যেভাবে লিডারশীপ বা নেতৃত্ব অর্জন করবেন

ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে অথবা নেতা হতে গেলে লিডারশীপ বা নেতৃত্ব অর্জনের দিকে আমাদের অনেক বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বাস্তবিক জ্ঞান এবং পূর্বের অভিজ্ঞতা কর্ম ক্ষেত্রে আপনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। কিন্তু নেতৃত্ব আপনাকে কর্মক্ষেত্রের সর্বোচ্চ অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকবে যা অন্য কোনো দক্ষতা দিয়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। চাকরি জীবনে অথবা অন্যান্য বিভিন্ন কাজে আপনি যদি দ্রুত পদোন্নতি পেতে চান, তাহলে লিডারশীপ অর্জনের বিকল্প কোনো পথ নেই।

আজ আমরা জানবো কিভাবে নিজের এই দক্ষতাকে আমরা বহুগুণে বৃদ্ধি করতে পারি।

১. উদ্যোগ গ্রহণ করুন

কর্ম ক্ষেত্রে আপনার চেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেকোনো কাজ আপনাকে শুধু মাত্র কোনো রকমে বুঝিয়ে দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করবে। আপনাকে এই কাজগুলো নিজে নিজে ভালোভাবে বুঝে নিয়ে অন্য সবাইকেও বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। যখন ১০ জনের মধ্যে আপনি উৎসাহিত হয়ে এই কাজগুলো অন্যদের বুঝিয়ে দিবেন তখন অন্যরা সবাই আপনাকে তাদের নেতা মানতে দ্বিধা বোধ করবে না। আপনি সমাজে দেখে থাকবেন, যে মানুষগুলো অন্যের অনেক কাজ করে দেয় তাদেরকে মানুষ আরও বেশি দায়িত্ব দিয়ে থাকে। আর দেখা যায়, এরাই শেষপর্যন্ত এলাকার নেতায় পরিণত হয়।

তাই যেকোনো কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করতে কখনো পিছপা হবেন না এবং দেরি না করে যথাসম্ভব সবাইকে নিয়ে শুরু করুন।

২. জটিল ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা করতে শিখুন

আপনার অফিসের কাজে যদি নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে চান তাহলে আপনার জটিল ও সৃজনশীল চিন্তাভাবনা বাড়াতে হবে। কর্তৃপক্ষ যখন কোনো কাজ নিয়ে কথা বলতে যাবে তখন সেটা সম্পর্কে আপনার মতামত প্রদান করুন। ভালো লিডাররা যে কোনো কিছু সম্পর্কে ভবিষ্যৎ সমস্যা গুলো খুব সহজেই তুলে ধরতে পারে। সেইসাথে সেগুলো সমাধানের পথ বের করে ফেলে। আপনি ব্যবহারিকভাবে এই বিষয়টি আপনার কর্ম ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে দেখতে পারেন।

কোনো কাজে আপনি যদি সেগুলোর সমস্যা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন তাহলে দেখবেন পরবর্তীতে যেকোনো কাজের সময় আপনার বস আপনার সাথে আগে কথা বলে নিবে।

৩. জীবনে সুশৃঙ্খল থাকুন

ভালো কোনো নেতা হতে গেলে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করা আপনার পথটাকে অনেক সহজ করে দেবে। এছাড়াও আপনার পেশাগত জীবনে যদি সময়ের কাজ সময়ে ঠিকঠাকভাবে করতে পারেন তাহলে আপনি হয়ে উঠবেন অন্যদের জন্য আদর্শ। আপনি কতটা সক্ষমতা রাখেন সেটা যাচাই করা হয় আপনার কাজ এবং জীবন যাপনের মাধ্যমে। ঠিক সময়ে প্রজেক্ট হস্তান্তর করা কিংবা অফিসের মিটিং এ যোগদান করা ইত্যাদি কাজগুলো আপনার কর্ম জীবনের জন্য অপরিহার্য। কাজ করতে তো সবাই পারে। কিন্তু এই সকল গুণাবলীর মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হবেন।

তাই এই কাজগুলো অফিসে প্রয়োগ করার আগে নিজের ব্যক্তিগত জীবনে চর্চা করার চেষ্টা করুন। নিয়মিত সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে প্রার্থনা করুন এবং শরীর চর্চা করার অভ্যাস করুন। এই দুইটি জিনিস আপনাকে সময়ের কাজ সময়ে করতে অনেক বেশি সাহায্য করবে।

৪. অন্যকে মেনে নিন

সত্যিকারের নেতারা যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব মেনে নিতে দ্বিধা বোধ করে না। কোনো কাজে আপনার চেয়ে কেউ যদি বেশি যোগ্য হয়ে থাকে তাহলে জায়গাটি আপনি তাকে ছেড়ে দিন। তার প্রতি হিংসাত্মক মনোভাব প্রকাশ না করে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন তার কাছ থেকে। মনে রাখতে হবে যে, একজন লিডারের মন কখনও লিডার না হতে পারার কারণে আফসোস করে না। তাই, সবসময় অন্যদের কাছ থেকেও নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন।

৫. পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকুন

নেতা হতে গেলে আপনাকে সব ধরনের পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যারা বড় কোনো কাজে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন তাদের সেই স্থানে পৌঁছানোর অন্যতম একটি কারণ হলো পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ। এই ধরনের গুণাবলী আপনাকে বিভিন্ন সুযোগ খুঁজে পেতে এবং সেগুলো সদ্ব্যবহার করতে সাহায্য করে থাকবে। এছাড়া যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সাধারণ কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

