মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) যা যা করেছেন

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) এর কাজ সমূহ
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) যা করেছেন

মানবাধিকার বলতে আমরা বুঝি মানুষের মানবীয় অধিকার সমূহ সংরক্ষণ করা। মানবাধিকারের বিভিন্ন রকমফের রয়েছে। এর মধ্যে কোনটি নৈতিক প্রকৃতিগত, আবার কোনটি আছে আইনগত যা দেশের আইন বিভাগের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়। মানুষের অধিকারের আরেকটি পরিমন্ডল রয়েছে, যা দেশের সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বা সর্ম্পকিত। একে আমরা মৌলিক অধিকার বলে থাকি। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) মানবতার বন্ধু রুপে সকল মানুষের অধিকার বাস্তবায়ন করে গেছেন। চলুন দেখে আসি কিভাবে আমরা মুহাম্মদ (সা.) তা বাস্তবায়ন করে গেছেন।

বিশ্বনবি সা. এর আগমণের প্রেক্ষাপট:
বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সা. এর আগমনের পূর্বে আরব ভূখন্ডের অবস্থা ছিল অন্ধকার ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন, নীতিগর্হিত, তাদের অধিকাংশ লোকই কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুতে ফেলত। সে যুগে নারী এবং দাস-দাসীর কোন মূল্যই ছিল না। নারীদেরকে তারা ইচ্ছা মতো বিয়ে করত ও তালাক দিতো অর্থাৎ সেখানে নারীর কোন অধিকার ছিলো না। এবং তৎকালীন সময়ে জুয়া খেলায় তাদের এমন পাগল করে তুলতো যে, তারা জ্ঞানশূন্য হয়ে স্ত্রী কন্যাকেও বাজি ধরে বসত।

সেই সময়ে দাস-দাসীদেরকে তারা ইচ্ছে মতো ব্যবহার করত এবং বেচা- কেনা করত। এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, গৃহভৃত্য হোক আর ভূমিদাসই হোক, তাদের ভাগ্যে এক কনা সূর্যরশ্মিও ইহজীবনে জুটত না।
ইসলাম পূর্ব আরব সমাজে সুদ প্রথা বিদ্যমান ছিল। তারা এত উচ্চহারে সুদ কারবার করত যে, সুদ পরিশোধ করতে না পারলে ঋণগ্রহীতার ঘরবাড়ি লুন্ঠন করে তাকে পথের ভিখারী বানিয়ে ছাড়ত। ঐতিহাসিক আমীর আলী বলেন, অনেক সময় ঋণগ্রহীতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সঙ্গে স্ত্রী পুত্রকেও দখল করা হতো।
এক কথায় তৎকালীন সমাজ ছিল লুটপাট, মারামারি, রাহাজানি, পরশ্রীকাতরতাসহ মানবতার এক ভয়ঙ্কর রূপ।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) মানবতার বন্ধু রূপে আগমন

আরব ভূখণ্ডে যখন এমন ভয়ঙ্কর অবস্থা বিরাজ করছিল ঠিক তখনি মানুষের অধিকার নিয়ে শান্তির বানী নিয়ে ধরাপৃষ্ঠে আগমন হয় মানবতার নবী মুহাম্মদ সা. এর। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) তার জীবন অতিবাহিত করেছেন। মানবতার কল্যাণের মানবতার বন্ধু রূপে মুহাম্মদ সা. কে আমরা দুটি অধ্যায়ে বিভক্ত করতে পারি। যথা-
ক) নবুয়্যাতের পূর্বে (মাক্কী জীবন)
খ) নবুয়্যাতের পর (মাদানী জীবন)

আলোচ্য নিবন্ধে এই সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়াস চালাবো।

(ক) নবুওয়াত পূর্ব জীবন:
মানবতার নবী হযরত মুহাম্মদ সা. নবুয়্যাত লাভের পূর্বে মানবতার কল্যাণে যে সকল কাজ করেছেন তা হলো-

