হেলেন এডামস কেলার

হেলেন কেলার; image source: magforwomen.com

সম্পূর্ণ নামঃ হেলেন এডামস কেলার (Helen Adams Keller)

জন্মঃ ২৭ জুন, ১৮৮০ সাল

পেশাঃ আমেরিকান লেখক, রাজনীতিবিদ এবং প্রভাষক।

বিখ্যাত হওয়ার কারণঃ তিনি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি যিনি কিনা অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.. ডিগ্রি অর্জন করেন।

মৃত্যুঃ ১ জুন, ১৯৬৮ সাল।

শৈশব

হেলেনের জন্ম ১৮৮০ সালের ২৭ জুন উত্তর আমেরিকার টুসকুমবিয়া নামে এক ছোট শহরে। বাবার নাম আর্থার কেলার, মায়ের নাম ক্যাথরিন। আর্থার ছিলেন সামরিক বিভাগের একজন অফিসার। জন্ম সূত্রে সুইডিশ। তার পূর্বপুরুষরা ভাগ্য অন্বেষণে আমেরিকায় এসেছিল। জন্মের সময় হেলেন ছিলেন সুস্থ সবল স্বাভাবিক আর দশটি শিশুর মত। এক বছর বয়সে তার কলকাকলি আর চঞ্চল পদশব্দে সমস্ত ঘর ভরে উঠতো।

দুর্ঘটনা

দেখতে দেখতে এক বছর সাত মাসে পা দিলেন হেলেন। একদিন মা তাকে গোসল করিয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন। মায়ের কোল থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন হেলেন। সাথে সাথে জ্ঞান হারালেন হেলেন। যখন জ্ঞান ফিরল তখন প্রবল জ্বর। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তারা দেখলেন হেলেনের আর জ্বর নেই। হঠাৎ যেমন জ্বর এসেছিল তেমনিভাবেই জ্বর ছেড়ে গিয়েছে। আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠলেন হেলেনের মা-বাবা। তখন তারা কল্পনাও করতে পারেননি তাদের একমাত্র সন্তানের জীবনে ভয়ঙ্কর এক দুর্যোগ নেমে এসেছে।

অল্প কিছুদিন যেতেই অনুভব করলেন, আকস্মিক আসা সেই জ্বর কেড়ে নিয়েছে হেলেনের দৃষ্টিশক্তি আর শ্রবণশক্তি। ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বললেন, পাকস্থলী আর মস্তিষ্কে আঘাত পাওয়ার জন্যই হেলেনের জীবনের এই বিপর্যয়। মেয়ের এই অসহায়তা দেখে বিচলিত হয়ে পড়লেন কেলার দম্পতি। তারা ধরেই নিয়েছিলেন এই মেয়ের জীবনে আর কোনো আশা নেই, আলো নেই; একমাত্র যদি কোনো না অলৌকিক ঘটনা ঘটে।

কিশোরকাল

হেলেন তখন পাঁচ বছর বয়স। চিকিৎসকদের উপর সব বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন হেলেনের পিতা আর্থার। এমন সময় সংবাদ পেলেন গুপ্তবিদ্যায় পারদর্শী এক ব্যক্তি নাকি দুরারোগ্য যেকোনো ব্যাধি সাড়াতে পারেন। হেলেনকে তার কাছে নিয়ে গেলেন আর্থার। গুপ্তবিদ্যার প্রভাব হেলেনের জীবনে কোনো পরিবর্তন হলো না, কিন্তু সেই ভদ্রলোক হেলেনকে লেখাপড়া শেখাবার পরামর্শ দিলেন। তাহলে হয়তো হেলেনের জীবনে পরিবর্তন আসতে পারে।

আর্থার ভেবে পেলেন না তার এই বোবা অন্ধ মেয়েকে কীভাবে লেখাপড়া শেখাবেন। ভাগ্যক্রমে সেই সময় ওয়াশিংটনের বিখ্যাত ডাক্তার আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের সাথে পরিচয় হলো। ডাক্তার বেল তাকে পরামর্শ দিলেন বোস্টনের পার্কিনস ইনস্টিটিউশনের সাথে যোগাযোগ করতে। এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেছিলেন ডাক্তার হো। এখানে অন্ধদের কীভাবে শিক্ষা দেওয়া যায় সেবিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হতো। ডাক্তার হো হেলেনের মতো একটি অন্ধ বোবা মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। স্বামীর সাথে ক্যাথারিনও এই প্রতিষ্ঠানটির সম্বন্ধে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন।

সেই সময়ে হো মারা গিয়েছিলেন। পার্কিনস ইনস্টিটিউশনের নতুন ডিরেক্টর হয়ে এসেছিলেন মাইকেল এ্যাগানোস। তিনি কেলার দম্পতির মুখে হেলেনের সমস্ত কথা শুনে একজন শিক্ষয়িত্রীর উপর তার শিক্ষার ভার দেবার পরামর্শ দিলেন।

জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হলো

একদিন সকালে আলবামা শহরে কেলার পরিবারের বাড়িতে এসে হাজির হলেন একুশ বছরের এক তরুণী মিস অ্যানি সুলিভ্যান ম্যানসফিল্ড। হেলেন কেলারের অন্ধকার জীবনে তিনি নিয়ে এলেন প্রথম আলো। অ্যানির ছেলেবেলা থেকেই দৃষ্টিশক্তি কম ছিল, তাই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো ম্যাসচুসেট প্রতিবন্ধী আশ্রমে। এই সময় অ্যানি পার্কিনস ইনস্টিটিউটের কথা শুনতে পান। পার্কিনস ইনস্টিটিউটে ছয় বছর ছিলেন অ্যানি। কয়েকজন বিখ্যাত ডাক্তার এই প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাদের চিকিৎসায় এবং দুইবার অপারেশনের পর চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টি ফিরে পেলেন নি অ্যানি। অন্ধত্বের নিদারুণ যন্ত্রণার কথা ভেবে অ্যানি স্থির করলেন তিনি অন্ধদের শিক্ষা দেওয়ার কাজেই নিজের জীবনকে উৎসর্গ করবেন। সেদিন ছিল ৩রা মার্চ ১৮৮৭।

প্রতিটি বস্তুর সাথে প্রথমে পরিচয় করাতেন অ্যানি। হেলেন তার স্পর্শ অনুভূতি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করতেন তার উপর লিখতেন সেই বস্তুর নাম। অ্যানি কখনও আবার হেলেনকে দিয়ে বারবার লেখাতেন সেই নাম।

অল্পদিনেই প্রকাশ পেলো হেলেনের অসামান্য প্রতিভা। অ্যানি যা কিছু শেখাতেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তা শিখে নিতেন হেলেন। দুই বেলা আবিস্কৃত বেল পদ্ধতিতে (এই পদ্ধতিতে অন্ধরা পড়াশুনা করে) হেলেন কয়েক বছরের মধ্যে শিখলেন ইংরেজি, ল্যাটিন, গ্রীক, ফরাসী এবং জার্মান ভাষা। আঙুলের স্পর্শের মাধ্যমে তিনি খুব সহজেই নিজের মনোভাব প্রকাশ করতে পারতেন।

দুর্ঘটনার কারণে অন্ধ হলেও সে সব কাজ সুস্থ মানুষের মতো করতে পারতো; image source: Britannica

হেলেনের একজন অনুরাগী ছিলেন বোটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোকাল ফিজিওলজির অধ্যাপক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল (ভাজার বেলই প্রথম হেলেনের বাবাকে পার্কিনস ইনস্টিটিউটের সন্ধান দেন)। হেলেনকে নিজের কন্যার মতো স্নেহ করতেন, তাকে নানাভাবে সাহায্য করতেন।

দেশ ভ্রমণ

ডাক্তার বেলের নেশা ছিল দেশভ্রমণের। হেলেন এবং অ্যানিকে সঙ্গী করে বেরিয়ে পড়লেন ইউরোপে। দেশ ভ্রমণ সমাজ কল্যাণকর কাজের মধ্যেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তার লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই – আমার জীবন কাহিনী  (১৯০৩) (The story of my life), আমার জগৎ (১৯০৮) (The worldlive in), বিশ্বাস রাখ (১৯০৪) (Let us have faith), শিক্ষিকা মিস অ্যানি স্যুলিভান (১৯৫৫) (Teacher Aanie Sullivan); খোলা দরজা  (১৯৫৭) (The open door)

শেষ জীবন

১৯৫০ সালে ৭০ বছর বয়সে পা দিলেন হেলেন কেলার। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। প্যারিসে সেই উপলক্ষে এক বিরাট সংবর্ধনার আয়োজন করা হলো। দেশ-বিদেশ থেকে সাংবাদিকের দল এসে ভিড় করলো প্যারিসে। সকলেই ভেবেছিল তিনি বোধ হয় এই কর্মময় জীবন থেকে ছুটি নেবেন। কিন্তু হেলেন কেলার ছিলেন এক অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। সেবা আর কর্মের মাঝেই একাত্ম হয়েছে তার জীবন। ১লা জুন ১৯৬৮ সালে যখন তিনি মারা গেলেন তখনও তিনি ছিলেন কর্মরত।

পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও হেলেন কেলার আজও পৃথিবীর সমস্ত অন্ধ, বিকলাঙ্গ পঙ্গু মানুষের কাছে এক প্রেরণা আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন জীবনের দৃাষ্টান্ত খুবই বিরল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here