মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের খুটিনাটি

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন কি?
ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কোন মুসলমান মারা গেলে তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বা ত্যাজ্য সম্পত্তি কিভাবে ও কাদের মধ্যে বন্টন করা হবে সে সম্পর্কিত বিধানকে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন বা ফারায়েজ বলে।

উত্তরাধিকার আইনের উত্‍স:

  • কোরআন
  •  হাদিস/সুন্নাহ
  •  ইজমা
  •  কিয়াস
  • বিধিবদ্ধ আইন
  • আদালতের সিদ্ধান্ত

১. কোরআন
উত্তরাধিকার আইনের প্রথম ও প্রধান উত্‍স আল-কোরআন।আল কোরআনের সূরা নিসায় প্রত্যক্ষভাবে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন সম্পর্কে বলা আছে। যেমন- মুসলিম উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা নিসায় বলা হয়েছে যে,  ১২ জন লোক মৃত ব্যক্তির সম্পদে সরাসরি অংশীদার বা উত্তরাধিকার হবে। যাদের মধ্যে ৪ জন পুরুষ এবং ৮ জন মহিলা। এমনকি কে কত অংশ পাবে তাও স্পষ্ট করে বলা আছে।

২.হাদিস (রাসুল সঃএর নির্দেশাবলি) যেমন- সহীহ বুখারী শরীফে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিতকরণ বিষয়ে বলা হয়েছে- একজন মুসলমান কোন অমুসলিম এর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হবেনা এবং একজন মুসলিমের সম্পত্তিতে কোন অমুসলিম ও উত্তরাধিকারী হবেনা। ধর্মান্তরিত হলে ঐ ব্যক্তি মুসলিম আত্মীয়র সম্পত্তি হতে বঞ্চিত হবে। তবে মৃত্যুর পূর্বে আবার মুসলমান হলে সে উত্তরাধিকারী হতে পারবে।

৩. ইজমা (সম্মিলিত মত দ্বারা বিধি প্রণয়ন) যেমন- ধমীর্য় অনুশাসনের ব্যাপারে যেমন- রোজা, নামাজ,জনগণের সম্মিলিত মত দ্বারা বিধি প্রণয়ন, হযরত আবুবক্করকে খলিফা নিযুক্ত করা ইত্যাদি ঐক্যমত বা ইজমার দ্বারা হয়েছিল। Doctrine of representative ইজমার একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত।

৪.কিয়াস
যেমন- ইসলামে মাদকতা সৃষ্টিকারী তীব্র পানীয়কে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মদকে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ না করা হলেও যেহেতু মদ মাদকতা সৃষ্টিকারী তীব্র পানীয়, সুতরাং সাদৃশ্যমূলকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে বিবেচিত হয়। এটাই কিয়াস।

৫. বিধিবদ্ধ আইন
বাংলাদেশে মুসলমানদের উপর উত্তরাধিকার,বিবাহ,বিবাহ-বিচ্ছেদ, উইল, হিবা এবং ওয়াকফ্ সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে মুসলিম আইন প্রয়োগ করা হয়।

বিধিবদ্ধ আইন হিসাবে আইন সভা দ্বারা পাশকৃত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আইন হল:

  • উত্তরাধিকার আইন ১৯২৫
  • মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ,১৯৬১( অধ্যাদেশ নং ৮)
  • মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৭
  • মুসলিম বিবাহ ও বিবাহ-বিচ্ছেদ রেজিষ্ট্রেশন আইন, ১৯৭৪

৬. আদালতের সিদ্ধান্ত

মৃত ব্যাক্তির সম্পদের বন্টন
– দাফন-কাফন সংক্রান্ত খরচ
– ঋন পরিষোধ এবং যদি স্ত্রীর দেনমোহর বাকী থাকে তা পরিষোধ।
– উইল/অসিয়ত- এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যাক্তির অবশিষ্ট মোট সম্পদের তিন ভাগের একভাগ প্রদান করতে পারবে।
(উল্লেখ্য যে- কোন মুসলিম জীবিত থাকা অবস্থায় তার সম্পদের যে কোন পরিমান দান করতে পারবে কিন্তুু অসিয়ত করতে পারবে মোট সম্পদের তিন ভাগের একভাগ।
– ওয়ারিশদের মধ্যে বন্টন।

মৃত ব্যাক্তির সম্পদ থেকে যারা কখোনো বঞ্চিত হয়না
৫ জন- বাবা, মা, ছেলে, মেয়ে, স্বামী, স্ত্রী
(স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ায় এরা অন্য কোথাও বিয়ে করলেও বঞ্চিত হবেনা)

