ব্ল্যাকহোলের পরিচয়, গঠন ও সৃষ্টির ইতিহাস

ব্লাকহোল

ব্ল্যাকহোলের নাম আমরা প্রায় শুনে থাকি। নাম শুনেই মনেহয় যেন কী না কী বিষয়! এই নিয়ে এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা আজকে ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করবো।

ব্ল্যাকহোল এর প্রাথমিক ধারণা ব্ল্যাকহোল বলতে আমরা বুঝি কৃষ্ণ গহ্ববরকে। এই কৃষ্ণ গহ্ববর এমন একটি স্থান যেখানে অল্প স্থানে অনেক ভর ঘনীভূত হয়ে রয়েছে। এই ব্ল্যাকহোল মহাবিশ্বে এক বিস্ময় সৃষ্টিকারী মহাজাগতিক বস্তু। যাকে নিয়ে মহাবিশ্বে তৈরি হয়েছে বিশাল শক্তি। এই শক্তি থেকে মহাজাগতিক কোন কিছুই ছাড় পাচ্ছেনা। এমনকি আলো ও তার এই মহাশক্তির কাছে নিরুপায়।

ব্ল্যাকহোল কী? ব্ল্যাকহোল এমন এক বস্তু যা এতো ঘন যে এখান থেকে কোন ক্ষুদ্র আয়তন বা ভর বিশিষ্ট বস্তু এর মহাকর্ষ বল ভেদ করে বের হতে পারেনা। যেমনঃ এই ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষ থেকে আলো পর্যন্ত বের হতে পারেনা। ব্ল্যাকহোল থেকে কোন বস্তু বের হতে না পারার কারণ হলো তার মহাকর্ষ বল অত্যন্ত বেশি।

ব্ল্যাকহোল সৃষ্টির ইতিহাস এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, ব্ল্যাকহোল কীভাবে সৃষ্টি হলো? বিজ্ঞানীরা মনে করেন কোন একটি তারা বা নক্ষত্রের মৃত্যুর পর ঐ মৃত্যুপ্রাপ্ত তারা বা নক্ষত্র থেকে জন্ম দেয় একটি ব্ল্যাকহোল। একটি নক্ষত্রের যখন জ্বালানী শেষ হয়ে যায় তখন তার মৃত্যু ঘটে। নক্ষত্রের এই মৃত্যু থেকে জন্ম নেয় ব্ল্যাকহোল।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন যে, নক্ষত্রের মৃত্যু কীভাবে ঘটে?

এবার আমরা দেখে নিবো যে, কীভাবে একটা নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে।

বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণা সাময়িকীর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, যতক্ষণ একটি নক্ষত্রের মাঝে হাইড্রোজেন গ্যাস অবশিষ্ট থাকে ততক্ষন সেই নক্ষত্র বেঁচে থাকে। আর যখন তার ভেতর হাইড্রোজন শেষ হয়ে যায় তখন নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটে। সহজে এককথায় বলা যায় যে, কোনো নক্ষত্রের ভিতরে হাইড্রোজেন গ্যাস শেষ হয়ে গেলে নক্ষত্রের মৃত্যু হয় এবং সেখান থেকে ব্ল্যাকহোলের সৃষ্টি হয়।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা ভূতত্ত্ববিদ জন মিচেল ১৭৮৩ সালে তার একটি চিঠিতে বিজ্ঞানী ক্যাভেন্ডিসকে ব্যাকহোল সম্পর্কে বলেন, ‘বিপুল পরিমান ভর বিশিষ্ট কোনো বস্তু, যার মহাকর্ষের প্রভাবে আলোক তরঙ্গ পর্যন্ত পালাতে পারেনা’। গনিতবিদ পিয়েরে সিমন তার প্রকাশিত বই  ‘Exposition du system du Monde’ একই ধরনের মতবাদ প্রদান করেন ১৭৯৬ সালে। তবে পিয়েরে সিমনের বইতে প্রথম পর্যায় এই মতবাদ থাকলেও পরে তিনি তার বই থেকে এই মতবাদ উঠিয়ে নেন। কারণ, সেই সময়ে বিজ্ঞানীদের মাঝেই এটা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে যে, আলোর মত ভরহীন তরঙ্গ কিভাবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে?

