সাইকেলের ইতিকথা

সাত সকালে কিংবা বিকালে শুনশান রাস্তায়, কোথাও ঘুরতে সাইকেলের জুড়ি নেই। সাইকেলপ্রেমীরা তাই যখনই সুযোগ পায় সাইকেল চালায়। ছোট বেলায় সাইকেল চালাতে গিয়ে কয়বার পড়েছিলেন, মনে আছে কী? আমার মত অনেকেরই নানা স্মৃতি এই সাইকেলের সাথে জুড়ে রয়েছে। আর তাই এই সাইকেলের ইতিহাস আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। আজ আমরা জানতে পারবো সময়ের সাথে সাথে সাইকেলের জন্মকথা।

খ্রীস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ১৭০০ পর্যন্ত

পৃথিবীতে সাইকেল জন্মের আগে এসেছিল চাকা। আজ আমরা রাস্তায় যে যানবাহন দেখি না কেন তার সাথে সম্পর্কযুক্ত এই গোল চাকা। এই গোল চাকা আবিষ্কারের সাথে সাথে মানুষের পরিবহন যাত্রা বদলে যায়। চলাচলের পথ নিয়ে বদলে যায় মানুষের চিন্তাভাবনা। একটি সাইকেলের চাকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই। তাই, আমাদেরকে সাইকেল জানার আগে এর চাকার ব্যাপারটিও জানতে হবে। ইতিহাসবিদরা সাধারণত একমত হন যে, চাকার উদ্ভব মেসোপটেমিয়ায় খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ সালের দিকে হয়েছিল। প্রথমদিকের চাকাগুলি গাড়ীর সাথে সংযুক্ত করে বিভিন্ন প্রাণীদের দ্বারা চালনা করা হতো। শিল্প বিপ্লবের সাথে সাথে মানুষ চাকাযুক্ত যানবাহনগুলোকে আরও ব্যবহারিক করে তোলার জন্য চেষ্টা করতে থাকে।

চিত্রঃ আগেকার চাকা; image source: maxpixel

৫০০ খ্রিস্টপূর্ব

২০১০ সালে এক চীনা ইতিহাসবিদ একটি আবিষ্কার করেছিলেন। তিনি তার তথ্য উপাত্ত নিয়ে দাবি করেন, সম্ভবত ২৫০০ বছর আগে একজন চীনা উদ্ভাবক লু বান সাইকেল আবিষ্কার করেছিলেন। তার সাইকেলের ছিল ৩টি চাকা এবং প্যাডেল। এটি ছিল অনেক বড়। লু বান এর সাইকেলকে আমরা ট্রাই সাইকেলও বলতে পারি। তবে এখন পর্যন্ত অনেক ইতিহাসবিদের কাছে এই আবিষ্কার স্বীকৃত হয়নি।

রোমান সাম্রাজ্যের সময়কালীন

রোমানরা প্রথম জাতি যারা বর্তমানের আধুনিক রাস্তার মূল কারিগর। চাকা আবিষ্কার ও তার ব্যবহারের সাথে দরকার ছিল ভালো রাস্তা। রোমানরা প্রথম এটি বুঝতে পেরেছিল। তাই, তারা পাকা রাস্তাগুলি আরো বৃহত্তর আকারে বানানো শুরু করে। বহু শতাব্দী ধরে রাস্তার প্রযুক্তি উন্নতির সাথে সাথে চাকার ব্যবহার প্রশস্ত হওয়া শুরু করে।

চিত্রঃ রোমানদের রাস্তা নির্মাণ; image source: FHWA/Wikimedia Commons

১৫৩৪ সাল

কিছুদিন ধরেই এই নিয়ে বিতর্ক চলছে যে গিয়াকোমো ক্যাপ্রোটি (লিওনার্দো দা ভিঞ্চির ছাত্র) সম্ভবত ১৫৩৪ সালে সাইকেলের স্কেচ তৈরি করেছিলেন। অনেক প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যেমন এই প্রমাণের সত্যতাটিকে নকল হিসাবে পরামর্শ দিয়েছেন তেমনি অনেকে এর বৈধতা স্বীকার করেছেন।