যারা মৃত ব্যাক্তির সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে
– হত্যাকারি- মৃত ব্যাক্তিকে হত্যাকারি ব্যাক্তি যদি তার ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার হয় তাহলে সে তার প্রাপ্য সম্পদ থেকে বঞ্চিত হবে)
– ক্রীতদাস
– ধর্মান্তরিত ব্যাক্তি- একজন মুসলিম  যদি অন্য কোন ধর্মে ধর্মান্তরিত হন তাহলে তিনি যাদের সম্পত্তিতে ওয়ারিশ হতেন সেখান হতে বঞ্চিত হন|সহীহ বুখারী শরীফে উত্তরাধিকার হতে বঞ্চিতকরণ বিষয়ে বলা হয়েছে- একজন মুসলমান কোন অমুসলিম এর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হবেনা এবং একজন মুসলিমের সম্পত্তিতে কোন অমুসলিম ও উত্তরাধিকারী হবেনা। ধর্মান্তরিত হলে ঐ ব্যক্তি মুসলিম আত্মীয়র সম্পত্তি হতে বঞ্চিত হবে। তবে মৃত্যুর পূর্বে আবার মুসলমান হলে সে উত্তরাধিকারী হতে পারবে।

মানষিক ভারসাম্যহীন ব্যাক্তির ক্ষেত্রে বিধান
মানষিক ভারসাম্যহীন ব্যাক্তি তার প্রাপ্য উত্তরাধিকার সম্পত্তি পাবে, যদি সে নিজের সম্পদ নিয়ন্ত্রন করতে না পারে তাহলে সালিস বা কোর্টের মাধ্যমে লিগ্যাল গার্ডিয়ান নিযুক্ত করে নিতে হবে।

ডক্ট্রিন অব রিপ্রেজেনটেটিভ/ মৃত সন্তানের সন্তান
যাহার সম্পত্তি বন্টিত হবে, তাহার মৃত্যুর পূর্বে কোন পুত্র বা কন্যা মারা গেলে, তাহার সম্পত্তি বন্টনের সময় তাহার উক্ত (মৃত) পুত্র বা কন্যার কোন সন্তান সন্তোতি জীবিত থাকলে, তাহারা একত্রে সম্পত্তির সেই অংশ পাবে, যা তাদের পিতা বা মাতা জীবিত থাকলে পেত।

নিখোঁজ পুরুষ বা স্ত্রীলোক ঃ
হানাফী আইন অনুযায়ী একজন নিখোঁজ ব্যক্তিকে তার জন্মের পর হতে নব্বই বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে জীবিত বলে গন্য করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত সাক্ষ্য আইন-১৮৭২ এর ১০৮ ধারা অনুযায়ী সাত বৎসর পর্যন্ত যদি কোন ব্যক্তির ব্যাপারে সাধ্যমত চেষ্টা করিয়াও খোঁজ খবর না পাওয়া যায় তবে তাকে মৃত বলে ধরা হবে। সে অনুযায়ী তার ওয়ারিশ বন্টন করতে হবে।

দুর্যোগে নিহত ব্যক্তিগন ঃ
একাধিক আত্মীয় যদি পানিতে ডুবে, আগুনে পুড়ে, ঝড়-তুফানে ভূমিকম্পে, ঘর-বাড়ি বা দেওয়ালে চাপা পরে কিংবা বজ্রাঘাতে বা ডাকাতের হাতে বা যুদ্ধে বা অন্যকোন কারণে একত্রে মারা যায় এবং ঐসব ব্যক্তির মধ্যে কে আগে বা কে পরে মারা গেছে তা নিশ্চিতভাবে জানা বা স্থির করার কোন উপায় না থাকে তবে তারা একত্রে মারা গেছে বলে ধরা হবে। এইরূপ ক্ষেত্রে প্রত্যেক মালদার মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তার জীবিত ওয়ারিশগনই পাবে, মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন অপর জনের ওয়ারিশ হতে পারবে না।

নপুংসক বা হিজড়া ঃ
যে ব্যাক্তি পুরুষও নয় আবার স্ত্রী-লোকও নয় আবার যার পুরুষ ও স্ত্রী উভয় লিঙ্গ রয়েছে তাকে হিজড়া বলা হয়। হিজরাকে পুরুষ ও স্ত্রী হিসাবে গন্য করা যায়। হিজড়াকে যে হিসাবে গন্য করলে (পুরুষ ও স্ত্রী) সে কোন অংশ পায়না বা কম পায় সে হিসাবে গন্য করেতে হবে।

সৎ পুত্র ও সৎ কন্যা ঃ
যে স্ত্রীর অংশ বন্টন করা হবে সেই স্ত্রী গর্ভের সন্তান ওয়ারিশ হবে অন্য স্ত্রীর গর্ভের সন্তান ওয়ারিশ পাবেনা। সেইরূপ সৎ মা সৎ পুত্রের ও কন্যার ওয়ারিশ হতে পারেনা।