আইনস্টাইনের ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা মহান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ১৯১৬ সালে তার ‘জেনারেল রিলেটিভিটি থিউরি’ বা ‘সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ তে তিনি দেখান যে, ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে আগে যা ভাবা হতো তা অনেকটা ঠিক। আইনস্টাইনের এই সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রদানের কয়েক মাস পর জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জস্কাইল্ড আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশনের একটি সমাধান নির্ণয় করতে সক্ষম হন। সেই সমাধান থেকে শোয়ার্জস্কাইল্ড এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, যে কোন তারকা বা নক্ষত্র ব্ল্যাকহোলে রুপান্তরিত হতে পারে।

ব্ল্যাকহোলের গঠন আমরা এই আলোচনার মাধ্যমে জেনেছি যে, কোন একটি তারা বা নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটলে সেই তারা বা নক্ষত্র ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে পারে। তবে এই নক্ষত্রের ভর হয় অনেক। এই নক্ষত্রের অস্বাভাবিক ভরের কারণে তার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অনেক বেশি হয়। অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণ শক্তি যতবেশি হবে ঐ নক্ষত্রের ভর তত বেশি হবে। আর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সাথে ভরের যে একটি চিরন্তন সম্পর্ক রয়েছে আমরা সেটা জানতে পেরেছি নিউটনের মাধ্যাকর্ষন সূত্র থেকে।

একটি নক্ষত্র তখন মৃত্যু পথে যেতে থাকে বা চুপসে যেতে শুরু করে যখন ঐ নক্ষত্রের বাহিরের তাপমাত্রার চাপের কারণে ভেতরের মাধ্যাকর্ষন বল বা শক্তি বাড়তে থাকে। এই চাপের তাপমাত্রা জনিত পার্থ্যকের কারণে একটি নক্ষত্র আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে বা চুপসে যেতে থাকে। অর্থাৎ ঐ নক্ষত্রের সব ভর একসাথে মিলিত হওয়ার জন্য একটি বিন্দুতে আসতে শুরু করে। এই ভর কোনো এক সময় কাছে আসতে আসতে এত কাছে চলে আসে যে সমস্ত ভর একটি বিন্দুতে মিলিত হয় এবং তার ভিতর অধিক ঘনত্ব সৃষ্টি করে। এই নক্ষত্রের সমস্ত ভর যে একটি বিন্দুতে মিলিত হয়েছে, সেই বিন্দুতে মিলিত হওয়াকে বলে সিঙ্গুলারিটি। এভাবে চুপসে আসতে থাকলে বা একটি বিন্দুতে মিলিত হলেই ব্ল্যাকহোল হবেনা। এক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হবে নিদির্ষ্ট ব্যাসার্ধে আসা পর্যন্ত। ব্ল্যাকহোল নির্ভর করে নক্ষত্রের ভরের উপর। কার্ল শোয়ার্জস্কাইল্ড তার বিখ্যাত সূত্রের মাধ্যমে বলে গেছেন কীভাবে একটি নক্ষত্র কে ব্ল্যাকহোল বলা যাবে। তার সেই সূত্রটি হল,

যদি কোন নক্ষত্র এই সমীকরণ এর ব্যাসার্ধে আসতে পারে তাহলে ঐ নক্ষত্রকে ব্ল্যাকহোল বলা যাবে।

ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা ব্ল্যাকহোল থেকে আলোর তরঙ্গ বের হতে পারেনা, এই ধারণা অনেক দিন বিদ্যমান ছিল। তবে আধুনিক বিজ্ঞানীদের ভিতর যারা এই মতবাদকে অগ্রাহ্য করেছেন তাদের ভিতর স্টিফেন হকিং অন্যতম। এছাড়াও স্টিফেন হকিং তার বিখ্যাত বই ‘ এ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ এ এই ব্যাপারে প্রমানসহ বিভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন।

আমরা এই পর্বে ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেলাম, যা ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বুঝতে আমাদেরকে সাহায্য করবে।

Image: sci-news.com

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here