দুধ পান:
তিনি প্রথমে আবু লাহাবের দাসী সুয়াইবার দুধ পান করেন। তারপর বনি সা’ আদের আবু যুরাইয়ের কন্যা হালিমা এক মহিয়সী মহিলা ধাত্রীরূপে তাঁকে দুধ পান করিয়ে প্রতি পালন করেন।
মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা. সব সময় মা হালিমার ডান স্তনের দুধ পান করতেন। আর বাম স্তন তার অপর ভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। জীবনের শুরুতেই তিনি মানবতার পরিচয় দিলেন।

(১) ফুজ্জারের যুদ্ধ:
নবি করিম সা. এর বয়স যখন পনের বছর তখন ফুজ্জরের যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধে একদিকে ছিল বনু কেনানা এবং কোরাইশ আর অন্য দিকে ছিল কয়সে আয়নাল। বংশগত কারণে এই যুদ্ধে নবী করিম সা. অংশ গ্রহণ করেন এবং তিনি তাঁর চাচাদের হাতে তীর তুলে দিতেন। কিন্তু নিজে কাউকে লক্ষ্য করে একটি তীরও ছুড়েন নি। এখানে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) এর পরিচয় পাওয়া যায়।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

(২) হিলফুল ফুযুল:
যুবক মুহাম্মদ সা. ছিলেন গভীর মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ। ফুজ্জারের যুদ্ধ অবসানে কিশোর মুহাম্মদ সা. দুর্গত মানবতার সেবার উদ্দেশ্যে ২০ বছর বয়সে একটি সংঘ গঠন করেন। যা হিলফুল ফুযুল নামে পরিচিত। এই সংঘের সদস্যরা সকলে ধর্ম গোত্র নির্বিশেষে আর্ত মানবতার কল্যান সাধনে শপথ গ্রহণ করে। সেই সময়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) এর এই কাজ ছিল সবচেয়ে অগ্রগণ্য।

(৩) হাজারে আসওয়াদ স্থাপন:

কাবা গৃহ পুনঃনিমার্ণের পর অতি পবিত্র হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপন নিয়েও আরব গোত্রসমূহের মধ্যে দেখা দেয় রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সম্ভাবনা। বিবাদমান গোত্রের প্রতিনিধিগণ রক্ত পূর্ণ পাত্রে হস্ত নিমজ্জিত করে অস্ত্রের মাধ্যমে ও সমস্যা সমাধানের প্রতিজ্ঞা করে। বৃদ্ধ আবু উমাইয়ার দেওয়া প্রস্তাব অনুসারে এ দায়িত্ব অর্পিত হয় মুহাম্মদ সা. এর উপর। তিনি অতি বিচক্ষণতার সাথে সমস্যাটি সমাধান করেন। হাজারে আসওয়াদ খানা একটি চাঁদরের উপর স্থাপন করে তিনি সকল গোত্র প্রতিনিধিকে চাঁদরের কিনারা স্পর্শ করতে বলেন। সকলে ধরে হাজারে আসওয়াদ কাবার দেয়ালের নিকট নিয়ে আসেন। অতঃপর বিশ্বনবি সা. নিজেই হাজারে আসওয়াদ যথাস্থানে স্থাপন করেন। যেহেতু তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং স্নেহ ধন্য, তাঁর এই ব্যবস্থাপনা সকলেই সন্তুষ্টচিত্রে গ্রহন করে এবং সুপ্রশংস বচনে শান্তিপূর্ণভাবে গৃহে প্রত্যাবর্তন করে। এখানে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.) এই কর্মটি কী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সম্ভাবনা থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করেনি?

(৪) আল-আমিন উপাধি:
মহানবির জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি বাল্যকাল হতেই শিশু মুহাম্মদ সা. সাদেক বা সত্যবাদী নামে পরিচিত ছিলেন। চির সত্য-বাদী হিসেবে মহানবি সা. শিশুকালে যে নামে ভূষিত হন তা ছিল ‘সাদেক বা সত্যবাদী’ আল-আমীন নয়। আমানত সংরক্ষণ এবং বিশ্বস্ততার জন্যে পরবর্তীতে তাঁর নাম হয় ‘আল-আমীন’। আরববাসী স্বতঃস্ফুর্তভাবে তাঁকে ‘আল-আমীন’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

