ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টি ও সীমানা নির্ধারণ কমিশন

আপনাদের মনে কি কখনও এরকম প্রশ্ন এসেছে যে, ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিলো? আজকে আমরা ভারত-পাকিস্তান এর সীমানা নির্ধারণের কমিশন গঠন সম্পর্কে জানবো।

১৯৪০ সালে লাহোর মুসলিম লীগ সম্মেলনে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষে কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব পেশ করেন। এই প্রস্তাব কে ‘লাহোর প্রস্তাব’ নামে অভিহিত করা হয়। যদিও পরে এই লাহোর প্রস্তাব পরে দ্বিজাতি তত্ত্বের সাথে এক করে জিন্নাহ পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করে বসেন। জিন্নাহ ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্র গঠন হবে না বলে জানিয়ে দেন। শেরে বাংলার উপস্থাপিত লাহোর প্রস্তাবের সাথে দ্বিজাতি তত্ত্বের মিল ঘটিয়ে পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করা হয়। যার সাথে লাহোর প্রস্তাবের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাই পূর্ববঙ্গের মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে না গিয়ে তিনি ‘স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা’ গঠনের জন্য একটি প্রস্তাব দেন। তার এই অবিভক্ত বাংলা গঠনে তখন কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু সহমত পোষণ করেন এবং এই অবিভক্ত বাংলা গঠনের জন্য তারা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু দুই দলই তাদের এই প্রস্তাব কে ফিরিয়ে দেন।

এছাড়া সাধারণ জনগণ এই অবিভক্ত বাংলা গঠনে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করে নি। কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎচন্দ্র বসু, আবুল হাশিম, ফজলুর রহমান, মোহাম্মদ আলী, শঙ্কর রায়, সত্যরঞ্জন বখশী এই কয়জন ছাড়া বাংলার আর তেমন কোনো রাজনৈতিক নেতা অবিভক্ত বাংলা আন্দোলনে যোগ দেন নি। এছাড়া ব্রিটিশ সরকার অবিভক্ত বাংলার ব্যাপারে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের ঐক্য মত ছাড়া ‘স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা’ এর প্রস্তাব মানা হবে না। তাই আর স্বাধীন অবিভক্ত বাংলা তৈরি হলো না। যখন অবিভক্ত বাংলার পক্ষে পূর্ববঙ্গে ভোট হয় তখন ১০৬/ ৩৫ ভোটে অবিভক্ত বাংলার পক্ষে রায় যায়। অন্যদিকে পশ্চিম বঙ্গ ৫৮/২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে ছিল। ফল স্বরুপ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অংশ ও পশ্চিমবঙ্গ ভারতে অংশ করে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।

ভারত ও পাকিস্তান নামক দুইটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে তখন প্রশ্ন দাঁড়ালো যে, এই রাষ্ট্র দুটির সীমানা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?

