে এই ঝুঁকিগুলো প্রতিহত করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করব।

ব্যবসায় ঝুঁকি আসলে কী?

ঝুঁকি বলতে আমরা সাধারণত কোনো কিছুর অনিশ্চয়তাকে বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভবনাকে বুঝিয়ে থাকি। কিন্তু ব্যবসায়ের ভাষায় ঝুঁকি বলতে যেকোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্ভবনাকে বোঝায়। যেসকল কারণে, ব্যবসায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেসব কারণই হচ্ছে ব্যবসায়ের ভাষায় ঝুঁকি। এককথায় বলতে গেলে, আর্থিকমূল্যে পরিমাপযোগ্য ক্ষতিই হচ্ছে ঝুঁকি।

ব্যবসায় আর ঝুঁকি একে ওপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন উদ্যোক্তা যখন ব্যবসায় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তাকে বিভিন্ন প্রকার ঝুঁকি ও অনিশ্চিয়তার সম্মুখীন হতে হয়। কোনো ধরনের ঝুঁকি গ্রহণ ছাড়া ব্যবসা করা হচ্ছে আকাশ কুসুম চিন্তা করা মতো। যেখানে ব্যবসা আছে, সেখানে ঝুঁকিও আছে।

একজন ব্যবসায়ীকে সাধারত যেসব ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়

একজন ব্যবসায়ীকে তার ব্যবসা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে কিছু বিশেষ ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হতে হয়। এসব ঝুঁকির উৎপত্তি  যেভাবেই হোক না কেনো, এদের আর্থিকমূল্যে নির্ধারন করা সম্ভব। এইসব ঝুঁকিসমূহকে আমরা নিন্মরূপভাবে ভাগ করতে পারি।

  • লেনদেন সংক্রান্ত ঝুঁকি : ব্যবসায়ে একটি অত্যন্ত সুপরিচিত ঝুঁকি  হচ্ছে, লেনদেন সংক্রান্ত ঝুঁকি। আমরা জানি যে, যেকোনো ব্যবসায়ে দুই বা ততোধিক পক্ষ জড়িত থাকে। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়। কোনো এক পক্ষ যদি তাদের কার্যক্রম সঠিকভাবে পালন না করে বা করতে অপারগতা প্রকাশ করে তাহলে ব্যবসায়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ঝুঁকির সৃষ্টি হয়।

উদহারনসরূপ আমরা বলতে পারি একজন কাঁচামাল সরবরাহকারী এর কথা। একজন সরবরাহকারী যদি আপনার কাছে সঠিক মালামাল পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকে এবং সে তার প্রাপ্য টাকা অগ্রিম নিয়ে নেয় কিন্তু সময়মত আপনার মালামাল আপনাকে হস্তান্তর না করে, তবে আপনি লেনদেনজনিত ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। কেননা এতে আপনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

  • অর্থ সংক্রান্ত বা অর্থনৈতিক ঝুঁকি : ব্যবসায়ে সকল ঝুঁকিই আর্থিকভাবে মূল্যায়িত হয়, তবে এই শ্রেণিতে মূলত সরাসরিভাবে অর্থের সাথে সম্পর্কযুক্ত ঝুঁকিগুলোর কথা আমরা আলোচনা করছি।

অর্থ সংক্রান্ত ঝুঁকিসমূহের উৎপত্তি হতে পারে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অব্যবস্থাপনা, মূলধন যোগাড় না করতে পারা, ঋণ খেলাপি বা ঋণের পরিশোধ না পারার কারণে, ঋণের অতিরিক্ত সুদ, মুদ্রাস্ফীতি ইত্যাদি। এসব কারণে ব্যবসায় প্রত্যক্ষভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।