(খ) নবুওয়াত পরবর্তী জীবন:
নবুয়্যাত পূর্ব জীবন ছাড়াও মানবতার নবি নবুয়্যাত পরবর্তী জীবনেও মানবতার কল্যাণে কাজ করেছেন। নিম্নে তাঁর কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হলো-

মদিনার সনদ:
৬২২ খৃ. মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. মদীনা হিজরত করে মদীনার নিরাপত্তা বিধান, সুশাসন কায়েম ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আনসার, মুহাজির, ইয়াহুদী, নাসারাসহ বিভিন্ন গোত্র প্রধানদের সমন্বয়ে সকলের গ্রহণযোগ্য একটি সনদ প্রণয়ন করেন। এই সনদই বিখ্যাত মদীনার সনদ নামে পরিচিত।

এটি বিশ্বের সর্ব প্রথম লিখিত সংবিধান। এতে ৪৭ টির অধিক ধারা সন্নিবেশিত হয়েছে। ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মহানবি সা. প্রণীত উক্ত সনদ পৃথিবীর ইতিহাসের অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সংযোজন করে। নিম্নে মানবতা সংশ্লিষ্ট এই সনদের কয়েকটি ধারা উল্লেখ করা হলো-

* মদীনাবাসী সকলের সম্মিলিত একটি উম্মাহ একটি জাতি।
* মদীনা উপত্যকা উম্মুক্ত ও সকলের জন্য পবিত্র।

* ইয়াহুদী নাসারাগণ শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে মদীনা রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে।
* তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য বাধ্য করা হবে না।
* তাদের সকল প্রকার নিরাপত্তা দেওয়া হবে।
* তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, সম্পত্তি ও সর্বপ্রকার অধিকারের নিরাপত্তা থাকবে।
* তাদের ধর্ম পালনে কোন বাধা দেওয়া হবে না।
* বিচার ব্যবস্থায় তাদের ইনসাফ পাওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে।
লক্ষ্য করুন, কিভাবে কাফির-মুশরিক, ইয়াহুদী-নাসারাদের প্রতি নিরপেক্ষ ও উদার মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন।
মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. সকল ধর্মের মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় শুধু সনদ প্রণয়ন করেই ক্ষ্যান্ত হননি বরং তা তিনি নিজের জীবনে সর্বপ্রথম বাস্তবায়ন করে অপরকে আদেশ দিয়েছেন।

সমাজ সংস্কারে মুহাম্মদ সা. :
বিশ্বনবি হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন ঐতিহাসিক যুগের বিশ্ববিখ্যাত সমাজ সংস্কারক। পৃথিবীর এক অধপতিত সমাজে জন্ম গ্রহণ করে সেই সমাজকে তিনি শ্রেষ্ঠ সমাজে পরিণত করেন। বিশ্ব ভূখণ্ডকে দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন নির্যাতিত মানবগোষ্ঠীয় অধিকার শান্তির নীড় খুঁজে পেয়েছে কন্যা সন্তান, নারী, দাস-দাসীসহ নির্যাতিত নিপীড়িত অসহায় মানব জাতি।

উত্তম চরিত্র:
একজন চরিত্রবান মানুষ হওয়ার জন্য যে সকল গুণ থাকা দরকার তার অপূর্ব সমাবেশ ঘটেছিল মহানবি মুহাম্মদ সা. এর চরিত্রে। যেমন হাদিসে আছে,
হযরত বারা রা. বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল স. সবচেয়ে মুখাবয়বের অধিকারী ছিলেন। আর তিনি সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি খুব লম্বাও ছিলেন না আবার বেটেও ছিলেন না।

হযরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ সা. সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন।