১৭৯০ সাল

চিত্রঃ ১৭৯০ সালের সাইকেলের মডেল; image source: Legendre/Wikimedia Commons

বলা হয় যে, এই সাইকেলটির কোনো স্টিয়ারিং ছিল না, কোনো প্যাডেলও ছিল না তবে এটি ছিল সাইকেলের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। কাহিনী অনুসারে, এর চার চাকা ছিল (যদিও কোনো কোনো ইতিহাসবিদ কেবল দুচাকার কথা বলেছেন) এবং একটি আসন ছিল। চালকরা তাদের পা দিয়ে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে খুব অল্প দূরত্বে চালাতে পারতো।

১৮১৭ সাল

এই সাইকেলকে বলা হতো “রানিং মেশিন” বা “শখের ঘোড়া”। এটি আবিষ্কার করেছিলেন জার্মান আবিষ্কারক ব্যারন কার্ল ভন ড্রাইস। যদিও আধুনিক সাইকেলগুলির সাথে তুলনা করলে এটি সাইকেল হিসেবে অচেনা হতে পারে। এই সাইকেল চালানোর জন্যে বসেই পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে চলতে হতো। সামনের চাকার দিকে একটি হ্যান্ডেলবারও ছিল। ঐসময় ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের বেশ কয়েকটি নির্মাতারা তাদের নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছিল।

চিত্রঃ শখের ঘোড়া; image source: Wikimedia Commons

 ১৮৩৯ সাল

প্রমাণ রয়েছে যে, স্কটিশ কামার কিরকপ্যাট্রিক ম্যাকমিলান সম্ভবত প্রথম যান্ত্রিকভাবে চালিত দ্বি-চাকাযুক্ত গাড়িটি তৈরি করতে পেরেছিলেন। এই সাইকেলের বসার সিটটি ছিল নিচু। বসতে কিছুটা কষ্ট হতো। পেছনের চাকা সামনের চাকার তুলনায় ছিল বড়।

১৮৬০ সাল

এই সাইকেলটির নাম ছিল ভেলোসিপিড যা একটি দ্বি-চাকাযুক্ত সাইকেল। যার সম্মুখ চাকায় প্যাডাল এবং ক্র্যাঙ্ক ছিল। সাইকেলটির ধাতব টায়ার কাঠের ফ্রেমের সংমিশ্রণে গঠিত যা বাঁকা রাস্তায় খুব অস্বস্তিকর ছিল। এই সাইকেলে আপনি চালালে আপনার পুরো শরীর কাঁপতে থাকবে। এই কারণে এই সাইকেলটি “Bone shaker” ডাকনাম অর্জন করে।

চিত্রঃ বোনশেকার সাইকেল; image source: antiques trade gazette

১৮৬০ এর দশকের সময় এটি ফ্রান্সে উদ্ভাবিত হয়েছিল এবং ১৮৬৭-১৮৬৯ এর মধ্যে মাইচাক্স সংস্থা প্রথম বাজারজাত শুরু করেছিল।

১৮৭০ সাল

“বোনশেকার” এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউগেন মায়ার ডিজাইনের উন্নতি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই সাইকেলটির সামনের চাকাটি ছিল বেঢপ বড় আর পেছনের চাকা ছিল খুব ছোট। সামনের বড় চাকার উপর বসে চালাতে হতো। প্যাডেল ও হ্যান্ডেলার ছিল সামনের চাকায়। আগেকার সাইকেলের তুলনায় এই সাইকেল নিয়ন্ত্রণ কিছুটা সহজ ছিল। এটিই  প্রথম মডেল সাইকেল যা বাইসাইকেল হিসাবে পরিচিতি পায় এবং ১৮৭০ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে খুব জনপ্রিয় ছিল। এই সাইকেলের ছিল রাবারের টায়ার, যা চালককে পূর্বের চেয়ে বেশি আরাম দিতো।