  • আইন সংক্রান্ত ঝুঁকি : সরকার এবং আর্থিক সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে ব্যবসায় সংক্রান্ত বিভিন্ন নতুন আইন প্রণয়ন করে, যা ব্যবসায়ে প্রায়ই ঝুঁকির সৃষ্টি করে। ব্যাংকের নতুন বিনিয়োগ ও সুদের হার নির্ধারন, সরকারের বিভিন্ন ট্যাক্স, রাজস্ব সংক্রান্ত আইন, বাণিজ্যিক আইন ইত্যাদি যখন ব্যবসায়ের অনুকূলে থাকে না, তখন তা ব্যবসায়ের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
  • প্রযুক্তিগত ঝুঁকি : বর্তমানকালে, প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে সারাবিশ্বের বাণিজ্যিক ব্যবস্থা অনেক বেশি উপকৃত হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায় বিপক্ষ দল সবসময় আপনার দুর্বলতা খুঁজে বের করে আপনাকে ঠকাতে চাইবে

অনেক সময় বিভিন্ন ব্যবসায়িক তথ্যাদি যা ব্যবসায়ের পরিচালনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হ্যাকিং বা ম্যালওয়ারের স্বীকার হচ্ছে। যারফলে, ব্যবসায়ের গোপনীয়তা নষ্ট হচ্ছে। উদহারণ স্বরুপ বলতে পারি, ইমেইল অ্যাকাউন্ট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে যাওয়া। যারফলে, ব্যবসায় অনেক টাকার ক্ষতির  সম্মুখীন হতে পারে।

  • কৌশলগত ঝুঁকি : প্রতিপক্ষের গৃহীত বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত, ব্যবসায়ের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। উৎপাদেনের ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদের ব্যবহার, অর্থ ও মূলধনের যোগান, নতুন ও মানসম্মত পণ্য ও সেবা সরবরাহ, ব্যবসায়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা ইত্যাদি সিন্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারলে একজন ব্যবসায়ী তার ব্যবসায়ের সফলতার পথ সুগম করে তোলে।

প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ীরা যদি এইসব পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে তাদের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে না পারে তবে তারা ব্যবসায়ে ঝুঁকির স্বীকার হয় এবং অনেকসময় ব্যবসায়ে টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়।

  • বাণিজ্যিক ঝুঁকি : পণ্য ও সেবা বন্টন সংক্রান্ত যেসব সমস্যার উদ্ভব হয় সেগুলোই বাণিজ্যিক ঝুঁকি। যেমনঃ পরিবহন সংক্রান্ত ঝুঁকি, গুদামজাত বা সংরক্ষণ সংক্রান্ত ঝুঁকি ইত্যাদি বাণিজ্যিক ঝুঁকির অন্তর্গত। কোনো ব্যবসায়ী মালামাল সরবরাহ করার সময় দুর্ঘটনাবশত নষ্ট হয়ে গেলে অথবা গুদামজাত করার অভাবে নষ্ট হয়ে গেলে তা বাণিজ্যিক ঝুঁকির উদহারণ হবে।
  • অন্যান্য ঝুঁকি : প্রাকৃতিক দূর্ঘটনার কারনে বা অন্যান্য কারণে সৃষ্ট ঝুঁকিসমূহ এই শ্রেনীর অন্তর্গত। যেমনঃ হঠাৎ ভূমিকম্প বা আগুনের কারণে ব্যবসায়ের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। অথবা কোনো নির্দিষ্ট সম্পদের বাজারমূল্য হঠাৎ করে কমে যেতে পারে, অথবা চুরি বা ডাকাতি হতে পারে, বা কর্মীদের আন্দোলন বা অন্য কোনো কারণে ব্যবসায়ে সাময়িক স্থবিরতার সৃষ্টি  হতে পারে। এসব ঝুঁকি ব্যবসায়ের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক হতে পারে।

এইসব ঝুঁকির কারণে ব্যবসায়ে মারাত্নক প্রভাব পড়তে পারে। ব্যবসায়ে সম্পূর্ণ ধ্বস নামতে পারে, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনকি ব্যবসায়ী দেউলিয়া পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। তাই এইসব ঝুঁকি যথাসম্ভব প্রতিহত করার জন্য একজন ব্যবসায়ীর চেষ্টা করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