তাঁর চরিত্র সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন-
হে নবি! নিশ্চয় আপনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। মহানবি সা. সেই চারিত্রিক মাধুর্য্য দিয়ে সুদীর্ঘ ২৩ বছরে যে মানুষগুলো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন তাদেরকে নিয়েই মদিনার জীবনে পূর্ণাঙ্গ ইসলামি সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে পেরেছিলেন। মহানবি সা. একদল নিবেদিত প্রাণ আদর্শ চরিত্রবান সহযোগী নিয়ে মদিনায় এ আদর্শ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন এবং হিজরতে ৮ বছর পর তাদের নিয়েই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে অনাবিল শান্তির ধারা বয়ে আনলেন।

নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায়:
নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে মুহাম্মদ সা. এর অবদান ছিল অনন্য। অন্ধাকার যুগের বর্বর সমাজে যে ব্যাভিচার, শ্লীলতাহানি এবং নারী সম্প্রদায়ের প্রতি গর্হিত আচরণ চলছিল মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. তাঁর মূল উৎপাটন করে বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেন। নারীর উপর পুরুষের যে রকম অধিকার রয়েছে, পুরুষের উপরও নারীর সেইরূপ অধিকার রয়েছে। তিনি নারীকে দ্বিবিধ সম্পত্তি ভোগের অধিকার প্রদান করেন। একটি হলো পৈত্রিক সম্পত্তি, অপরটি স্বামীর সম্পত্তি।

দাস-দাসীর অধিকার:
সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মহানবি সা. দাসত্ব প্রথার সংস্কার সাধন করেন। অন্ধকার যুগে দাস শ্রেণি ছিলো সবচেয়ে নিগৃহীত। মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. ক্রীতদাসের কঠোর জীবনকে নমনীয় করলেন। ক্রীতদাস যায়েদকে মহানবি সা. মুক্তি দিয়ে আপন পুত্র হিসেবে লালন পালন করেন। এমনকি মুতার যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। হযরত আবু বকর, উমর, উসমান, আলী রা. এর মত বিশিষ্ট্য সাহাবীগণ ক্রীতদাস যায়েদের অধীনে সাধারণ সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করেছেন। হযরত বেলাল রা. কে প্রথম মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করে মহানবি সা. দাস-দাসীর যে মর্যাদা প্রদান করেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

শুধু তাই নয় তিনি ঘেষিণা করেন, দাস-দাসীর মুক্তিদানের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আর কিছুই নেই। মহানবি সা. আরো বলেন,
দাস-দাসীরা তোমাদের মতই মানুষ সুতরাং তোমরা যা খাবে তাদেরকে তা খাওয়াবে এবং তোমরা যা পড়বে তাদেরকে তা পড়াবে। মনে রাখবে আল্লাহর নিকট সকলেই সমান।
আর এভাবেই মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা. দাস-দাসীদের অধিকার প্রদান করেছিলেন।

শ্রমিকের অধিকার:
রাসূল সা. বলেন, শক্তি-সামর্থ এর অতিরিক্ত কাজ শ্রমিকদের উপর চাপাবে না। যদি তাঁর সামর্থের অতিরিক্ত কোন কাজ তাকে দেওয়ার হয় তাহলে সে কাজে তাকে সহযোগীতা কর।
রাসূল সা. আরো বলেন,
শ্রমিকের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।

হাদিসে আছে,
হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন তুমি কোন শ্রমিকের দ্বারা পরিশ্রম করাতে ইচ্ছা কর, তখন তার পারিশ্রমিক ঠিক করে নিও।
তিনি অন্যত্র বলেন, বিনিয়োগকারী যেন নিয়োজিত শ্রমিকের কাছ থেকে তার সামর্থের বাইরে কোন কাজ আশা না করে। এবং তার স্বাস্থ্য নষ্ট হতে পারে এমন কোন কাজে যেন তাদের বাধ্য করা না হয়।
হাদিসে আরো আছে,
তোমরা কখনো শিশু ও শ্রমিককে হত্যা করো না।

এভাবে শান্তি, মৈত্রী, ক্ষমা, দয়া, শ্রমের মর্যাদা ও ন্যায় বিচারের মাধ্যমে আর্ত মানবতার যে কল্যাণ সাধিত করে গেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে এক অতুলনীয় দিক নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে যাবে।

