ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে জানুন কিছু খুঁটিনাটি তথ্য: প্রকারভেদ এবং সুবিধা

আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাংক এবং ব্যাংকিং দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অর্থকে সাধারণত একটি দেশের প্রধান কার্যকরী সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয় আর ব্যাংককে বলা হয় সেই সম্পদের ধারক ও বাহক।

আমরা সাধারণত যেসব ব্যাংকের সাথে লেনদেন করি, সেবা গ্রহণ করি সেগুলো হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। আর এই সেবা গ্রহণের জন্য আমাদের নির্দিষ্ট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। একেকটি ব্যাংক বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অ্যাকাউন্ট এর ব্যবস্থা করেছে। ব্যাংকের সেবা গ্রহীতারা তাদের লেনদেন এবং সেবার ধরন অনুযায়ী তাদের জন্য উপর্যুক্ত ধরনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে পারে।

আজকে আমরা বিভিন্ন প্রকারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং এদের সুবিধা  নিয়ে আলোচনা করব এবং চেষ্টা করব এই সংক্রান্ত কিছু খুঁটিনাটি তথ্য সবার জন্য উপস্থাপন করতে।

প্রথমেই আমরা শুরু করবো কেন আমাদের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করা প্রয়োজন বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আমাদের কী কাজ করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ আমরা কেন ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলবো।

ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রয়োজনীয়তা

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য এখন ব্যাংকের ভূমিকা অনেক। টাকা পয়সা জমা করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সেভিংস এবং বিনিয়োগ সুবিধা, বিদ্যুৎ, গ্যাস ইত্যাদি বিল পরিশোধ করা থেকে বিভিন্ন জায়গায় অর্থ স্থানান্তর করা, বিভিন্ন এটিএম বুথের মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ টাকা উত্তোলন করা থেকে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো স্থানে নগদ টাকার বিকল্প মাধ্যম ব্যবহার করা ইত্যাদি সবই ব্যাংকের সেবার অংশ।

তাছাড়া বিভিন্ন প্রকার ঋণ সুবিধা প্রদান, পেনশন জমা, বিভিন্ন প্রকারের স্কিম এবং অন্যান্য উন্নত সেবার মাধ্যমে ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদান করার চেষ্টা করে। আর এইসব সেবা একজন গ্রাহক তখনই গ্রহণ করতে সক্ষম হবে যখন তার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকবে, অন্যথায় নয়।

অনেকেই ভাবেন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তা পরিচালনা করা ঝামেলার কাজ। কিন্তু বর্তমানে খুব সহজেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং তা ব্যবহার করা সম্ভব। এরজন্য শুধু কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, ব্যাংক কর্তৃক প্রদানকৃত ফর্ম ইত্যাদি এবং নির্দিষ্ট নিয়ম মানা সাপেক্ষে এসব কাগজপত্র ব্যাংকে জমা দিলেই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলা যায়। এখন আমরা ব্যাংক একাউন্টের প্রকারভেদ সম্পর্কে জেনে নিবো।

ব্যাংক অ্যাকাউন্টের প্রকারভেদ

বর্তমানে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক বিভিন্ন প্রকার অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুবিধা দিচ্ছে। কিন্তু, সাধারণত তিন প্রকারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আমরা দেখতে পাই। এই তিন প্রকার অ্যাকাউন্টসমূহ হচ্ছে:

চলতি হিসাব (Current A/C): প্রথমেই আমরা আলোচনা করছি চলতি হিসাব বা কারেন্ট অ্যাকাউন্ট নিয়ে। চলতি হিসাব হচ্ছে একধরনের ব্যাংক হিসাব যেখানে এই অ্যাকাউন্টের গ্রাহক যেকোনো সময় টাকা জমা রাখতে পারে এবং উত্তোলন করতে পারে। এই ধরনের অ্যাকাউন্টে ব্যাংক কোনো সুদ প্রদান করে না বরং তাদের সেবার জন্য বছরান্তে কিছু সার্ভিস চার্জ কেটে নেয়।

চলতি হিসাব খোলার উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থ তরল ডিপোজিট সংরক্ষণ করা, বিনিয়োগ বা সঞ্চয় নয়। এ ধরনের অ্যাকাউন্ট মূলত ব্যবসায়ীদের জন্য বেশি উপযুক্ত। কারণ তাদের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঙ্কের টাকার প্রয়োজন হয়। কোনো ব্যক্তির পাশাপাশি যেকোনো প্রতিষ্ঠান, ফার্ম, পাবলিক বা প্রাইভেট কোম্পানি, ইত্যাদিও এ ধরনের অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে এবং এর সেবা গ্রহণ করতে পারে।

চলতি হিসাবের কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম সুবিধা হচ্ছে – এ ধরনের হিসাব বা অ্যাকাউন্টের নির্দিষ্ট কোনো মেয়াদ থাকে না। এই ধরনের অ্যাকাউন্ট পরিচালনার জন্য ব্যাংক কর্তৃক নগদ কার্ড, ডেবিট কার্ড, গ্যারান্টি কার্ড ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। তাছাড়া এই ধরনের অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ব্যাংক, ওভারড্রাফট বা ঋণ সুবিধাও প্রদান করে।

