যে দেশে রমজান যেমন

সারা বছর ধরে মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা অপেক্ষায় থাকেন রমজান মাসের। পবিত্র ও শান্তিময় একটি মাস। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা নানান আয়োজন এবং উদযাপনে বরণ করে নেন প্রতীক্ষিত এই মাসটিকে। এই মাসে ইফতার, যাকাত আদায়ের মতো ফরজগুলো পালন ছাড়াও বিভিন্ন দেশে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে ঐতিহ্যবাহী সব রীতিনীতি। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে রমজান মাসের এমনই কিছু জানা-অজানা ঐতিহ্য নিয়ে আজকের এই লেখাটি। এর মধ্যে কোন ঐতিহ্যটি ভালো লাগলো তা জানাবেন।

পরিচ্ছন্নতায় পরিশুদ্ধি, ইন্দোনেশিয়া

রমজান শুরুর আগের দিন পুরো ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকরা গোসল করার বেশ পুরনো ঐতিহ্য পালন করে থাকেন। রমজানের চাঁদ দেখার কাজ সেরে নেওয়ার ঠিক পরপরই ইন্দোনেশিয়ার বাসিন্দারা পরিষ্কার হয়ে গোসল করেন। কিছু কিছু জায়গায় এই নিয়মের হালকা হেরফের হলেও জাভা, অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব ও মধ্য দিকের অঞ্চলে এই গোসল করার নিয়মটি সাংস্কৃতিকভাবে মূল্যবোধের মতোই বিবেচনা করা হয়। এই রীতিটি ‘পাদুসান’ নামে পরিচিত। এই নিয়মটি ওয়ালি সাঙ্গাদের সময় থেকে চলে আসছে যাকে মূলত পবিত্র রমজান মাসে শুরুর আগে শরীর, মন ও আত্মার পরিশুদ্ধির উপায় হিসেবে মানা হয়। আগে এই রীতিটি ঝর্নার পানিতে গোসল করা প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে সবাই নিজেদের বাসাতেই ‘পাদুসান’ এর নিয়ম পালন করে থাকেন।

ঢোল পিটিয়ে সেহ্‌রিতে উঠানো, তুর্কি

অটোম্যান সাম্রাজ্য থেকে শুরু করে আজ অবধি সেহ্‌রিতে ঢোল পিটিয়ে সবাইকে জেগে ওঠার নিয়ম চলে আসছে তুর্কিতে। বিংশ শতাব্দীর এই সময়ে অ্যালার্ম ঘড়ি থাকা সত্বেও রমজান মাসে তুর্কির রাস্তায় ২০০০ এরও বেশি মানুষ ঢোল পিটিয়ে সেহ্‌রিতে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। স্থানীয় সম্প্রদায়ের লোকজন মিলেই রমজান মাসে এই রীতিটি পালন করে থাকেন। যারা ঢোল বাজান, তারা ঐতিহ্যবাহী অটোম্যান পোশাক পরে থাকেন। দাভুল (তুর্কির বিশেষ ধরনের ঢোল) বাজিয়ে সেহ্‌রিতে ডেকে তোলার জন্য তুর্কি নাগরিকরা তাদের বাহ্‌শিস (বকশিস) দিয়ে থাকেন এমনকি তাদের সাথে সেহ্‌রি খাওয়ার দাওয়াতও দেন। বর্তমানে তুর্কিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢোল পিটিয়ে সেহ্‌রিতে জেগে তোলা ব্যক্তিদের জন্য মেম্বারশিপ কার্ড দেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছে যাতে করে তারা এই কাজের জন্য সম্মানিতবোধ করেন। এছাড়াও পুরনো এই ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মও যেন উদ্বুদ্ধ হয় সেজন্যই এই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে।

ঢোল পিটিয়ে সেহরির জন্য ডাকা হচ্ছে

রমা মুসলিমদের বাল্লাদ, আলবেনিয়া

রমা মুসলিমরা হলেন রোমানি যারা হানাফি মাযহাব এর সুন্নি ইসলাম অবলম্বন করেন এবং ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেন। বহু শতাব্দী ধরে,  অটোম্যান সাম্রাজ্যের সময় থেকে রমা মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা সেহ্‌রি এবং ইফতার শুরুর আগে ঐতিহ্যবাহী গান গেয়ে সবাইকে জানান দেন। রমজান মাসে প্রতিদিন তারা রাস্তায় রাস্তায় লোদ্রা (শেষের দুই দিকে ভেড়া ও ছাগলের চামড়া দিয়ে বানানো ঢোল) বাজান। মুসলিম পরিবারগুলো রমজান মাসে প্রায়ই ইফতার শুরুর আগে উদযাপন হিসেবে ঐতিহ্যবাহী বাল্লাদ আয়োজন করার জন্য তাদের ঘরে নিমন্ত্রণ দেন।

