মোবাইল ফোন আবিষ্কারের ইতিহাস

আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনে কথা বলার জন্য, মেইল করার জন্য বা আরও অন্য কারণে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকি। কখনও কি চিন্তা করে দেখেছেন যে, এই মোবাইল ফোন কীভাবে আবিষ্কার হলো? আজকে আমরা এই মোবাইল ফোন আবিষ্কারের ইতিহাস জেনে নিবো।

চার দশক আগে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার আমাদের জীবনের নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে। হাজার হাজার মাইল দূরত্বকে নিমেষেই হার মানিয়ে দিয়েছে একটি যন্ত্র। হ্যাঁ, মোবাইল ফোনের কথাই বলছি। শুধু নেটওয়ার্ক আর বিল থাকলেই আপনি খুব সহজে একস্থান থেকে অন্য স্থানে যোগাযোগ করতে পারেন।

মোবাইল শব্দটি এসেছে ইংরেজি মুভ (Move) শব্দ থেকে। নড়ানো বা সরানো যায় অর্থাৎ এই যন্ত্রটি নিয়ে আপনি য কোনো যায়গায় মুভ করতে পারবেন বলেই এর নাম এসেছে মোবাইল। মোবাইল কথাটির আক্ষরিক অর্থও ভ্রাম্যমাণ, চলনশীল বা গতিময়। অতি সহজে যেকোনো স্থানে বহন করা যায় এবং ব্যবহার করে ফোন করা যায় জন্য এর নাম মোবাইল ফোন।

মোবাইল অপারেটরা তাদের প্রদত্ত সেবা অঞ্চলকে অনেকগুলো সেল বা ক্ষেত্রে বিভক্ত করে। নেটওয়ার্ক স্টেশনের মাধ্যমে প্রত্যেকটি অঞ্চলের মোবাইল সেবা সরবরাহ করা হয়। সেলগুলোর প্রতিটি কোণে নেটওয়ার্ক স্টেশন অবস্থান করে। অনেকগুলো সেল এ বিভক্ত হয়ে সেবা দান করার কারণে মোবাইল ফোনকে সেলফোনও বলা হয়।

আবিষ্কারের ভাবনা:

১৮৭৬ সালে টেলিফোন আবিষ্কার করেন আলেকজেন্ডার গ্রাহাম বেল। টেলিফোন আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করেন তার বিহীন যোগাযোগ ব্যবস্থা আবিষ্কারের কথা। কিন্তু বেতার টেলিযোগাযোগ সম্ভব হয় আরো অনেক বছর পরে। ১৯০৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইংরেজ ব্যঙ্গচিত্র রচনাকারী লুইস বামার পাঞ্চ ম্যাগাজিনে একটি কার্টুন চিত্র প্রকাশ করেন। এর শিরোনাম ছিল “Forecasts for 1907”. চিত্রটিতে প্রকাশ পেয়েছে একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা হাইড পার্কে বসে আছে। তারা একে ওপরের সাথে কথা বলার পরিবর্তে মাথা নিচের দিকে করে তাদের হাতে থাকা একটি রেডিও ডিভাইসের দিকে মনোযোগী হয়ে আছে। অনেক আগে প্রকাশিত এই চিত্রটি যেন বর্তমান সময়কেই প্রতিফলিত করে।

পাঞ্চ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত সেই ব্যঙ্গচিত্র, যা ইদানিং কালে বাস্তবিক রুপ নিয়েছে; image source: reddit.com

ভ্রাম্যমাণ ফোন হিসেবে প্রথম যে জিনিসের নাম আসে তা ছিল একটি গাড়িতে লাগানো টেলিফোন। Lars Magnus Ericson ১৯১০ সালে তার গাড়িতে টেলিফোন লাগান। যদিও তার ফোনটি বেতার বা রেডিও ফোন ছিল না। তিনি গাড়িতে ব্যবহার করা ফোনটির সাথে দুটি তার লাগিয়ে National phone network ব্যবহার করে ফোন কল করতেন। এছাড়াও তখনকার সময়ে বিমানের যাত্রী, ইউরোপের ট্রেনগুলোর প্রথম শ্রেণীর যাত্রীরা রেডিও টেলিফোন বা বেতার টেলিফোন ব্যবহারের সুযোগ পেতেন।

