করোনাভাইরাস: জীবন রক্ষাকারী ভ্যাকসিন যেভাবে তৈরি হয়

শত্রুবাহিনী কিংবা সন্ত্রাসীদের থেকে আমাদের দেশ রক্ষা করে কারা? উত্তর আসবে আমাদের দেশের বিশাল পুলিশবাহিনী আছে,সেনাবাহিনী আছে। তারাই তাদের জীবনের বিনিময়ে হলেও আমাদের রক্ষা করে চলেছেন শত্রুদের থেকে। তাহলে এবার ভাবুন বাইরের শত্রু থেকে আমাদের শরীরকে রক্ষা করছে কারা।

দেশের যেমন সেনাবাহিনী,পুলিশবাহিনি আছে শরীরেও আছে একদল সেনা। আমাদের রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা এক সৈনিকের ভূমিকা পালন করে। বাইরে থেকে কোনো জীবানু এলেই তারা শত্রুদের ঘায়েল করে ফেলে। রক্তের এই কার্যকরী সেনাবাহিনীকে বলে ইমিউন সিস্টেম বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এরা আবার দুইভাগে বিভক্ত হয়ে কাজ করে। প্রথমেই জীবাণুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সহজাত প্রক্রিয়ায়। এই প্রক্রিয়ায় যদি পেরে না উঠে,তাহলে আসে শক্তিশালী অর্জিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা।

কিন্তু নতুন কোনো জীবাণু নতুন কোনো পন্থায় শরীরে আক্রমণ করলে স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সামাল দেয়া একটু কঠিনই হয়ে পড়ে। তখনই আমরা আক্রান্ত হই ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া বা প্যারাসাইটিক রোগে। মহামারির মত ছড়িয়ে পড়তে পারে এসব রোগ। তাহলে এসব থেকে বাচার উপায় কি? বিজ্ঞানীরা চিন্তা করলেন ভেতরের সৈন্য দিয়েই ঘায়েল করবেন এসব প্রানঘাতী শত্রুদের। শুধু প্রয়োজন পূর্বপ্রস্তুতি এবং সৈন্যদের আরো শক্তিশালী করে তোলা আগে থেকেই যদি বাইরের জীবানু সম্পর্কে ধারণা দিই ওদের,তাহলে জীবাণু এলেও তাকে খুব তারাতাড়ি ধরাশায়ী করা যাবে। ভ্যাকসিনকে আমরা এই প্রস্তুতির সরঞ্জামও বলতে পারি। ও! হ্যা! আমরা যেটাকে ছোটবেলা থেকে টিকা বলে অভ্যস্ত সেটাই ভ্যাকসিন।

পাঠকমহল শুনলে বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না ভ্যাকসিন আসলে জীবাণু। ব্যাপারটা লোহা দিয়ে লোহা কাটার মতই। জীবাণুকেও জীবাণু দিয়েই ঘায়েল করা যায়। রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগেই ইনজেকশন কিংবা কোনো তরলের ফোটা খাওয়ানোর মাধ্যমে শরীরে জীবাণু ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তবে মনে রাখতে হবে এই জীবাণু কোনো আসল জীবাণু নয়। আসল জীবাণুকে গবেষণাগারে বিশেষভাবে পরিবর্তন করে নেয়া হচ্ছে।

যার ফলে এই জীবাণু আমাদের কোনো রোগে আক্রান্ত করবে না। এরপর আসল জীবাণু এসে গেলেও ট্রেনিংপ্রাপ্ত মেমোরি কোষেরা তাদের মেরে ফেলবে বিস্তার ঘটানোর আগেই। ক্লোনিং এর মাধ্যমে নিজেদের সংখ্যাও বাড়িয়ে নেয় মেমোরি কোষগুলো। এভাবেই ভ্যাকসিন কাজ করে আমাদের শরীরে। আমরা প্রতিদিনই ধুলাবালির কারণে কোনো না কোনো জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছি। কিন্তু ভ্যাকসিনে এবং প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই আমাদের বাচিয়ে দিচ্ছে। আমরা কোনো টেরও পাচ্ছিনা।

ভ্যাকসিন আমাদের মানবজাতিকে কিভাবে বাচিয়ে চলছে পরিসংখ্যানে না আসলে বুঝতে পারবেন না। শুধুমাত্র গুটিবসন্তেই প্রতি বছর প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষ মারা যেতো। ভ্যাকসিনের ফলে ১৯৮০ সালের পর এ রোগ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ডিপথেরিয়া এবং হুপিং কাশির কারণে প্রতিবছর প্রাণ ঝরতো যথাক্রমে প্রায় ২৬ হাজার এবং ১০ লক্ষ নবজাতকের ধনুষ্টংকার হওয়ার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। ধনুষ্টংকারের ভ্যাকসিনের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৭০ হাজার শিশুর প্রাণ বাচানো সম্ভব হচ্ছে।

আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ত্রাস করোনা এতটা মহামারী ছড়াতে পারছে শুধু ভ্যাকসিনের অভাবে। করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার মত ইমিউন সিস্টেম যদি উৎপন্ন করা যায় ভ্যাকসিনের মাধ্যমে তাহলে বিলুপ্ত হয়ে যাবে করোনা ভাইরাস। তাইতো পুরো পৃথিবী চোখ মেলে রয়েছে এখন বিজ্ঞানীমহলের দিকে,কবে তৈরি হবে করোনার ভ্যাকসিন?

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

ভ্যাকসিন সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত করেই বাজারজাত করা হয়। তবুও দুঃখজনক ব্যাপার হলো জ্ঞানগড়িমায় অগ্রসর দেশগুলোতেই ভ্যাকসিন নিয়ে রয়েছে নানা মিথ। ভিত্তিহীন সব গুজবের কারণে মা-বাবা তাদের আদরের সন্তানকে টিকা দিতে চাননা। ইংল্যান্ডে ২০১৭-১৮ সালে মাত্র ৯১.২ শতাংশ শিশুকে এমএমআর টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছিলো। বাকীরা রয়ে যাচ্ছে অসুরক্ষিত।

ভ্যাকসিন তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। জীবাণুদের বুঝতে পারার চেয়েও কঠিন কাজ নিজেদের ইমিউন সিস্টেমকে বুঝতে পারা। কীভাবে অ্যান্টিবডি তৈরি হবে,কখন কার বিরুদ্ধে কীভাবে কাজ করছে সিস্টেম,সেটা বুঝতেই কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। আমরা যতবেশি নিজের সিস্টেম সম্পর্কে জানতে পারবো, তত বেশি জীবাণুদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here