রঙিন ফানুসে রমজান উদযাপন, মিশর

প্রতি বছর রমজান মাসে মিশরীয়রা এই পবিত্র মাসের ঐক্য এবং আনন্দের প্রতীক হিসেবে রঙ বেরঙের ফানুস দিয়ে পুরো শহর সাজায়। মিশরের নাগরিকদের কাছে এই ঐতিহ্যটি বেশ আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ। শত বছর পুরনো এই ফানুস ঝুলানোর ঐতিহ্য শুরু হয়েছিলো ৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে। মিশরে খলিফা আল-মুয়িজ লি-দ্বীন-কে রমজানের প্রথম দিনে স্বাগতম জানাতে সেখানকার সৈন্যসদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে এক্তি করে মোমবাতি দিয়ে আলোকসজ্জার আয়োজন করেছিলেন। ফানুসগুলো যেন নিভে না যায় তাই কাঠের একটি ফ্রেমে মোমবাতি রাখা হয়েছিলো।  সেই আলোকসজ্জা খলিফার এতোই ভালো লেগেছিলো যে তিনি বাণিজ্যিকভাবে এই গড়নের আলোকসজ্জা তৈরি করে পুরো মিশরে এর প্রসার ঘটানোর নির্দেশ দেন। সেখান থেকেই ওই আলোকসজ্জার আদলে তৈরি হয় ফানুস। এছাড়াও তিনি বলেছিলেন মিশরের বাসিন্দারা যেন সকলে তাদের ঘরের সামন ফানুস ঝুলায়। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত ফানুস ঝুলানোর এই সংস্কৃতি রক্ষা করে আসছেন মিশরীয়রা।

ঘরে ঘরে রঙের ছোঁয়া; যোয়াকা, মরক্কো

উত্তর আফ্রিকার সুনিপুণ কারিগরি খ্যাত দেশ মরক্কোতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ আগে থেকেই রমজান মাস উদযাপনের আয়োজন শুরু হয়ে যায়। বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং পুরো বাড়ি নতুনভাবে রঙ করে তারা রমজান মাসকে স্বাগতম জানান। যোয়াকা, মরক্কোতে রমজান আগমনের খবর ও ইফতারের সময় জানান দেওয়ার একটি ঐতিহ্য। উচ্চ শব্দে সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য ঘোষণা দেওয়া হয় যোয়াকার মাধ্যমে। রমজান মাসে খবর জানাতে সাতবার আর প্রতিদিন শহরের সীমান্ত থেকে সেনাবাহিনী কামান দিয়ে ইফাতেরর সময় জানানোর পর একবার যোয়াকা বাজানো হয়।

রমজান মাসে শিশুদের আয়োজন; কারকিয়া’ন, কুয়েত

রমজান মাস, কুরআন নাযিলের এই মাসটি মুসলিম সম্প্রদায় আন্তরিক ভালোবাসায় এবং আধ্যাত্মিক মহিমায় পালন করে থাকে নানান ঐতিহ্যবাহী আয়োজন। কুয়েতে রমজানের মাঝামাঝি সময়ে শিশুদের নিয়ে তিন দিনব্যাপী আয়োজন করা হয় কারকিয়া’ন। এই আয়োজনের তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নানান রকম গান গায়। ছেলে এবং মেয়ে শিশুদের গানগুলো আলাদা হয়ে থাকে। তবে যার জন্য গান গাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে প্রত্যেকের গানে শব্দের কিছুটা ভিন্নতা থাকে। এই গানের জন্য শিশুদের উপহার হিসেবে চকলেট এবং মিষ্টি দেওয়া হয়। অনেকের মতে এই কারকিয়া’ন মূলত ফাতিমা (রাঃ) রমজান মাসের দুই সপ্তাহ মিষ্টি বিতরণ করতেন সেই বিষয়ের ওপর ভিত্তি করেই আয়োজন করাআ হয়।

সামাজিকতায় সংস্কৃতি রক্ষা, কোমরোস

সমাজের সবাই আত্মিকভাবে, একতাবদ্ধভাবে থাকবে-এই শিক্ষাই উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির রমজান মাসে বছর পুরানো ঐতিহ্য। ফজরের আজান দেওয়ার ঠিক পরেই কোমরোসের মানুষজন একত্রিত হয় ‘বানগাওয়ি’ নামক একটি জায়গায়। এই জায়গাটিতে মূলত জনগনের সমাগম বেশি হয়ে থাকে। এখানে সবাই একসাথে জড়ো হয়ে একসাথে মসজিদে যায়। সেখানে গিয়ে সবাই একত্রে বসে খেজুর ও কফি খায়। এরপর নামাজ শেষ হয়ে গেলে সবাই নিজেদের বাড়িতে চলে যায়।

কবিতার পসরা; রাইভারু, মালদ্বীপ

চারিদিকে দ্বীপ বিশিষ্ট এই দেশটিতে রমজান মাসে আয়োজন করা হয় বিশেষ ধরনের কবিতার আয়োজন যা ‘রাইভারু’ নামে পরিচিত। এই কবিতায় তাহকে রমজান মাস সম্পর্কিত নানান ধরনের তথ্য ও কথা। ব্যতিক্রমধর্মী সুরে আবৃত্তি করা এই কবিতাগুলো তিন অথবা তার চাইতে বেশি লাইনের হয়। বহু আগে থেকেই মালদ্বীপে ‘রাইভারু’ এর প্রচলন চলে আসছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here