১৯২৬ সালে আরেকজন চিত্রশিল্পী কার্ল আর্নল্ড মোবাইল ফোনের ব্যবহার সম্পর্কে একটি কার্টুন তৈরি করেন। এর শিরোনাম ছিল “wireless telephony”. জার্মান একটি ব্যঙ্গাত্মক ম্যাগাজিনে কার্টুনটি প্রকাশিত হয়েছিল।

সেই আমলে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আঁকা এই ওয়ারলেস টেলিফোনি; রাস্তায় চলমান মানুষ ব্যবহার করছে বেতার মোবাইল ফোন; image source: scopnest.com

এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯৪০) বেতার টেলিফোন ব্যবহার করে সৈন্যরা। এ সময় এই বেতার টেলিফোন ব্যপক হারে ব্যবহৃত হয়। রেজিনাল্ড ফেসেন্ডেন এই বেতার টেলিফোন ব্যবস্থার আবিষ্কারক ছিলেন।

 ১৯৪৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে বেল টেলিফোন সার্ভিসের আওতায় লাওস থেকে কল করা হয়। একই বছর অক্টোবরে আবারো এলিয়েন বেল টেলিফোন কোম্পানির মাধ্যমে শিকাগো থেকে টেলিফোন কল করা হয়। ভ্যাকুয়াম টিউবে তৈরি এই টেলিফোনটির ওজন ছিল প্রায় ৩৬ কেজি। ৩২ টি চ্যানেলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হতো। এই ব্যবস্থার যোগাযোগ চলেছে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত।

বিশ্বের প্রথম মোবাইল ফোন:

১৯৭৩ সালে মটোরেলা কোম্পানির ভাইস প্রেসিডেন্ট জন মিশেল যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের দিকে নজর দেন। মটোরেলা কোম্পানির একজন জেষ্ঠ্য প্রকৌশলী মার্টিন কুপারের সামনে জন মিশেল একদিন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, বিশ্বেস প্রথম মুঠোফোন তৈরি করবে মটোরেলা কোম্পানি। কুপার সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং বিজয়ের হাঁসি হাসেন। ১৯৭৩ সালের ৩ এপ্রিল মার্টিন কুপার সর্বপ্রথম মোবাইল ফোন থেকে কল করেছিলেন। ফোনটির নাম ছিল ডায়না টিএসি (DynaTAC)। এখনকার সময়ের ফোনের মতো ফোনটি হালকা ছিলনা। ওজন ছিল ১ কেজি বা ২.২ পাউন্ডের। দৈর্ঘ্যে ৯ ইঞ্চি, উচ্চতায় ৫ ইঞ্চি এবং প্রস্থে ১.৭৫ ইঞ্চি ছিল। ব্যাটারি চার্জ করতে অনকে সময় লাগতো। একবার চার্জ করলে ফোনটি দিয়ে  ২০ মিনিট সময় কথা বলা যেত। তখন এর পরিচিতি ছিল ব্রিক ফোন বা ইট আকৃতির ফোন।

মার্টিন কুপার ও তার আবিষ্কৃত সেই সময়ের ইট আকৃতির ফোন; image source: Britannica.com

নিউইয়র্কের ছিক্সথ এভিনিউ থেকে প্রথম বারের মত ফোনটি ব্যবহার করে কল করেন মার্টিন কুপার।

সবচেয়ে মজার ব্যপার হলো মার্টিন কুপার সেই মোবাইল ফোন দিয়ে সর্বপ্রথম কথা বলেছিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী জোয়েল এঞ্জেলের সাথে। জোয়েল বেল ল্যাবসের গবেষক ছিলেন। তিনিও মোবাইল ফোন তৈরির জন্য আলাদাভাবে কাজ করছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিজয়ের হাঁসি হাসতে পারেন নি। ১৯৮৩ সালে ডায়না টিএসি ৮০০০এক্স মোবাইল ফোনটির বাণিজ্যিক সংস্করণ বাজারে আসে।