সঞ্চয়ী হিসাব (Savings A/C): ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মধ্যে সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ধরনের অ্যাকাউন্ট হচ্ছে সঞ্চয়ী হিসাব বা সেভিংস অ্যাকাউন্ট। এধরনের অ্যাকাউন্টের জমাকৃত অর্থের বিপরীতে ব্যাংক গ্রাহকদের নির্দিষ্ট হারে সুদ প্রদান করে। এই সুদের হার বিভিন্ন ব্যাংকভেদে বিভিন্ন হয়, তবে এই সুদের হার সাধারণত ৪%-৬% এর মধ্যেই দেখা যায়।

বর্তমান যুগে চেক বইয়ের পরিবর্তে ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এধরনের হিসাব তাদের জন্য প্রযোজ্য যারা নিজেদের জন্য কিছু সঞ্চয় করতে চায়। শিক্ষার্থী, চাকুরীজীবী, স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য এ হিসাব বেশি কার্যকর। সঞ্চয়ী হিসাবে ডিপোজিটের পরিমাণের কোনো সীমা নেই। তবে এই ধরনের অ্যাকাউন্ট কার্যকর রাখার জন্য, অ্যাকাউন্টে  কিছু টাকা থাকা আবশ্যক।

যেকোনো ব্যক্তি একক বা যৌথভাবে সঞ্চয়ী হিসাব খুলতে পারে। তাছাড়া ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্যও এ ধরনের হিসাব খোলা যায়। এই ধরনের হিসাবে সপ্তাহে দু’বারের বেশী টাকা উত্তোলন করা যায় না। সঞ্চয়ী হিসাব গ্রহীতা ব্যাংক কর্তৃক সরবরাহকৃত চেক ও এটিএম কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারে।

সঞ্চয়ী হিসাবের গ্রাহকরা যেসব সুবিধা ভোগ করে তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে সঞ্চয়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমান মুনাফা। এছাড়াও এই হিসাবের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল পরিশোধ করা সম্ভব হয়, নিরাপদে কোনো প্রকার খরচ ছাড়াই ব্যাংকে টাকা জমা রাখা যায় ইত্যাদি।

মেয়াদি হিসাব (Term A/C): মেয়াদি বা টার্ম অ্যাকাউন্ট হচ্ছে সেই ধরনের হিসাব যেগুলো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য খোলা হয়। এই মেয়াদ হতে পারে ৫ বছর, হতে পারে ১০ বছর বা ২০ বছর। মেয়াদের উপর ভিত্তি করে সুদের হার নির্ণয় করা হয়। মেয়াদ যত বেশি হয়, সুদের হারও তত বেশি হয়।

মেয়াদি হিসাব প্রধানত দুই ধরনের হয়। ডিপিএস (ডিপোজিট পেনশন স্কিম) অ্যাকাউন্ট এবং এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) অ্যাকাউন্ট।

ডিপিএস অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে একজন গ্রাহককে প্রত্যেক মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ ব্যাংকে জমা করতে হয়। এই জমার পরিমাণ ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অঙ্কের হতে পারে। যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ ধরনের হিসাবের গ্রাহক হতে পারে।

ব্যাংকভেদে এ ধরনের হিসাবের জন্য বিভিন্ন হারে সুদ প্রদান করা হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫ বছর মেয়াদি ডিপিএসের ক্ষেত্রে ১০% এবং এর অধিক যেমন ১০-২০ বছর মেয়াদি ডিপিএসের জন্য ১৫% হারে মুনাফা দেওয়া হয়।

ফিক্সড ডিপোজিটের ক্ষেত্রে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য টাকা এককালীন জমা দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে মুনাফাসহ জমাকৃত টাকা গ্রাহক উত্তোলন করতে পারে। নির্দিষ্ট মেয়াদের আগে টাকা উত্তোলন করা যায় না। তবে, একান্ত প্রয়োজনে পেনাল্টি চার্জ প্রদানের মাধ্যমে ফিক্সড ডিপোজিটের টাকা উত্তোলন করা যায়।

ফিক্সড ডিপোজিটের মুনাফার হার সচরাচর অন্যান্য ধরনের অ্যাকাউন্ট থেকে বেশি হয়। সাধারণত, এ ধরনের হিসাবের সর্বনিম্ন সীমা হচ্ছে ২৫০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ সীমা ব্যাংকভেদে বিভিন্ন হয়। বার্ষিক মুনাফার হার  ৯% – ১২% পর্যন্ত হতে দেখা যায়।

মেয়াদি হিসাবের অন্যতম সুবিধা হচ্ছে অধিক হারে মুনাফা প্রাপ্তি। এছাড়াও এ ধরনের হিসাবের বিপরীতে ব্যাংক সরাসরি ঋণ সুবিধা প্রদান করে। হিসাবের মেয়াদ শেষ হলে নবায়ন করে ব্যবহার করা সম্ভব, সেক্ষেত্রে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার কোনো ঝামেলা নেই।

একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে যে আমরা কতভাবে উপকৃত হতে পারি তার হিসাব নেই। তাই, সবারই বিভিন্ন প্রকারের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কে জানা উচিত এবং নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here