চিত্রঃ ইউগেন মায়ারের ডিজাইন করা সাইকেল; image source: Wikimedia Commons

১৮৭৬ সাল

১৮৭৬ ​​সালে একজন ইংরেজ হ্যারি জন লসন এই বিপ্লবী সাইকেলটি আবিষ্কার করেছিলেন যা আধুনিক সাইকেলের রূপ বলা হয়। এই বাইকটিতে তিনি একটি শক্তিশালী ধাতব চেইন দেন যার সাথে যুক্ত করেন দুটি প্যাডেল ও দুটি চাকা। বলা যায় তখন সত্যিকারের সাইকেলের জন্ম হয়। সমসাময়িকদের তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি দামের কারণে লসনের এই মডেলটি বাজার ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল। পরে আরেক ইংরেজ জন কেম্প স্টারলি প্রথম বাণিজ্যিকভাবে মডেলটির সফল সংস্করণ “রোভার” তৈরি করেন। পূর্বসূরীদের তুলনায় এই সাইকেলগুলি প্রথম দিকের সাইকেলগুলোর তুলনায় অধিক সুরক্ষিত ছিল । এটিতে সরাসরি স্টিয়ারিং যুক্ত ছিল বলে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

চিত্রঃ রোভার সাইকেল; image source: Kolossos/Wikimedia Commons

১৮৮৮ সাল

১৮৮৮ সালে জন আইরিশ উদ্ভাবক জন বয় ডানলপ বিদ্যমান শক্ত-রাবারের টায়ারের পরিবর্তে রাবারের টায়ারে বায়ু ভরাট করার ধারণাটি নিয়ে এসেছিলেন। এই উদ্ভাবকের ধারণাটি আসে তার ছেলের জন্য। তার ছেলের একবার ভারী সর্দি হয়। একজন ডাক্তার তাঁর এই ভারী সর্দি কাটাতে তার ছেলেকে সাইক্লিং করতে বলেছিলেন। ডানলপ লক্ষ্য করলেন যে, তার ছেলেকে খুব অস্বস্তির সাথে সাইকেল চালাতে হতো। তিনি তার ছেলের সাইকেল চালানোটা কিছুটা সহজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি সাইকেলটিতে বায়ু ভর্তি রাবারের সাথে তৈরি টায়ারে লাগালেন। তার ছেলেকে এবার এই টায়ারের সাইকেল চালাতে বললেন। এরপর ছেলের সাইক্লিং দেখে বুঝতে পারলেন তিনি কী সাফল্য রচনা করেছেন। তাই, তিনি দ্রুত এটি পেটেন্ট করেন। তার আবিষ্কারটি শীঘ্রই বিখ্যাত সাইক্লিস্ট উইলি হিউমের সহায়তায় আসে। যারাই সেই সময়ের রেসিং ইভেন্টগুলিতে ডানলপের এই টায়ার গ্রহণ করে এবং তারাই প্রথম হয়ে যায়। বাকিটা ইতিহাস…

চিত্রঃ ডানলপের বায়ু ব্যবহৃত টায়ার; image source: Geni/Wikimedia Commons

১৮৯০ থেকে আজ

বিংশ শতাব্দীতে সাইকেলের নকশাগুলিতে আক্ষরিক অর্থে বিস্ফোরণ ঘটেছিল। সাইকেল এর সাসপেনশন থেকে শুরু করে টায়ার ডিজাইনের উন্নতিও করা হয়েছিল। সাইকেলগুলি আরও হালকা এবং শক্তিশালী হওয়ার সাথেসাথে নকশায় হয়ে উঠেছিল আকর্ষণীয়। এখনকার দিকের সাইকেলগুলি অনেক ক্যাটাগরির দেখা যায়। পাহাড় পর্বতের জন্য যেমন একধরনের সাইকেল তেমনি রেসিং এর জন্য আরেক রকম। বিভিন্ন দেশে সাইকেলের জন্য আলাদা রাস্তাও রয়েছে। আশা করা যায়, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সাইকেলের আরও পরিবর্তন হবে।

চিত্রঃ ইলেকট্রিক বাই সাইকেল; image source: Ensey Motorized Bikes

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here