মার্টিন কুপার বিবিসির একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, চার দশক আগে আবিষ্কৃত মোবাইল ফোনের আকারও যেমন বড় ছিল দামও তেমন বেশি ছিল। তিনি জানতেন একসময় মোবাইল ফোনের আকার ও দাম দুটোই মানুষের হাতের মুঠোয় চলে আসবে।

মোবাইল ফোনের ক্রমবিকাশ:

বর্তমান সময়ের মোবাইল ফোন আগের মোবাইল ফোনের চেয়ে অনেক আলাদা। আগে শুধু কল করার জন্য ফোন ব্যবহৃত হতো। ধীরেধীরে সবকিছুতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ইনপুট পদ্ধতি ছিল কী প্যাড। এখন টাচ স্ক্রীন তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়ায় কীপ্যাড বলতে গেলে হারিয়েই গেছে।

শুধু প্রাথমিক টেলিযোগাযোগ সুবিধা পাওয়া যায় যে ফোনে তাকে বলে ফিচার ফোন। আমরা প্রথম দিকে যে ফোনগুলো ব্যবহার করতাম যেমনঃ নোকিয়া ১১০০ সে; এগুলো হচ্ছে বেসিক ফোন। পরবর্তীতে এই বেসিক ফোনগুলোর সাথে আরও নতুন বৈশিষ্ট্য যুক্ত হয়। মোবাইল ফোনে মিউজিক, ক্যামেরা, ভিডিও এসব সুযোগ সুবিধা যোগ হয়। এগুলোকে মাল্টিমিডিয়া ফোন বলা হয়।

মাল্টিমিডিয়া ফোনের পরে আসে স্মার্টফোন। মাল্টিমিডিয়া ফোনের সুবিধা গুলোর সাথে নতুন যুক্ত হয় উন্নত ক্যামেরা সুবিধা, ওয়াইফাই ব্যবহার, টাচ স্ক্রিন এবং অনেক রকম অ্যাপসের সুবিধা। ওয়েবক্যাম হিসেবেও কাজে লাগানো যায় এসব মোবাইল ফোন।

আধুনিক মোবাইল ফোনগুলোতে কথা বলার পাশাপাশি টেক্সট ম্যাসেজ, মাল্টিমিডিয়া ম্যাসেজ, ইন্টারনেট সেবা, ই-মেইল ব্যবহার, ভিডিও কলিং, ভিডিও গেম খেলা, বুলুটুথ সেবা, অফিসের তথ্য আদান প্রদান ও পর্যবেক্ষণ করা, টিভি দেখা ইত্যাদি সব সুবিধাই পাওয়া যায়।

বাংলাদেশে মোবাইল ফোন সেবা: বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মোবাইল ফোন চালু হয় নব্বই এর দশকে। ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে হাচিসন বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড সর্বপ্রথম ঢাকায় মোবাইল সেবা শুরু করে। আমাদের দেশে তু জি এর পর বর্তমানে থ্রি জি ও ফোর জি চালু হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতে ফোর জি সেবা চালু আছে। বিশ্বের উন্নত দেশ গুলো ফোর জি চালানোর পাশাপাশি ফাইভ জি তে উন্নিত হবার প্রচেষ্ঠা করছে। কোনো কোনো দেশ ইতিমধ্যে ফাইভ জি চালুও করেছে।

মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা: ১৯৯০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত পুরো পৃথিবীতে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ১২ মিলিয়ন থেকে ৬ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮৭ শতাংশ এখন মোবাইল যোগাযোগের আওতায় এসেছে। ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী ৬৩ শতাংশ লোকের নিজস্ব মোবাইল ফোন আছে। এভাবেই সময়ের ক্রমবিকাশের সাথে মোবাইল ফোন হয়ে উঠছে আমাদের অন্যতম দরকারী একটি অনুসঙ্গ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here