হিটলারের ইহুদি বিদ্বেষ, নির্মম অত্যাচার ও গণহত্যা

     পৃথিবীর ইতিহাসে যেসকল মানুষ তার অপকর্মের জন্য কুখ্যাত তাদের মাঝে একজন হলো এডলফ হিটলার। হিটলারের সব অপকর্মের মাঝে অন্যতম একটি হচ্ছে ইহুদি গণহত্যা বা হলোকাস্ট। হিটলারের নেতৃত্বে প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করে নাৎসী বাহিনী। এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, জিপসি/যাযাবর, শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী, সমকামী, কমিউনিস্ট, পোল্যান্ডবাসী, সোভিয়েত যুদ্ধে বন্দীরা নাৎসী বাহিনীর ঘৃণ্য নৃশংসতার শিকার হয়। তবে প্রাইমারি ভিকটিম ছিল মূলত ইহুদিরা।

       প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হিটলার একজন সৈনিক হিসেবে যোগাদান করে। যুদ্ধে তার বীরত্ব প্রকাশ পেলেও পদন্নতি হয়নি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেশে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর গোয়ান্দাগিরি করার জন্য কর্তৃপক্ষ হিটলারকে নিযুক্ত করে। সেই সময়ের প্রধান রাজনৈতিক দল লেবার পার্টির সদস্য হয় হিটলার। অল্পসময়ের মাঝেই পার্টিপ্রধান হয়ে যান তিনি এবং দলটির নতুন নাম রাখা হয় ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স পার্টি যা পরবর্তীতে নাৎসী বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। হিটলারের স্পষ্ট মতবাদ ও বলিষ্ঠ মতবাদ জার্মানবাসিদের আকৃষ্ট করে। হিটলার ক্ষমতায় আসার জন্য নানা রকম অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে যায়। জার্মানিদের মনে ইহুদিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের বীজ বপণ করে জনগণের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করে। অবশেষে হিটলার ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে নিযুক্ত হয়। হিটলার ক্ষমতায় আসার পর  ইহুদিদের নিজের দেশ থেকে বিতাড়িত করার জন্য নানা নিয়ম নীতি ও আইন প্রতিষ্ঠা করেন। 

      ইহুদিদের প্রতি হিটলারের বিদ্বেষের কারণ কি ছিল তা নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। তৎকালীন সময়ে জার্মানির সব বড় বড় কলকারখানার মালিক ছিল ইহুদিরা। জার্মানির অর্থনীতি মূলত ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। ইহুদিরা জার্মানে বসবাস করে জার্মানবাসীর ওপর প্রভুত্ব করবে তা হিটলার কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। যার ফলে তার মনে ইহুদিদের প্রতি একপ্রকার ঘৃণা ও বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়। অন্য এক সূত্র থেকে জানা যায় , ছোটবেলায় হিটলার ছবি আঁকতে খুব ভালবাসতেন। তার খুব ইচ্ছে ছিল আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার। কিন্তু সেই আর্ট স্কুল থেকে তাকে বার বার প্রত্যাখান করা হয়। কারণ সেই আর্ট স্কুলের রেকটর ছিলেন একজন ইহুদি এবং সেই স্কুল ইহুদি ছাত্ররার মূলত প্রাধান্য পেত।

     ১৯০৭ সালে একজন ইহুদি ডক্টর এডওয়ার্ড ব্লোচ এর অধীনে চিকিৎসারত অবস্থায় হিটলারের মা মারা জান। তাই অনেকে ধারণা করে থাকেন ইহুদিদের প্রতি হিটলারের বিদ্বেষের এটাও একটা কারণ হতে পারে। তৎকালীন সময়ে, ডারউইন এর তত্ত্ব (survival for the fittest) পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই তত্ত্বের ফলস্বরূপ একপ্রকার উগ্র দেশপ্রেম জাগ্রত হয় বিভিন্ন দেশের নেতাদের মাঝে। ধারণা করা হয়, এই সব কিছু মিলিয়েই হিটলারের মনে ইহুদিদের জন্য বিদ্বেষের সৃষ্টি হয়।

হিটলারের সময় গণহত্যার শিকার অসংখ্য মানুষ। Image: economictimes.indiatimes.com

       

ইহুদি নিধনের জন্য ইহুদিদেরকে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো কনসেন্ট্রেশন  ক্যাম্পে। প্রথমে  কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প গুলো মূলত বানানো হতো রাজনৈতিক বন্দীদের রাখার জন্য। কিন্তু পরবর্তীতে ইহুদীদের ওপর অত্যাচার ও নিধনের জন্য এই ক্যাম্প গুলো ব্যবহার করা হয়। হিটলারের অধীনে নাৎসী বাহিনী জার্মান ছাড়াও পুরো ইউরোপ জুড়ে বানানো হয় প্রায় ৪০,০০০ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ও বন্দী শিবির। ক্যাম্প গুলোর মধ্যে ডাকাউ, মাজদানেক ছিল অন্যতম।

         কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প গুলোতে বন্দীদের ওপর চালানো হতো নির্মম অত্যাচার।  প্রতিদিন হাজার হাজার ইহুদীদের ধরে এনে বন্দী করে রাখা হত। তাদের কে বাধ্য করা হতো কাজ করার জন্য। বন্দীদের খুব সামান্য খাবার প্রদান করা হতো যা বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত নয়। অধিকাংশ কনসেন্ট্রেশন সেলে বন্দীদের পানি প্রদান করা হতো না কারণ এতে করে তাদের বার বার টয়লেটে যেতে হতে পারে আর এর জন্য তাদের কাজের সময় নষ্ট হবে।

      হিটলারের নাৎসী বাহিনীর বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকেরা বন্দীদের ওপর করত নানা রকম অমানবিক পরীক্ষা নিরীক্ষা। কোন প্রকার চেতনানাশক ঔষধ বা ইনজেকশন প্রয়োগ ছাড়াই জীবন্ত অবস্থায় তাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হতো। কতটুকু নিম্ন তাপমাত্রায় একজন মানুষ বেঁচে থাকতে পারে তা নির্ণয়ের জন্য বন্দীদের বরফপূর্ণ চৌবাচ্ছা বা হিমশীতল পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো। অধিকাংশ বন্দী এই প্রক্রিয়ায় মারা যেত। আর ভাগ্যক্রমে যারা বেঁচে যেত তাদের শরীরের তাপমাত্রা কে বৃদ্ধি করার জন্য চলত আরেক দফা নির্যাতন। মানব দেহে বিষের কার্যকারিতা বোঝার জন্য তাদের খাবারে বিষ মিশিয়ে দেওয়া হতো। অনেক বন্দী এসব অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ধলে পড়ত। ডাকাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের ওপর করা হতো ম্যালারিয়া এক্সপেরিমেন্ট।  সুস্থ বন্দীদের শরীরে ম্যালেরিয়ার জীবাণু প্রবেশ করানো হতো এবং তারপর বিভিন্ন প্রকার ঔষধ আবিস্কার করে তা দিয়ে বন্দীদের ওপর পরীক্ষা- নিরীক্ষা চালানো হতো। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে জমজ ইহুদিদের আলাদা করে তাদের একজনের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আলাদা করে অন্য জনের দেহে স্থাপন করা হতো। এমনকি একজনের রক্ত অন্য জনের দেহে সঞ্চালন করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করত।  ভূপৃষ্ঠ থেকে ঠিক কতটুকু উচ্চতায় যাওয়ার পর একজন মানুষ জ্ঞান না হারিয়ে থাকতে পারে তা নির্ণয়ের জন্য ডাকাউ কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় ঝুলিয়ে রাখা হতো। এই পরীক্ষার ফলে অনেক বন্দী প্রাণ হারিয়েছিল আর যারা বেঁচে ছিল তাদের শারীরিক অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল।

আমাদের সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন

    এছাড়াও বন্দীদের ওপর সালফোনামইড পরীক্ষা করার জন্য র‍্যাভেন্সব্রুক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের পায়ের কিছু অংশ কেটে সেখানে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রণ দিয়ে কাটা স্থানটুকু সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হতো। জার্মান চিকিৎসক ডক্টর সিগমুন্ড র‍্যাশার রক্ত জমাট বাধার জন্য পলিগ্যাল নামক একটি ট্যাবলেট আবিষ্কার করেন। ট্যাবলেটি রক্ত জমাট বাধার জন্য আসলেই কার্যকারি কি না তা বোঝার জন্য প্রথমে এই ট্যাবলেট টি বন্দীদের খাওয়ানো হতো। পরবর্তীতে তাদের বুকে, পিঠে বা ঘাড়ে গুলি করা হতো। আগ্নেয় বোমায় ব্যবহৃত ফসফরাস এর কারণে শরীরে ক্ষত সৃষ্টি হয়। আর সেই ক্ষত ভাল করার কার্যকারি ঔষধ আবিস্কারের জন্য বুখেনওয়াল্ড কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দীদের শরীর পুড়িয়ে ঝলসে দেওয়া হত। বন্দীদের লাশ গুলো কে সৎকার না করে অধিকাংশ লাশ পুড়িয়ে ফেলা হতো আর সেই কাজটি ও করা হতো জীবিত বন্দীদের দিয়ে! এছাড়াও তাদের গ্যাস চেম্বারে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত চলে এই নির্মম অত্যাচার ও হত্যাকান্ড। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে  জার্মানের পরাজয়ের পর হিটলার আত্মহত্যা করে। নাৎসী বাহিনী তার ক্ষমতা হারায় এবং অবসান ঘটে নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞের। জীবিত থাকা ইহুদি বন্দীরা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে মুক্তিলাভ করে কিন্তু তারা মানসিক ভাবে একদম ভেঙে পরে। দীর্ঘ সময় পরিবার পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনেকেই তার ঘরবাড়ি পরিবার হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। অনেকে আবার আশ্রয় নেয় শরণার্থী শিবিরে। তারা  পুরোপুরি ভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় যার ফলে ইহুদিদের পরবর্তী প্রজন্মের অবস্থা কিছুটা ভাল হয়ে আসে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here