মহাকাশে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি

মিল্কিওয়ে বা ছায়াপথ দেখতে অনেকটা এরকম

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি নিয়ে আমাদের মনে হাজারও প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, আসলে কী এই গ্যালাক্সি? কীভাবে এর আবির্ভাব হলো? মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি দেখতে কেমন? যদি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আপনি জানতে চান, তাহলে এই লেখাটি আপনার জন্য।

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি/গ্যালাক্সি কী?

গ্যালাক্সি হলো মহাকাশের একটি উপকরণ বিশেষ। গ্যালাক্সির বাংলা অর্থ ছায়া পথ। এটি একটি মহাকর্ষীয় শক্তি দ্বারা আবদ্ধ খুবই বৃহৎ ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা যা গঠিত হয়েছে তারা, আন্তঃ নাক্ষত্রিক গ্যাস, ধূলি কণা, প্লাজমা এবং বিভিন্ন অদৃশ্য বস্তু দ্বারা। রাতের আকাশে খালি চোখ দিয়ে বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তাকালে বস্তু পুঞ্জের যে বড় বড় দল গঠন হতে দেখা যায়, এই জাতীয় বিশেষ উপকরণ সমষ্টি কে গ্যালাক্সি বলে। এই গ্যালাক্সিতে থাকে কোটি কোটি তারা এবং বিপুল ভরের অসংখ্য ভাসমান বস্তু পুঞ্জ। আমরা যে সৌরজগতে বাস করি, সেই সৌরজগতও এমন একটি গ্যালাক্সির সদস্য। 

নক্ষত্রের আবাসস্থল হলো গ্যালাক্সি/ছায়াপথ। সূর্য কে ঘিরে সকল গ্রহ যেমন ঘূর্ণায়মান ভাবে পাক খেতে থাকে তেমনি ছায়াপথ কে ঘিরে নক্ষত্র গুলো তাঁদের আপন কক্ষপথে অবিরাম পাক খেতে থাকে। আর মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি হলো এমন একটি ছায়া পথ যা সৌরজগতের সাথে সম্পৃক্ত। একটি আদর্শ গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০মিলিয়ন বা ১ট্রিলিয়ন এর মতো তারা থাকে যারা মহাকর্ষীয় শক্তিতে কেন্দ্রের চারিদিকে ঘূর্ণয়মান অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। আমরা যে গ্যালাক্সিতে বসবাস করি সেই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি এবং এন্ড্রোমিন্ডা পরস্পরের দিকে প্রতি সেকেন্ডে ১৩০কিলোমিটার বেগে এগিয়ে যাচ্ছে। এন্ড্রোমিন্ডা হলো আমাদের গ্যালাক্সির সবচেয়ে কাছের নিকটবর্তী একটি ছায়াপথ।  যাদের দূরত্ব মাত্র ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। এখন আবার প্রশ্ন করে বসতে পারেন যে, আলোকবর্ষ কী? আমরা জানি, আলো প্রতি সেকেন্ডে ৩,০০,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করে। এরকমভাবে আলো এক বছর সময়ে যত পথ অতিক্রম করে তাঁকে এক আলোকবর্ষ বলে। তাহলে একবার চিন্তা করে দেখেন যে, আলো এক বছরে কত কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়!!

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির উৎপত্তি

১৬১০ সালে গ্যালিলিও সর্বপ্রথম রাতের আকাশে টেলিস্কোপ এর সাহায্যে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে, সাদা রঙ এর এই পথটি তৈরী হয়েছে অসংখ্য উজ্জ্বল ও নিষ্প্রভ নক্ষত্র দিয়ে।   গ্যালাক্সি শব্দটি মূলত গ্রিক শব্দ থেকে এসেছে। ইংরেজি গ্যালাক্সি শব্দের প্রতিশব্দ হলো ছায়াপথ। গ্রিক পুরান অনুসারে জিউস তার শিশু সন্তান হারকিউলিক্স কে একজন মরণশীল নারীর সাহায্য হেরার বুকে স্থাপন করেন স্বর্গীয় দুগ্ধ পান করাতেন। এই দুধ পান করলে শিশুটি অমৃতত্ত্ব লাভ করবে। হীরা তখন ঘুমাচ্ছিলো। যখন দুধ পান করতে লাগলো তখন হীরার ঘুম ভেঙে যায় আর আর দেখলো শিশুটি দুধ পান করছে তখন হীরা শিশুটিকে দূরে ঠেলে দিলো এমন সময় দুধের একটি ক্ষীণ রাতের আকাশে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়লো আর এর থেকে সৃষ্টি হলো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা দুধালো ছায়া পথ।

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সঠিক বয়স এখনো পর্যন্ত কেউ বলতে পারে নি। ২০০৭ সালে একটি গ্যালাক্সি আবিষ্কৃত হয় যার নাম হলো – HE  ১৫২৩-০৯০১ (এটি সাংকেতিক নাম)। এটি প্রায় ১৩.২ বিলিয়ন বছরের পুরানো। ধারণা করা হয়, এটি মিল্কিওয়ের সবচেয়ে পুরানো নক্ষত্র। প্রাচীন ভারতীয় জ্যোতির্বিদরা মনে করতেন গঙ্গা নদীর উৎপত্তি স্থলের সাথে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সংযুক্ত রয়েছে। তাই তারা মিল্কিওয়ে কে আকাশগঙ্গা নামকরণ করেন। একটি মৃত প্রায় ছায়াপথ আরেকটি মৃত প্রায় বা তরুণ ছায়াপথের সাথে মিলিত হলে দুটি ছায়া পথই নতুন করে জীবন পায়। সাধারণ ছায়াপথ গুলো তৈরীর ক্ষেত্রে এই একই পথ অবলম্বন করে থাকে আর এভাবে গ্যালাক্সি বা ছায়া পথের উৎপত্তি হতে থাকে। নক্ষত্র পুঞ্জ এবং সংঘর্ষের এর উপর ভিত্তি করে এদের আকৃতি ও গঠন হয়ে থাকে।  