সীমানা চিহ্নিতকরণ

দেশ বিভক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত যখন চূড়ান্ত তখন সীমানা গঠন কীভাবে হবে, তা প্রধান বিষয় হয়ে যায়। আর এই বিষয় সামনে রেখে লর্ড মাউন্টব্যাটেন সীমানা গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে একটি আলোচনার আহ্ববান করেন। তখন তিনি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও কংগ্রেসের কিছু নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। সীমানা গঠনের ক্ষেত্রে ‘সীমানা কমিশন’ কেমন হবে সেই বিষয়ে তারা আলোচনা করেন। এই সীমানা গঠনে ক্ষেত্রে দুই দেশ তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত উপস্থাপন করবেন কিন্তু মাউন্টব্যাটেন গ্রহণযোগ্য মত টি গ্রহণ করবেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘সীমানা কমিশন’ গঠনের ক্ষেত্রে বাংলা ও পাঞ্জাব প্রদেশের সীমানা কমিশনের প্রতিটিতে বিচার বিভাগীয় কমিটির পিভি কাউন্সিলরের ৩ জন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন। তখন মাউন্টব্যাটেন ভারতের গরম সহ্য করতে পারবে না বলে এই মতকে বাদ দিয়ে দেন। জিন্নাহ আরেকটি প্রস্তাব পেশ করেন। সেটি হলো- জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি নিয়োগ দিতে বলেন এবং প্রতি কমিশনে ৩ জন করে থাকবে যাদের সবাই অভারতীয়। কিন্তু জিন্নাহর এই মতকেও মাউন্টব্যাটেন অস্বীকৃতি জানান। কারণ ব্রিটিশ সরকার ১৫ আগষ্টের আগেই সীমানা নির্ধারণ শেষ করতে চায়। যার কারণে এই প্রস্তাবও মানা হয়নি। কারণ এই প্রস্তাবের প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ সময় সাপেক্ষ। এরপর নেহেরু একটি প্রস্তাব পেশ করেন যে, উভয় দল থেকে প্রতি কমিশনে ২ জন করে লোক নিয়োগ ও নিরপেক্ষ একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার জন্য। এই প্রতিনিধিগণ হবেন বিচার বিভাগীয়। এই প্রস্তাব ব্রিটিশ ও মুসলিমলীগ মেনে নেয়। নেহেরুর এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত অনেক কিছু যোগ বিয়োগ করে উভয় দলের একটি গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব তৈরি করা হয়। নেহেরুর এই প্রস্তাবকে ‘নেহেরু কমিশন’ নামে ডাকা হয়। ‘নেহেরু কমিশন’-এর খসড়া প্রস্তাব পেশ করা হয় ১৯৪৭ সালের ১২ই জুন।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

সীমানা কমিশনের ক্ষেত্রে গৃহীত সিদ্ধান্ত সমূহ

নেহেরু কমিশনের খসড়া প্রস্তাব পেশ করার পরের দিনই দুই দলের একটি যৌথসভা ডাকেন মাউন্টব্যাটেন। এই সভার গৃহীত সিদ্ধান্ত হলো, সীমানা কমিশনের একজন নিরপেক্ষ চেয়ারম্যান হবেন। একটি সীমানা কমিশন উভয় দলের দুইজন করে বিচার বিভাগীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হবে। পাঞ্জাব কমিশনের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের একজন শিখ প্রতিনিধি এই কমিশনে থাকবেন। দুই দলের প্রধানগণ গভর্নরের নিকট তাদের প্রতিনিধিদের নাম জমা দিবে। প্রতিটি সীমানা কমিশন একজন নিরপেক্ষ প্রতিনিধির নাম জমা দিবেন। তারা ব্যর্থ হলে দুই দল নির্ধারন করে দিবে একজন নিরপেক্ষ সভাপতির নাম। নেহেরুরের এই মত গ্রহণ করা হয় ‘ট্রামস অব রেফারেন্স’ এর উপর ভিত্তি করে।

জিন্নাহ পরে সীমানা কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগের ব্যাপারে তিনি একজন ব্রিটিশ বিচারক কে থাকার ব্যাপারে অভিমত দেন। তখন কংগ্রেস তাদের এই সীমানা চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিটিশ বিচারক র‍্যাডক্লিফ কে নিযুক্ত করেন এবং জিন্নাহও পাঞ্জাব ও বাংলার নিরপেক্ষ চেয়ারম্যান হিসেবে র‍্যাডক্লিফ এর নাম ঘোষণা করেন। পরে ২৬  ও ২৭ জুন দুই দল তাদের কমিশনের নাম গভর্নরের কাছে জমা দেন।

কংগ্রেস কর্তৃক সীমানা কমিশনের নাম – বিচারপতি সি. সি বিশ্বাস ও বিচারপতি বিজন কুমার মুখার্জি।

মুসলিম লীগ কর্তৃক সীমানা কমিশনের নাম – বিচারপতি আবু খ্রিষ্টাদ্বেহ মোহাম্মদ আকরাম ও বিচারপতি এস. এ রহমান।

বাংলার সীমানা নির্ধারণ কীভাবে হয়েছিল, তা পরের পর্ব আলোচনা করা হয়েছে।

Feature Image: en.wikipedia.org

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here