প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের অধিকার:
মানবতার নবি হযরত মুহাম্মদ সা. প্রতিবেশী ও আত্মীয় ¯^জনের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি সকলকে পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, অভাবগ্রস্থ ও দুঃখী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
হাদিসে এসেছে,

হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল সা. আমার দুর্জন প্রতিবেশী রয়েছে, তাদের মধ্যে কাকে আমি হাদিয়া দিব? তিনি বললেন, উভয়ের মধ্যে যার দরজা তোমার বেশি কাছে।

রাসূল সা. বলেন,
হযরত আবু হোরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবি করিম সা. বলেন, যে আল্লাহ এবং আখেরাতের ওপর বিশ্বাস রাখে সে যেন, প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।

হযরত আবু হোরায়রা রা. হতে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তির অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ না থাকে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

সদয় ব্যবহার কর নিকটাত্মীয়, এতিম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও।

অমুসলিমের অধিকার প্রতিষ্ঠা:
অমুসলিমদের অধিকার রক্ষায় মহানবি সা. সতেষ্ঠ ছিলেন। তিনি তাঁর রাষ্ট্রের অধীনে অমুসলিম নাগরিকদের জান-মাল ও সম্মান রক্ষা করেন এবং ধর্ম-কর্ম পালনে পূর্ণ অধিকারও প্রদান করেন।
হাদিসে আছে,
হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি করিম সা. এর যুগে আমার অমুসলিম মা আমার নিকট এলেন, আমি নবি সা. কে জিজ্ঞেসা করলাম, আমার মা (ইসলাম) অপছন্দ করা অবস্থায় আমার নিকট এসেছে, আমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখব কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি তোমার মায়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখ।

মহান আল্লাহ বলেন-
ধর্মের ব্যাপারে কোন বাড়াবাড়ি নেই।

পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক বোর্সওয়ার্থ বলেন, পৃথিবীতে যদি কেউ অমুসলিমদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার গৌরব দাবী করতে পারেন তবে তিনি একমাত্র মুহাম্মদ সা. ছাড়া আর কেউ নন।

অর্থনৈতিক সংস্কার:
মানবতার বন্ধু মহানবি হযরত সা. তৎকালীন আরব সমাজের পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা বিলুপ্ত করে মানুষের কল্যাণে সেখানে যাকাত ভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। দুঃখী ও অসহায় লোকদের শোষণ করার অন্যতম হাতিয়ার সুদ ব্যবস্থাকে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেন,

জাহেলি যুগে সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো। আর আমি সর্বপ্রথম আমার চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের সুদ বাতিল ঘোষণা করলাম! তোমরা জুলুম করো না, মাজলুমও হবে না।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-

তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। যাতে তোমরা কল্যাণ অর্জন করতে পারো।

সুদকে নিষিদ্ধ করে আল্লাহ বলেন-
আল্লাহ ব্যবসাকে করেছেন হালাল, আর সুদকে করেছেন হারাম।

অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর জন্য যাকাত ব্যবস্থা চালু করেন। যা ধনীদের নিকট থেকে সংগ্রহ করে অসহায় দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন-

তাদের (ধনীদের) সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে সাহায্য প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্য।
এছাড়াও মহানবি সা. অর্থ ব্যবস্থার আরো সংস্কার করেন। যা এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন বিশ্ব মানবের মুক্তির দিশারি, জগতের জন্য রহমত, তাঁর আদর্শের ছোঁয়ায় বরবর আরব জাতি অতি কম সময়ের মধ্যে বিশ্বের বুকে গৌরবদৃপ্ত জাতিতে পরিণত হয়।
মহানবি হযরত মুহাম্মদ সা. তাঁর জীবনে যে সকল কাজ করে গেছেন তার সবগুলোই ছিল মানবতার কল্যাণে নিবেদিত। যা আমরা উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমাণ পাই।

তাই সকল মুসলমানদের উচিত মহানবীর (স) এর মানবতার পথকে অনুসরণ করা। তাহলেই মুসলমানদের দেখে অন্যরা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হবে। তাই দেখা যায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদ (সা.)  এর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি।

মুহা. ইমাম হাছান খান

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here