গ্যালাক্সির পরিমাপ

আমরা যে গ্যালাক্সিতে বাস করছি তার ব্যাস ৯০,০০০ আলোকবর্ষ। আলো এক বছরে যে পরিমান পথ গমন করে তাকে আলোকবর্ষ বলে। আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ড এ ৩০০০০০ কি:মি:। আর এর কেন্দ্র থেকে আমাদের সূর্যের দূরত্ব ৮.৫ কিলোপারসেক (৩.২৬ আলোক বর্ষ = ১পারসেক )। একটি sb শ্রেণীর ছায়াপথে নক্ষত্রের সংখ্যা প্রায় ১০০বিলিয়ন। যার দৃশ্যমান বস্তুর ভর প্রায় ২০০০০০০০০০০০। যদি কিলোমিটারে আলোকবর্ষ কে প্রকাশ করি তাহলে এক আলোক বর্ষ = ৯×১০^১২ কি:মি: বা ৯ মিলিয়ন কিলোমিটার হবে। আমাদের পৃথিবীর পরিধি প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার। এর আলো এক সেকেন্ডে পৃথিবীকে প্রায় সাত বারের মতো পাক খেতে পারে । পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ৩ লক্ষ ৭১ হাজার কিলোমিটার। যেখানে আলোর এই দূরত্ব পার হতে সময় লাগে এক থেকে দেড় মিনিট এবং সূর্য পৃথিবী হতে ১৫০ মিলিয়ন কি:মি: দূরত্বে অবস্থান করে। আর সেই কারণে সূর্য হতে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ থেকে ৮.৫ মিনিট। এই সৌরজগৎ এর সবচেয়ে দূরের গ্রহটি হলো প্লুটো। যার দূরত্ব ৫ হাজার ৯ শত মিলিয়ন কিলোমিটার। আলো যে গতিতে চলে সেই গতি অনুসারে চললে প্লুটোকে অতিক্রম করতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে ৫ ঘন্টা। এই গ্যালাক্সির মাঝে এমন সব নক্ষত্র আছে যা অতি উচ্চ তাপমাত্রা বিশিষ্ট। ধারণা করা হয় এক হাজার কোটি বছরের দিকে আদি গ্যালাক্সি গুলো সৃষ্টি হয়েছিল। আর আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি সৃষ্টি হয়েছে ১৩৬০ কোটি বছর এর আগে।

গ্যালাক্সির গঠন

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি দূর থেকে দেখতে অনেকটা ডিক্স এর মতন। ডিক্স এর মাঝখানে যেমন একটা ছিদ্র থাকে ঠিক তেমনি গ্যালাক্সিরও মাঝখানে একটি কেন্দ্র থাকে। সূর্য এর কেন্দ্র হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। গ্যালাক্সির আকৃতি বিভিন্ন রকমের হতে পারে। (যেমন: সৰ্পিলাকার, উপবৃত্তকার, কুণ্ডলাকার, অথবা অনিয়মিত)। প্রায় ১৩৭৫ কোটি বৎসর আগে সৃষ্ট বিগ ব্যাং – এর সূত্রে গ্যালাক্সি গুলো তৈরি হয়েছিল। এই বিগ ব্যাং – এর ৩ মিনিট থেকে ১০০,০০০ বছরের মধ্যে তৈরি হয়েছিল দুটি অন্যতম মৌলিক পরমাণু। এই পরমাণু দুটি হলো হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। যার মধ্যে আকর্ষণ এর প্রভাবে গ্যাসীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে হাইড্রোজেন ও  হিলিয়াম  ভেঙে পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে বিশাল এক শক্তি নিঃসরিত হয়। আর এই গ্যাসের নিঃসৃত হয়ে সৃষ্টি হয় নক্ষত্র। আর এই নিঃসৃত শক্তির উপর এর আকৃতির গঠন নির্ভর করে। একটি sb শ্রেণীর গ্যালাক্সির মধ্যে ৮৭-৯০% হাইড্রোজেন, ১০% হিলিয়াম ও ০-৩% ভারী মৌল থাকে। যার আঁকার হবে সৰ্পিলাকার।

সর্ব প্রথম জ্যোতির্বিদরা  মনে করতো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি একটি মাত্র ছায়াপথ কিন্তু ১৭৮১ সালে একজন ফরাসি জ্যোতির্বিদ যার নাম চার্লস মেসিয়ের যিনি ধুমকেতু পর্যবেক্ষণ করেছিলেন এবং তিনি ১০৩টি নক্ষত্রর একটি তালিকা তৈরী করেছিলেন। বর্তমানের জ্যোতির্বিদরা তার সেই আড়াইশত বছরের পুরোনো তালিকা মেনে চলে। বর্তমানে নক্ষত্রের নামকরণে মেশিয়ের নাম অনুসারে M ব্যবহার করা হয়। এখনো জ্যোতির্বিদরা সূত্র প্রয়োগ করে আবিষ্কার করছে অনেক গ্যালাক্সি। তবে আমরা যে গ্যালাক্সিতে বসবাস করছি তার নাম মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here