পোষ্য পুত্র ও কন্যা ঃ
যদি কোন ব্যক্তি কোন ছেলে বা মেয়েকে পোষ্য পুত্র বা কন্যা রূপে লালন পালন করে এবং পুত্র কন্যা রূপে প্রকাশ করে ও যাবতীয় ভরণপোষন করে তার পরও রেজিষ্টারী দলিল মূলে কোন সম্পত্তি না দিলে পোষ্য পুত্র বা কন্যা কোন সম্পত্তি পাবে না।

জারজ সন্তান ঃ
জারজ সন্তান কেবল তার মায়ের সন্তান বলিয়া বিবেচিত হয়। সেই হিসাবে জারজ সন্তান কেবল তার মা বা মাতৃকুলের আত্মীয়গনের ওয়ারিশ হবে সেইরূপ জারজ সন্তানের কেবল মা এবং মাতৃকুলের আত্মীয়গন ওয়ারিশ হবে অন্য কেউ না। কিন্তু জারজ পুত্র একই মায়ের বৈধ পুত্রের নিকট হতে সম্পত্তির অংশ পাইতে পারে না।

গর্ভের সন্তান ঃ
এক্ষেত্রে সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে সেটা জানার জন্য সন্তান জন্ম হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারে, তা না হলে সন্তান ছেলে হিসাব করে সম্পত্তি বন্টন করতে হবে।পরে মেয়ে হলে পূনঃবন্টন করতে হবে।

তালাক প্রাপ্ত স্বামী বা স্ত্রী
ফেরতযোগ্য তালাক বা তালাকে রাজ’ই হলে বা ইদ্দতকালীন সময়ে স্বামী বা স্ত্রী সম্পত্তি পাবে , কিন্তু তিন তালাক কমপ্লিট হয়ে গেলে বা তালাক দেয়ার ৯০ দিন পরে মারা গেলে পাবেনা।

মিরাস বৃদ্ধি (আউল) এর নীতি ঃ
অংশীদারগনের প্রাপ্য নিজ নিজ অংশ বরাদ্দ করে দেয়ার পর যদি অংশীদারগনের প্রাপ্য অংশের যোগফল একক অপেক্ষা অধিক হয়, তবে প্রত্যেক অংশীদারের প্রাপ্য অংশ এমন আনুপাতিক হারে হ্রাস করতে হবে, যাহাতে ভগ্নাংশ অংকে প্রাপ্য অংশ সমূহের একটি অভিন্ন হর থাকে এবং সেই হর টি এমনভাবে বৃদ্ধি করতে হবে, যাহাতে তা লব সমূহের যোগফলের সমান হয়।

ফেরত নীতি (র‌দ)
অংশীদারদের প্রাপ্য দাবী পূরণের পর সম্পত্তির কিছু অংশ অবশিষ্ট থাকলে এবং কোন অবশিষ্টভোগী না থাকলে, উক্ত অবশিষ্ট সম্পত্তি অংশীদারদের প্রাপ্য অংশের অনুপাতে তাদের নিকট প্রত্যাবর্তন করবে। প্রত্যাবর্তনমূলক এই অধিকারকে বিশেষ অর্থে ফেরত নীতি বা রদ বলা হয়।
ফেরত নীতি (রদ) এর ব্যতিক্রম ঃ
অংশীদারই হোক বা দূরবর্তী জ্ঞাতি হোক অন্য কোন ওয়ারিশ বর্তমান থাকলে স্বামী বা স্ত্রী ফেরত অংশ পাবে না, তবে যদি অন্য কোন ওয়ারিশ না থাকে তা হলে ফেরত নীতি অনুযায়ী অবশিষ্টাংশটি স্বামী বা স্ত্রী (অবশেষ প্রাপকের অবর্তমানে) প্রত্যাবর্তন স্বরূপ পাবে।

ওমারিয়াতানঃ-
যেক্ষেত্রে কেবলমাত্র মাতা, পিতা এবং স্বামী/স্ত্রী থাকে সেক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মে সম্পত্তি বন্টন করলে মাতা পিতার চেয়ে অধিক সম্পত্তি পায় যা মুসলিম আইনের সাধারণ নীতির পরিপন্থী। মাতা কখনো পিতার চেয়ে বেশী সম্পত্তি পেতে পারেনা। সেক্ষেত্রে মাতার ৩১ অংশ ঠিক রেখে এবং স্বামী/স্ত্রীর অংশ দেওয়ার পর বাকী অংশ পিতা পাবে। ইহাই ওমারিয়াতান নীতি।

হিমারিয়াতানঃ-
যেক্ষেত্রে বৈ-পিত্রিয় ভাইগন সম্পত্তি পায় কিন্তু আপন ভাইগন বঞ্চিত হয় সেই ক্ষেত্রে বৈ-পিত্রিয় ভাইগনের অংশ ও সহোদর ভাইগনের প্রত্যেকের অংশ সমান হবে। ইহাই হিমারিয়াতান নীতি।

মোতাসিম বিল্লাহ মিরাজ, এল এল বি(অনার্স), এল এল এম (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এডভোকেট-ঢাকা জজ কোর্ট

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here