৬. অন্যদের উৎসাহিত করুন

অন্যদেরকে পথ দেখানো ও দিক নির্দেশনার মাধ্যমে লিডারশীপ গড়ে উঠে

দলনেতা সবসময় কাজের দক্ষতা দিয়ে নির্ধারিত করা হয় না। যদি তাই হতো তাহলে বিশ্বের বিভিন্ন ক্রিকেট দলের অধিনায়ক একমাত্র ভালো খেলোয়াড়দেরকেই করা হতো। কিন্তু সেটা না করে অধিনায়কত্ব দেবার পূর্বে দেখা হয় অন্যান্য খেলোয়াড়দের সাথে তাদের সম্পর্কটাকে। আপনি মহেন্দ্র সিং ধোনির দিকে তাকালে দেখতে পাবেন, তিনি খেলা চলাকালীন সময়ে অন্যান্য খেলোয়াড়দের কে কতটা উৎসাহিত করে থাকেন। তার চেয়ে অনেক ভাল খেলোয়ার ভারতের ক্রিকেট দলে রয়েছে। কিন্তু সবাইকে এক লাইনে দাঁড় করানোর ক্ষমতা থাকার কারণে মহেন্দ্র সিং ধোনি এখন পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেট দলের অন্যতম একজন অধিনায়ক হয়ে আছেন। তাই একজন ভালো নেতা হতে গেলে দলের অন্যান্য সদস্যদের সবসময় উৎসাহিত করতে হবে এবং তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

৭. অন্যদের থেকে শিখুন

কোনো দলের নেতা হয়ে আপনি যদি নিজেকে সবজান্তা হিসেবে সবার কাছে উপস্থাপন করতে চান তাহলে একটা সময়ে গিয়ে সবাই আপনার প্রতি অন্যরা বিরক্তি প্রকাশ করবে। আপনি যদি দলের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে সবসময় বিভিন্ন শিক্ষা গ্রহণ করার পাশাপাশি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে থাকেন তাহলে কেউই আপনাকে ছোট করে দেখবে না বরং তারা আপনাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সম্মান প্রদর্শন করবে। আপনার অন্যদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ তাদের জন্য আদর্শ হয়ে দাঁড়াবে।

৮. বিরোধিতার অবসান করুন

আপনি ২০ জন মানুষের নেতা হয়ে থাকলে সেখানে কিছু মানুষের মধ্যে বিরোধিতা থাকবে এর কোনো সন্দেহ নেই। সে বিরোধিতা হতে পারে আপনার সাথে অথবা অন্যদের সাথে অন্যদের। আপনি যখন সেই বিরোধিতা গুলোর অবসান করতে পারবেন তখন আপনার প্রতি দলের অন্যান্য সকলের সম্মান অনেক বেড়ে যাবে। আপনি সবচেয়ে বেশি সম্মান পেয়ে থাকবেন সেই মানুষগুলোর কাছে যাদের এতদিন ধরে চলে আসা বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের অবসান করতে পেরেছেন।

৯. অন্যান্যদের শক্তিশালী করে তুলুন

দলের কোনো একজন মানুষ যদি দুর্বল অবস্থায় পড়ে থাকে, তাহলে সেই দায় বর্তাবে সবার উপরে। সেক্ষেত্রে একজন নেতা হিসেবে আপনার ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না। তাই সকলকে তাদের অবস্থা অনুযায়ী সামর্থ্যবান করে তুলুন। এতে করে কারও মনে কখনও দুর্বলতা আসবে না এবং আপনার প্রতিও কখনও কেউ অভিযোগ তুলতে পারবে না। দলনেতা হিসেবে শুধু নিজের অবস্থানের পরিবর্তন করা আপনার কাজ নয়, বরং সবাইকে নিয়ে একসাথে সবার অবস্থানের পরিবর্তন করা আপনার দায়িত্ব এবং কর্তব্যের শামিল। তাই নিজের অবস্থানের পরিবর্তনের পাশাপাশি অন্যান্যদের অবস্থান পরিবর্তন করতে সচেষ্ট হন।

১০. অন্যদের বুঝুন

নেতা মানেই যে সকলেই শুধু আপনার কথা শুনবে বিষয়টা এমন নয়। একজন লিডার অবশ্যই অন্যান্য সকলের কথা মনোযোগ সহকারে শুনবে এবং সেগুলো বোঝার চেষ্টা করবে। নেতার কাজ মানুষের ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া নয় বরং তাদের কথা শুনে এবং তাদেরকে বুঝে সেই অনুযায়ী তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া। তবে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, শুধু বলা কথার মাধ্যমেই অন্যদেরকে বোঝা সম্ভব নয় বরং তাদের সেই কথাগুলো বুঝতে হবে যেগুলো তারা বলতে পারে না। তাই সব সময় অন্যদের বোঝার চেষ্টা করুন।

১১. সঠিক সিদ্ধান্ত নিন

সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা নেতৃতের অন্যতম একটি অংশ। তাই সকলের সাথে মিলেমিশে থেকে তাদের সমস্যাগুলো বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা অর্জন করুন। এমনকি আপনি যদি আপনার অফিসের কাজেও কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে আপনাকে কখনও পেছন ফিরে তাকাতে হবে না।

নেতৃত্ব মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণাবলী যা লাখ লাখ মানুষের মধ্যে হয়তো এক থেকে দুইজন অর্জন করতে পারে। নেতৃত্ব শুধু সামাজিক জীবনে নয় বরং আপনাকে আপনার কর্মজীবনেও সর্বোচ্চ সাফল্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই উপরের বিষয়গুলি মাথায় রেখে জীবন যাপন করলে আশা করা যায় একজন ভালো নেতৃত্ব দানকারী মানুষ হবার পথে কোনো বাঁধা থাকবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here