ব্যবসায়ের ঝুঁকি প্রতিহত করতে আমরা যেসব কাজ করতে পারি

ব্যবসায়ের সাথে ঝুঁকি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ব্যবসায় পরিচালনা করার সময় ঝুঁকি গ্রহণ করা আবশ্যক। সম্পূর্ণরূপে ঝুঁকি বাদ দেওয়া কোনো ব্যবাসায়েই সম্ভব না। তবে এই ঝুঁকির মাত্রা যেন এমন না হয় যার কারণে পুরো ব্যবসায়ে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে বা ব্যবসায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ঝুঁকি গ্রহনের লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ঝুঁকির মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের হবে কিংবা সীমিত হবে।

আমরা অনেকসময় অতিরিক্ত লাভের আশায় অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণে আগ্রহী হই এবং অধিকাংশ সময় এর ফলাফল নেতিবাচক হয়। তাই, এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে যে, কীভাবে ঝুঁকির পরিমাণ সীমিত করা যাবে? নিন্মলিখিত পদ্ধতিগুলো মেনে আমরা ঝুঁকির মাত্রা কমাতে পারি-

ব্যবসায় বিভিন্ন প্রকার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আপনাকে সেগুলো পার করে সফল হতে হবে।
  • স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ: আমরা ব্যবসায়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাত্রা কমানো এবং স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের মাত্রা বাড়ানোর মাধ্যমে ঝুঁকির মাত্রা কমাতে পারি। স্বলমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে আয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়, যার কারণে ব্যবসায়ে ঝুঁকি প্রতিহত করা সম্ভব হয়।
  • ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেও আমরা ব্যবসায়ের ঝুঁকির মাত্রা কমাতে পারি। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মধ্যে ঝুঁকি পরিকল্পনা, সে অনুসারে বিভিন্ন মানবীয় এবং অমানবীয় সম্পদের সংগঠন এবং সেসব সম্পদে ব্যবহার করে পরিকল্পনামাফিক কার্যকম গ্রহণের মাধ্যমে ঝুঁকি প্রতিহত করা সম্ভব।
  • দক্ষ মানবসম্পদ : ইংরেজিতে একটা কথা আছে Placing Right People in the Right Place অর্থাৎ সঠিক কর্মীকে সঠিক স্থানে নিয়োগ করা। কর্মী নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবশ্যই দক্ষ ও যোগ্যতাপূর্ন কর্মী নির্বাচন করতে হবে কেননা কর্মীরাই সকল পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি কার্যক্রম সংগঠিত করবে।
  • বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ: ইংরেজিতে প্রবাদ আছে Don’t Put All Your Eggs in One Basket. এর অর্থ আমাদের সব সম্পদ শুধুমাত্র একটি খাতে বিনিয়োগ না করে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করা উচিত। এরফলে যেকোনো একটি খাতে ঝুঁকির মাত্রা বেশি হলেও অন্যগুলোতে ঝুঁকির মাত্রা কম হয়। যার কারণে কোনো একটি খাতে আয়ের পরিমাণ আশানুরূপ না হলেও অন্যান্য খাতের আয় তার পরিপূরক হয়।

উপরোক্ত  বিষয়াবলি ছাড়াও বর্তমানযুগে, ব্যবসায়ে ঝুঁকি প্রতিহত করার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের গবেষণা করে যাচ্ছে। অনেক বড় ব্যবসায়ী বিভিন্ন কনসালটেন্ট এর শরণাপন্ন হচ্ছে যারা তাদের বিভিন্ন কার্যকরী উপায় যেমন ব্রেক ইভেন এনালাইসিস, সম্পদ ও দায়ের অনুপাত নির্ধারন ইত্যাদি এবং অন্যান্য নতুন উপায়ের সাহায্যে তাদের ব্যবসায়ের ঝুঁকির পরিমান নির্ধারণ এবং তা প্রতিহত করার পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here